শান্তিনিকেতন সম্পর্কে যারা একটু-আধটু জানেন তারাই বুঝবেন বিষয়টি ঠিক অমর্ত্য সেনের জমি নিয়ে তর্কাতর্কি নয়, এখনকার উপাচার্যের সঙ্গে বহু বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য আছে। শুধু নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের বা প্রাক্তন আশ্রমবাসীদের, সাধারণ মানুষের বড় অংশ কার্যত আড়ালে-আবডালে কী ভাষায় উপাচার্য সাহেবকে নিন্দেমন্দ করেন তা খোলাখুলি লেখাও সম্ভব নয়।
শান্তিনিকেতনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কম দিনের না। ঘটনাচক্রে বিয়ের সূত্রে আমি সেখানকার জামাতাও বটে। আমার দাদাশ্বশুর ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম সহযোগী। ব্যক্তিগতভাবে পুরনো দিনের শান্তিনিকেতনের এমন অনেক গল্প শুনেছি যা চোখের সামনে যেন বয়স বাড়ার সঙ্গে ফিরে ফিরে আসে।
এই তো সেদিনও কত রাত অবধি প্রান্তিক স্টেশনের কাছে বসে চুপচাপ ট্রেন গুনতাম। অন্ধকার গভীরে এক একটা কামরার নিভু নিভু আলোয় পরিবেশটা মায়াবী হয়ে উঠত। গুরুপল্লীর সাবেক বাসায় কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, গান করবে, নিজের জন্য অন্তত করবে। স্ত্রীর সম্পর্কে তিনি ছিলেন মোহর মাসী। শৈলজারঞ্জন মজুমদার ছিলেন সংগীতগুরু। তাকে নিয়েও কি কম কথা আছে।
এখনো মনে পড়ে, গল্প শুনেছি যে, ঠা-ায় গলাব্যথা হবে বলে মাফলার নিয়ে প্রিয় মোহরের পেছনে ছুটছেন। রানী চন্দের বাড়িতে ছিল বড় বড় জামের গাছ। কেউ এলেই বকতেন। আমাদের কয়েকজনের ছিল অবারিত দ্বার। কত কত স্মৃতি। বৃষ্টিভেজা শান্তিনিকেতনে পুরনো মেলার মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা। তখন তো প্রায় মাঠ পার হলেই বিস্তৃত খোয়াই। তারপর প্রান্তিক, গোয়ালপাড়া, তালতোড়। এই স্পিরিট এখনকার উপাচার্যের বোধের বাইরে।
শান্তিনিকেতনের উদার আকাশ বুঝতে গেলে যে সংবেদী মন দরকার তা নিশ্চিত উপাচার্যের নেই। তিনি জানেন না পুরনো শান্তিনিকেতন ছিল এক ধরনের কমিউন। তুচ্ছাতিতুচ্ছ জমির মাপজোখ করে, পাঁচিল তুলে আশ্রমের আত্মীয়তা বন্ধ করার ঔদ্ধত্য এর আগের কোনো উপাচার্য দেখাননি। আগের আচার্য যারা ছিলেন তারাও ছিলেন রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু তারা কেউই শান্তিনিকেতনের আকাশ বন্ধ করার কথা ভাবেননি।
অমর্ত্য সেনের বিরুদ্ধে যে ক্রোধ তা পুরোপুরি রাজনৈতিক। তিনি আজকের শাসকদের স্বৈরাচারী শাসনের পক্ষে নন বলেই তার বিপক্ষে এভাবে প্রতিহিংসার রাজনীতি করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনেক সমালোচনা করি। কিন্তু অমর্ত্য সেনের জমি প্রশ্ন নিয়ে আমি পুরোপুরি তার পাশে।
হতে পারে তিনিও রাজনীতি করছেন। তাহলেও যে যুক্তিতে তিনি জমির দলিল নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদকে নিজে হাতে পৌঁছে দিয়েছেন তাতে নিশ্চিত তাকে ধন্যবাদ দিতেই হবে।
উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী নোবেল পুরস্কার নিয়েও যেভাবে অমর্ত্য সেনের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন তাও অত্যন্ত আপত্তিকর। এটি নতুন করে বলার নয় যে, অর্থনীতিতে নোবেল আগে তালিকায় ছিল না। পরে কমিটি তা অন্তর্ভুক্ত করে। এবং তাকে নোবেল পুরস্কার হিসেবেই সারা দুনিয়ায় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত বিদ্যুৎ চক্রবর্তী যার ভজনা করছেন, তার আদৌ কোনো ডিগ্রি আছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ যথেষ্ট।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী একের পর এক ‘তা-লি-বা-নি’ সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই শান্তিনিকেতনের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছেন। তার কীর্তি গিনেস বুকে জায়গা পেতে পারে। তিনি অবস্থানে বসা ছাত্রদের ঢিল ছুড়েছেন এমন অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছে।
যে মুক্তচিন্তা ছিল রবীন্দ্র দর্শনের ভিত্তি, তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে উপাচার্য শান্তিনিকেতনে পাঁচিল তুলে জেলখানা করে তুলেছেন। তার বিরুদ্ধে কথা বললেই তিনি কাউকে রেয়াত না করে ছাত্র থেকে শিক্ষক সবাইকে সাসপেন্ড করে তুঘলকি রাজ কায়েম করেছেন। গুজরাট যেমন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ল্যাবরেটরি, তেমনি শান্তিনিকেতন হয়ে উঠছে স্বৈরাচারী শাসনের নতুন এক মডেল। এখানে উপাচার্যের বিপক্ষে কথা বলা মানেই আপনাকে অপরাধী করে চিহ্নিত করে হেনস্তা করা দস্তুর হয়ে গেছে।
অদ্ভুত লাগে যখন বাইরে থেকে যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি দেখতে ছুটে আসেন, তাদের কাউকেই আশ্রমের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। বাংলাদেশ ভবন করা হয়েছে, যতদূর জানি সেখানকার সরকার টাকাও দিয়েছে ভবনের উন্নয়নে। অথচ সেখানে ঠিক কী কী কাজ হয়, অন্তত সাধারণ কোনো বাংলাদেশের নাগরিকের জানার সুযোগ নেই। অদ্ভুত এক ভয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিতে আজ বিরাজ করছে।
অমর্ত্য সেনের জমি ‘উদ্ধারের’ পেছনে ছোটাছুটি না করে বিদ্যুৎ চক্রবর্তী যদি শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে মাথা ঘামাতেন তাহলে উপকার হতো। দেশের ও সমাজের। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে চোরা না শোনে ধর্মের কথা। বিদ্যুৎ চক্রবর্তী বনাম অমর্ত্য সেনের লড়াই নিঃসন্দেহে মতাদর্শের। স্বৈরতন্ত্র বনাম গণতন্ত্রের।
ইদানীং মাঝেমধ্যে যখন শান্তিনিকেতনে যাই, রাস্তায় হাঁটি তখন মনে হয় রবীন্দ্রনাথকে। ফ্যাসিস্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে সতত সোচ্চার রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়ে। মনে পড়ে যায় ভান্ডারের গল্প। যা লিখেছিলেন মুজতবা আলী। জোব্বা গায়ে রবীন্দ্রনাথ চলেছেন। মারাঠি ভান্ডারে ছুটে গিয়ে গুরুদেবকে পয়সা দিলেন। অবাক হয়ে সতীর্থ বন্ধুরা জিজ্ঞেস করলেন, কাকে পয়সা দিলি! ভান্ডারকর বিস্মিত হয়ে জবাব দিলেন, কেন, এক ভিখিরি বাবাকে। মুজতবা আলী অনাদি দস্তিদারের কথা লিখেছেন। তরুণ ভান্ডারকর পরিণত বয়সে মাথা নিচু করে অনাদি দস্তিদারের কাছে গান শিখছেন। হাঁটতে হাঁটতে যেন শুনতে পাচ্ছি সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরই অপমান। গণআন্দোলন ছাড়া এই, আজকের অপশাসন থেকে মুক্তি নেই।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
sdastidar27@gmail.com