প্রকল্প প্রস্তাবে না থাকার পরও মাটির নিচ দিয়ে ১৫০ কিলোমিটার বিদ্যুতের লাইন স্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাউবো)। প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করতে হলে এ খাতে ব্যয় অন্তত ১০০ গুণেরও বেশি বাড়াতে হবে। অর্থনীতির সংকটকালীন পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক ব্যয়ের এমন প্রস্তাব দিয়েছে বাউবো।
‘বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগ (২য় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের একটি অংশে ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকায় ১৭ কিলোমিটারের ওভারহেড (মাথার ওপর দিয়ে) বিদ্যুতের লাইন টানার কথা রয়েছে। কিন্তু সেই একই লাইন ওপর দিয়ে না করে মাটির নিচে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়ে ১৫০ কিলোমিটারে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। প্রকল্প পরিচালক বলছেন, মাটির নিচের লাইনে স্থায়িত্ব বেশি বিধায় এটি প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় অস্বাভাবিক ব্যয়ের প্রস্তাবটিতে সম্মতি দেয়নি পরিকল্পনা কমিশন।
পিইসি সভায় ওভারহেড বিতরণ লাইন বাদ দেওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হলে প্রকল্প পরিচালক জানান, ওভারহেড বিতরণ লাইনের পরিমাণ কমলেও উক্ত বিতরণ লাইন নির্মাণকাজটি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বাস্তবায়ন করছে। তাই আলোচ্য প্রকল্প থেকে তা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে উপকেন্দ্রের সংখ্যা এবং ওভারহেড বিতরণ লাইনের পরিমাণ কমলেও প্রকল্পের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্ত হবে না বলেও জানান তিনি।
সভায় অতিরিক্ত ১৫০ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড বিতরণ লাইন নির্মাণের যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব বলেন, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আলোচ্য প্রকল্পের আওতাভুক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ (ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, লোড ডিমান্ড ও অপ্রশস্ত রাস্তাঘাট বিবেচনায়) স্থানে আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
জানতে চাইলে সিলেট বিদ্যুৎব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক পল্লবী জামান দেশ রূপান্তরকে জানান, ১৫০ কিলোমিটারের যে প্রস্তাব সেটি সার্কিট কিলোমিটার। ৩ রুটে তিনটি লাইন যাবে সে হিসেবে ১৫০ কিলোমিটার। আমরা ইতিমধ্যে এ প্রকল্পের আওতায় সিলেট শহরের মধ্যে আন্ডারগ্রাউন্ডে ৫০ কিলোমিটারের লাইন করেছি।
১৫০ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড প্রকল্প নতুন করে প্রস্তাবের যৌক্তিকতা হিসেবে তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেটের মেয়রের ডিও লেটারের পরিপ্রেক্ষিতে এটি প্রস্তাব করা হয়েছে। আমরা নতুন এ খাতটি ডিপিপিতে যুক্ত করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তিন মাস পর আমাদের আরেকটি পিইসি সভা হয়। তাতে পরিকল্পনা কমিশন সিদ্ধান্ত দিয়েছে, আপাতত এ প্রকল্পের আওতায় থেকে এটি বাদ দিয়ে বাকি কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় প্রকল্প পরিচালক পল্লবী জামান বলেন, ওভারহেড লাইনের তুলনায় নির্মাণ ব্যয় বেশি হলেও আন্ডারগ্রাউন্ড লাইনের স্থায়িত্ব বেশি এবং বেশি নিরাপদ। এ পর্যায়ে শিল্প ও শক্তি বিভাগের পক্ষ হতে জানানো হয়, প্রস্তাবিত ১৫০ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ৫০৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। অথচ আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণ করা না হলে ১৭ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার ওভারহেড লাইন নির্মাণ করে বর্তমান চাহিদা পূরণ করা সম্ভব এবং ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে করে নির্মাণ করা সম্ভব।
পিইসি সভা সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৫ কোটির সহজ লাইন টানা বাদ দিয়ে ৫০৫ কোটির প্রস্তাব কেন করা হয়েছে, এর ব্যাখ্যা দিতে না পারায় এটি বাদ দিতে বলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
২০১৬ সালের ৩ মে একনেক সভায় মোট ১ হাজার ৮৯০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদিত হয়েছিল। তখন এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত। পরে ব্যয় ও মেয়াদ দুটোই বাড়িয়ে প্রথম সংশোধনী অনুমোদিত হয় ২০১৯ সালের ৯ জুলাই। তখন ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় ২ হাজার ৫২৯ কোটি ৫২ লাখ লাখ টাকা। মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।
কিন্তু নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ করতে না পারায় ব্যয় না বাড়িয়ে আবারও মেয়াদ বাড়ায় পরিকল্পনা কমিশন। ওই সময় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।
কিন্তু তাতেও প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে না পারায় ফের ২৬১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয় ও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ এখন দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ হাজার ৩১৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। মূল প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে ১২ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। মেয়াদ বাড়নোর প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।
পিইসি সভায় জানতে চাওয়া হয় প্রস্তাবিত এসব পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে কিনা। জবাবে প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রস্তাবিত আরডিপিপিতে আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণের পরিমাণ ১৫০ কিলোমিটার বাড়ানো হয়েছে, উপকেন্দ্রের সংখ্যা দুটি কমানো হয়েছে। ওভারহেড বিতরণ লাইন নির্মাণ ৬৯৭ কিলোমিটার কমানো হয়েছে। এ ছাড়াও, আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণের জন্য নির্বাচিত সড়কগুলোর ৩৫.৭৮৬ কিলোমিটার ওভারহেড লাইন ২০১১-২০১৬ মেয়াদে নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর বিবেচনায় লাইনগুলোর আয়ুষ্কাল থাকবে ২০১১ থেকে ২০৩৬ পর্যন্ত। সে বিবেচনায় বিদ্যমান ওভারহেড লাইনগুলো প্রতিস্থাপন করা যৌক্তিক নয়।
তিনি আরও বলেন, মূল প্রকল্প অনুমোদনের সময় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গঠিত কমিটির মাধ্যমে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। প্রকল্পের মূল ডিপিপি প্রণয়ন ও অনুমোদনের সময় মোট ৭০ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণের সংস্থান ছিল। পরে আন্ডারগ্রাউন্ড লাইনের পরিমাণ কমিয়ে মোট ৪৯ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণের সংস্থান রেখে প্রকল্পের প্রথম সংশোধন করা হয়। বর্তমানে আন্ডারগ্রাউন্ড লাইনের পরিমাণ ১৫০ কিলোমিটার বাড়িয়ে মোট ১৯৯ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণের সংস্থান রেখে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছে।