ফৌজদারহাট সাগরপাড়। রয়েছে ম্যানগ্রোভ গাছ ও বিশাল জলাশয়। সেই জলাশয়ের পাশে রয়েছে কর্ণফুলীর তলদেশের টানেল ও ফৌজদারহাটের সংযোগ সড়ক। আর এই সড়ক ঘেঁষেই গড়ে তোলা হচ্ছে ফুলের সাম্রাজ্য। অথচ কিছুদিন আগেও এখানে সন্ধ্যার পর বসত মাদকের আসর। এ জায়গা দখল করে শুকতারা নামে একটি রেস্টুরেন্টও গড়ে উঠেছিল। ১৯৪ একর জায়গাজুড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সেই আস্তানা গত মাসে গুঁড়িয়ে দেয় জেলা প্রশাসন।
গতকাল রবিবার সকালে সাগরপাড়ের আউটার রিং রোডের সেই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ছাউনির ভেতরে টিউলিপ ফুল ফুটে আছে। লাল, হলুদ, গোলাপি ও লাল-হলুদের মিশ্রণ ও সাদা রঙের টিউলিপের অপূর্ব সমাহার। দুই সারিতে এসব টিউলিপের বাগানের মূল দায়িত্বে রয়েছে গাজীপুরের শ্রীপুরের দেলোয়ার হোসেন। ব্যক্তি উদ্যোগে তিনি প্রথম টিউলিপের বাগান গড়ে তোলেন। পরে যশোর ও কুষ্টিয়ায় দুই বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে টিউলিপের চাষ হচ্ছে।
সাগরপাড়ে টিউলিপের বাগান ও ফুলের সাম্রাজ্য গড়ে তোলা প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পুরো এলাকা ফুল ও জলাশয়ের সমন্বয়ে একটি দৃষ্টিনন্দন পার্ক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এ জন্য ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা এই স্থানে একটি ফ্লাওয়ার ফেস্ট করব। এ পর্যন্ত প্রায় ১২২ প্রজাতির ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে এবং আরও লাগানো হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ এলাকাটি একসময় মাদকের আস্তানা ছিল। অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করে আমরা এখানে একটি বিনোদন পার্ক গড়ে তুলতে চাই।’
রাস্তার পাশের ১৯৪ একর জায়গার মধ্যে দুটি বড় জলাশয় রয়েছে। রাস্তার পূর্ব দিকে দীর্ঘ খালি অংশের পরেই রয়েছে জলাশয়। আর জলাশয়ের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এবং ফরেস্টের অপর প্রান্তে বঙ্গোপসাগর।
পুরো এলাকা নিয়ে জেলা প্রশাসন পরিকল্পনা করছে উল্লেখ করে সীতাকু-ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, ‘আমরা দুই জলাশয়ের মাঝখানে একটি ওয়াকওয়ে করব। এ ছাড়া জলাশয় ঘিরে ওয়াকওয়ে ও লাইটিং থাকবে। জলাশয়ের পশ্চিম প্রান্তে (সাগরের দিকে) বিনোদনের জন্য কটেজ নির্মাণ করা হবে; অর্থাৎ পুরো এলাকা নিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান করা হবে। সেই আলোকে গড়ে তোলা হবে পার্ক।’
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে একটি গোষ্ঠী তা অবৈধ দখলে নিয়ে ভোগদখল করে আসছিল। সন্ধ্যা হলেই এখানে মাদকের আসর বসত। বর্তমান জেলা প্রশাসক যোগদানের পরই তা উচ্ছেদের নোটিস দিতে বলেন এবং ৪ জানুয়ারি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
দেশে ফুলের চাষে এগিয়ে রয়েছে যশোর ও কুষ্টিয়া। সারা দেশের ফুলের জোগান মূলত ওই এলাকা থেকেই আসে। গত বছর থেকে যশোরেও টিউলিপের বাগান সৃজন শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে কথা হয় যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘টিউলিপ মূলত শীতপ্রধান অঞ্চলের ফুল। বছরের অন্য সময় এই ফুলের চাষ হয় না। আমাদের দেশে দুই বছর ধরে এর চাষ শুরু হয়েছে। সরকারিভাবে আমাদের এলাকায় এবং ব্যক্তিমালিকানায় সাভারে। শীত চলে গেলে আর এই ফুল ফুটবে না।’
তিনি আরও বলেন, নেদারল্যান্ডস থেকে আনা টিউলিপের বীজ থেকে গাছ হয়ে ফুল ফুটতে ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় প্রয়োজন। এই সময় তাপমাত্রাও সহনীয় পর্যায়ে থাকতে হয়। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে এই ফুল ফুটবে না। সে হিসেবে ফেব্রুয়ারির পর আর তা ফোটার সুযোগ নেই।
তবে দেশে এখনো বাণিজ্যিকভাবে টিউলিপ চাষের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি উল্লেখ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (ফুল ও ফল) মোহাম্মদ আহসানুল হক চৌধুরী বলেন, ‘টিউলিপ চাষের জন্য পাহাড়ি ঢাল, শীতকাল ও বৃষ্টি প্রয়োজন। আমাদের দেশে এখনো এই পরিবেশে অভিযোজন হয়নি বলে শৌখিন হিসেবে চাষ হলেও হতে পারে কিন্তু বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষের সময় এখনো আসেনি।’
উল্লেখ্য, শুকতারা নামের রেস্টুরেন্টটি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিল। রাস্তার পাশে এবং যাতায়াত সহজ হওয়ায় এই রেস্টুরেন্টে দিনের বেলা পার্ক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে রাতের বেলা এখানে মাদকের আসর বসত বলে অভিযোগ রয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। আর সরকারের খাস জায়গায় গড়ে তোলা এই রেস্টুরেন্টটির কোনো অনুমোদন ছিল না।