ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিন থেকে আবার ৫ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি কার্যকর হয়েছে। জানুয়ারিতে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকার কথা রাখতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালের প্রথম মাসের ১২ তারিখ অর্থাৎ ১২ জানুয়ারি সরকারের নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ বাড়ানোর পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর বরাত দিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছিল, এখন থেকে প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করা হবে। ২০ দিনের মধ্যেই দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে সেই কথার বাস্তবায়ন করা হলো। এখন আর কেউ বলতে পারবে না যে সরকার কথা দিয়ে কথা রাখে না। সরকার নিজে কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কিনে দুটো মিলে দামের গড় করে জনগণের কাছে বিক্রি করে। বেসরকারি বিদ্যুতের দাম অনেক বেশি কাজেই সমন্বয়ের নামে বাস্তবে নিয়মিত বিদ্যুতের দাম বাড়াতেই হবে। আর ব্যবসাবান্ধব সরকার হতে গেলে ব্যবসায়ীদের সুযোগ না দিলে তো চলে না।
এক মাসেই দুইবার বিদ্যুতের এবং একবার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত এমন একটি সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের জীবন দুর্বিষহ। আর সমন্বয়ের কথা! নিশ্চয়ই মনে আছে গত বছরের আগস্টে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম এক লাফে লিটারে ৩৪ থেকে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছিল সরকার। বিশ্ববাজারে দাম কমে যাওয়া আর ব্যাপক সমালোচনার মুখে লিটারে ৫ টাকা কমানো হয়েছিল। তেলের দাম বাড়ানোর পর পর যেভাবে দ্রব্যমূল্য বেড়েছিল দাম কমানোর পর দ্রব্যমূল্যের ওপর তেমন কোনো প্রভাব কি পড়েছিল? সহজ উত্তর, না পড়েনি। (ডিজেলের দাম ৩৪ টাকা বাড়ানোর পর কমল ৫ টাকা, প্রথম আলো, ২৯ আগস্ট ২০২২) কাজেই অতীত ইতিহাস বলে, বিদ্যুতের দাম যদি কোনো মাসে কমানোও হয়, সেটার কোনো প্রভাব দ্রব্যমূল্যের ওপর না পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে প্রতি মাসে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের অর্থ হবে নিত্যপণ্য ও সেবার দাম যে বেড়ে যাবে তা আর কমবে না।
কী এক ভয়াবহ অবস্থার সামনে পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। দেশের চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেই হবে আর ভুলনীতির কারণে বিদ্যুতের যত উৎপাদন বাড়বে ততই লোকসান বাড়বে। ২০১২-১৩ সালে যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল সাড়ে ৮ হাজার মেগাওয়াট, তখন পিডিবির লোকসান ছিল ৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। এরপর ২০১৭-১৮ সালে উৎপাদনক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াল ১৫ হাজার ৪১০ মেগাওয়াট আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পিডিবির লোকসান দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। এভাবেই চলতে থাকে। সর্বশেষ ২০২১-২২ সালে ২১ হাজার ৬৮০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার বিপরীতে লোকসান হয় প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। (সক্ষমতার সঙ্গে লোকসানও বেড়েছে, প্রথম আলো, ২৯ জুলাই ২০২২)। লোকসানের কারণ দূর না করে ভর্তুকি বা ঋণের পরিমাণ হ্রাস করার জন্যই এভাবে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করে জনগণের পকেট থেকে বাড়তি টাকা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। আগেও এটা হয়েছে, এখন আইএমএফের শর্ত মানার নামে আর পিডিবি তথা সরকারের লোকসানের বোঝা কমানোর জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। অনিয়মের কারণে লোকসান, লোকসানের কারণে ভর্তুকি