বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবিড় পাঠ ও গবেষণার পরিবেশের সঙ্গে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আমাদের দেশে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংখ্যাবৃদ্ধি এবং দেশের নানাপ্রান্তে সেগুলোর অবস্থানগত বিস্তারের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবাসনের সুবিধা না পেলে শিক্ষার্থীদের পাঠ ও গবেষণায় তা বিরূপ প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে চলছে ছাত্ররাজনীতির নামে নির্মম দখলদারিত্ব আর ক্ষমতার সন্ত্রাস। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলো যেমন এ বিষয়ে পরিকল্পনাহীন তেমনি উচ্চশিক্ষার নীতিনির্ধারকরাও এ বিষয় নিশ্চুপ। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট কতটা প্রবল তা জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে। এতে জানা গেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আবাসিক হল না থাকায় ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থীই আবাসিক সুবিধা পান না। প্রতিবেদনে উল্লিখিত বাস্তবতার এক নির্মম চিত্র দেখা যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।
রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘আন্দোলন করে হলে উঠে ছাত্রীরা পেল চৌকি’ শিরোনামের প্রতিবেদন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের ‘চৌকি নিবাস’-এর তথ্য উঠে এসেছে। জানা গেছে, তারিখ দিয়েও দফায় দফায় পেছানোর পর অবশেষে আন্দোলনের মুখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ছাত্রীদের জন্য তৈরি হলে শিক্ষার্থী ওঠানো শুরু হয়েছে। আসন বরাদ্দসহ চার দফা দাবিতে গত শুক্রবার রাতভর বিক্ষোভ করার পর গতকাল শনিবার নতুন ওই আবাসিক হলটিতে আসন পেয়েছেন জরাজীর্ণ ফজিলাতুন্নেছা হলের ছাত্রীরা। এ ছাড়া কয়েকদিনের মধ্যেই ছাত্রদের আরেকটি হল চালু করা হবে বলে জানা গেছে। তবে এসব হলে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সব সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। শুধুমাত্র মাথাপিছু একটি করে চৌকি এবং পানি ও বিদ্যুৎ সুবিধা দিয়ে শিক্ষার্থী ওঠানো হচ্ছে। অথচ ২০১৮ সালে এই হলগুলোর নির্মাণকাজ উদ্বোধনের সময় বলা হয়েছিল, ২০২০ সালের ডিসেম্বরেই কাজ শেষ হবে। দীর্ঘ আশ্বাসের পরেও আবাসিক হল দুটিতে পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। হলের মধ্যে খাবারের ব্যবস্থা নেই। প্রত্যেককে একটি চৌকি দেওয়া হয়েছে। পানি এবং বিদ্যুৎ সংযোগ আছে। তবে নেই গ্যাস সংযোগ। প্রত্যেক তলায় গ্যাসের চুলা থাকার কথা থাকলেও নেই। এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি করে উন্নতমানের চেয়ার, শেলফসহ টেবিল ও লকার থাকার কথা। পাশাপাশি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগও দেওয়া হয়নি। কমনরুম, ব্যায়ামাগার এবং গ্রন্থাগারও প্রস্তুত হয়নি। পুরোদমে চালু হয়নি লিফট। নবীন শিক্ষার্থীদের নবনির্মিত হলে আসন দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণরুম বিলুপ্ত হবে বলেও আশ্বাস এসেছিল। আর সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন করতে গিয়ে গত বছরের ৯ মার্চ ৫০তম ব্যাচের ক্লাস অনলাইনে শুরু করা হয়েছিল। তবে হলের কাজ শেষ না হওয়ায় ওই বছরের ২৩ মে গণরুমে তুলেই তাদের সশরীরে ক্লাস শুরু করা হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন গেল বছরের জুনের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ করার কথা বলেছিলেন। পরে জুন মাসে এসে সে বছরের অক্টোবরে ৬টি হল উদ্বোধন করা যাবে বলে সাংবাদিকদের তিনি জানান। তবে কাজ শেষ করতে না পারায় ছয়টির মধ্যে দুটি হল নভেম্বরের মধ্যে উদ্বোধন করতে পারবেন বলে জানিয়েছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম। কিন্তু হল উদ্বোধন করতে না পারায় ইতিমধ্যে কয়েক দফায় নতুন শিক্ষাবর্ষের (৫১তম ব্যাচ) ক্লাস শুরুর সময়সূচি পিছিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ৩১ জানুয়ারি শুরু হতে যাওয়া ৫১তম ব্যাচের ক্লাস শুরুর আগেই ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য একটি করে হল চালুর ঘোষণা বাস্তবায়ন করছে প্রশাসন। তারই অংশ হিসেবে ছাত্রীদের নতুন হলটিতে শিক্ষার্থী ওঠানো হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও উচ্চশিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া আসন সংখ্যা বাড়ানোয় এই সংকট তৈরি হচ্ছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরিকল্পিত নীতিই দায়ী। অন্যদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচ্য ঘটনায় প্রশাসনের অদক্ষতা এবং দায়িত্বহীনতার বিষয়টি স্পষ্ট। যে কারণে দফায় দফায় সময় বেঁধে দিয়েও শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলে তোলা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যত বেশি সংখ্যক সম্ভব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আবাসন সুবিধা সৃষ্টি করা এবং মানসম্মত পাঠ ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, শিক্ষায় বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হওয়া উচিত গবেষণায়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আবাসন সুবিধার মতো মৌলিক অবকাঠামো গড়ে তোলাতেই আমরা এখনো পিছিয়ে আছি। নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে, ধাপে ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসন সংকট নিরসনের একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে সে লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া।