আর ভর্তুকি কমাতে মূল্যবৃদ্ধি, কী দারুণ চক্রে পড়েছে জনগণ। ফলে জনগণের পকেট থেকে আগের চেয়ে আরও বেশি পরিমাণ অর্থ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের পকেটে গিয়ে ঢুকবে। উৎপাদন মূল্য বেশি রেখে পিডিবি কর্র্তৃক বেসরকারি মালিকদের কাছ থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার প্রক্রিয়া মসৃণ রাখার জন্য এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের যে নামমাত্র গণশুনানি হতো সেটাও বন্ধ করে দেওয়া হলো। জবাবদিহি করার কোনো দরকার নেই, নিয়মিত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করল সরকার।
বিদ্যুতের মতো অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবার উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ঘাটতি থাকলেই দাম বাড়ানো উচিত কি না, দাম বাড়িয়ে জনগণের কাছ থেকে যে পরিমাণ টাকা পাওয়া যাবে তাতে সমস্যার সমাধান হবে কি না, তা বিবেচনা করতে হলে কয়েকটা বিষয় সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার এবং সরকারের কাছ থেকে যথাযথ তথ্য পাওয়া দরকার।
প্রথমত, ঘাটতি যেন না হয় তার উদ্যোগ নিতে হবে। দেখতে হবে উৎপাদন মূল্য যেন না বাড়ে। বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের খরচ, জ্বালানির খরচ, নানা ধরনের প্রশাসনিক ব্যয় খুব সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে হবে, নজরদারি রাখতে হবে। উৎপাদন খরচ বাড়ানোর সব পথ খুলে রেখে দফায় দফায় বিক্রয়মূল্য বাড়ালে ঘাটতি কমে না। কারণ ঘাটতি বাড়লে যাদের লাভ হয় তারা নানা অজুহাতে দিনে দিনে ঘাটতি বাড়াতেই থাকবে। ফলে ঘাটতি ও দাম বাড়ানো চলতেই থাকবে। যা ১৪ বছর মেয়াদের এই সরকারের আমলে ১২ বার দাম বাড়ানোর পরও হাজার হাজার কোটি টাকা ঘাটতির হিসাব দেখানোর ঘটনা থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায়।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদনের সমস্ত বিষয় সততা ও সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করার পরও যদি নিয়ন্ত্রণ অযোগ্য কোনো কারণে ঘাটতি হয়ে যায়, তাহলে তো ভর্তুকি প্রদান করতেই হবে। কিন্তু বিবেচনা করতে হবে বিদ্যুৎ অন্য পণ্যের মতো নয়। বিদ্যুতের দাম বাড়লে গোটা অর্থনীতিতে এর বহুগুণ প্রভাব পড়ে। কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদিত সব পণ্যের দাম বেড়ে যায়, জনগণের দুর্ভোগ বাড়ে। ফলে গুরুত্বের বিবেচনায় জনগণের দেওয়া কর-ভ্যাটের অর্থের একটা অংশ জনগণের স্বার্থে বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিতে হবে। এ-কথা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মোড়লরাও স্বীকার করে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
যদি ভর্তুকি পাবলিক বা রাষ্ট্রীয় খাতে ব্যবহার করা হয় তাহলে জনগণের টাকা জনগণের কাজেই লাগে। কিন্তু যদি দুর্নীতির ইঁদুরে গোলার ধান খেয়ে ফেলে তাহলে ইঁদুর না মেরে গোলা ভর্তি করার অর্থ ইঁদুরকে পুষ্ট করা ও বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করা। একদিকে বিদ্যুৎ খাত বেসরকারীকরণ করা তারপর সেখান থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার সহজ মানে হলো জনগণের অর্থ বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের কাছে তুলে দেওয়া এবং তাদের নিরবচ্ছিন্ন মুনাফা নিশ্চিত করা। বাড়তি অর্থ ভর্তুকি থেকে কিংবা দাম বাড়িয়ে যেভাবেই সংগ্রহ করা হোক না কেন তা তো জনগণেরই অর্থ। কাজেই বিদ্যুৎ খাতে জনগণের অর্থ জনগণেরই কাজে লাগানোর প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো দুর্নীতি বন্ধ করে উৎপাদন খরচ কমানো। রাজনৈতিকভাবেও এই দাবি তুলতে হবে যে বিদ্যুতে বেসরকারি খাত নয়, দুর্নীতিমুক্ত এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় খাত শক্তিশালী করতে হবে।
একটি চৌবাচ্চার এক নল দিয়ে পানি বেরিয়ে যাওয়া আর সেই চৌবাচ্চা পূর্ণ করার অঙ্ক নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি। জনগণ যেন ছোটবেলার শিক্ষা ভুলে না যায় সে চেষ্টা করছে সরকার। সেই অঙ্কে বলা ছিল না যে চৌবাচ্চার নলটা কেন খোলা ছিল বা কে খুলে রেখেছিল। আর এই প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না, কেন পানি বেরিয়ে যাওয়াটা বন্ধ করা হচ্ছে না? ক্লান্তিহীনভাবে পানি ভরতেই থাক আর বিরামহীনভাবে পানি বেরিয়ে যেতেই থাকুক। দেশটার অবস্থা যেন তেমনই হয়েছে। দুর্নীতি, লুটপাট, অপচয়, ভুলনীতির কারণে লোকসান হতেই থাকবে, লোকসানের কারণে ভর্তুকি দিতে হবে এবং জনগণের টাকায় ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব নয় বলে জনদরদি সরকার জনগণের ওপর বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বোঝা বাড়াতেই থাকবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চৌবাচ্চার ফুটো হলো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০২০-২১ সালে গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ছিল ৬ টাকা ৬১ পয়সা, যা ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১-২২ সালে দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ৮৪ পয়সা। এর মধ্যে পিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন খরচ ৫ টাকা ২ পয়সা এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন খরচ ৪ টাকা ৪৭ পয়সা হলেও বেসরকারি খাতের রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের গড় উৎপাদন খরচ ৯ টাকা ৮০ পয়সা ও আইপিপিগুলোর গড় উৎপাদন খরচ ১১ টাকা ৫৫ পয়সা। এক বছর আগে বেসরকারি খাতের রেন্টাল ও আইপিপি বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছিল যথাক্রমে ৭ টাকা ৪৭ পয়সা ও ৮ টাকা শূন্য ২ পয়সা। (পিডিবির বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২১-২২, পৃষ্ঠা ৯৬) আর এখানেই শেষ নয়। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াই ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার কারণে বেসরকারি খাতের কোনো কোনো আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে ৫৫ টাকা এবং ভাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট ২৭ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। (পিডিবির বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২১-২২, পৃষ্ঠা ১১৪-১১৭) ফলে এটা সাধারণ মানুষের কাছেও স্পষ্ট যে বেসরকারি খাতের আইপিপি ও রেন্টাল মডেলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে অস্বাভাবিক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়েই পিডিবির লোকসান ঘটছে এবং বাড়ছে। এর দায়িত্ব কি জনগণকেই নিতে হবে?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষের শুধু তথ্য জানার অধিকার থাকলে চলে না। তথ্য যাচাই করার, সত্যাসত্য নির্ধারণ করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। সরকার জানিয়ে দিল, দাম বাড়ানো হবে (দুঃখিত, বলা হয়েছে সমন্বয় করা হবে)। এটা কি তথ্য জানা নয়? কিন্তু এটুকু জানাকেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলে না। তাহলে স্বৈরশাসকরাও বলবে আমরাও তো জানিয়েছি আমাদের সব পরিকল্পনা আর স্বপ্নের কথা। সে কারণেই শুধু জানা নয়, যা জানলাম তা যাচাই করা, গ্রহণ বর্জন করার পরিবেশ না থাকলে তাকে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বলে না। ফলে দাম বাড়ানোর কারণ জানা শুধু নয়, কাদের দুর্নীতি, অবহেলা, অপচয়ের কারণে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ে তাদের জ্বালানি অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। তা না হলে চৌবাচ্চার ছিদ্র ক্রমাগত বড় হতেই থাকবে।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট
rratan. spb@gmail. com