নির্বাচনী রোডম্যাপ অনুযায়ী, আগামী মে মাসের মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের সব প্রস্তুতি সারতে হবে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীরকে প্রধান করে গঠিত কমিটি আজ মঙ্গলবার বৈঠকে বসবে। শেরেবাংলা নগরে ইসি কার্যালয়ে অনুষ্ঠেয় এই বৈঠকে সীমানা পরিবর্তনের বিষয়ে ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’ নেওয়া হবে।
ইসির সূত্র বলছে, সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য এ পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন আসনের বিষয়ে ১০০টির মতো আবেদন জমা পড়েছে। এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করছে ইসি। তবে আবেদন যা-ই জমা পড়ুক, বর্তমান কমিশন রাজনৈতিক বিতর্ক এড়াতে প্রয়োজন অনুসারে সীমানায় পরিবর্তনের পক্ষে।
ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিসংখ্যান ব্যুরো তথ্য দিলেই আমরা সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ দ্রুত শেষ করতে পারতাম। কিন্তু তাদের তথ্য দিতে আরও দেরি হবে। আবার নির্বাচনী রোডম্যাপ অনুযায়ী আমাদের মে মাসের মধ্যেই এ সংক্রান্ত কাজ শেষ করতে হবে। সেটি কীভাবে হবে তা নিয়েই আগামীকাল (আজ) বৈঠক হবে। বৈঠকে সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হবে। যে খসড়া প্রতিবেদন পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে পেয়েছি, তা থেকে চূড়ান্ত প্রতিবদেন ৪-৫ শতাংশ এদিক-ওদিক হয়। তারপরও আমাদের কাজে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’
তিনি জানান, ইসি কীভাবে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নাকি আসনের আয়তনের ভিত্তিতে তা নিয়ে, কীভাবে কাজ সম্পন্ন হবে, এই প্রক্রিয়ায় কারা দায়িত্বে থাকবে প্রভৃতি ঠিক করা হবে বৈঠকে। মূলত প্রাথমিক কর্মপন্থা নির্ধারণের নীতিগত সিদ্ধান্ত হবে।
সূত্র জানায়, জনশুমারি ও গৃহগণনার খসড়া প্রতিবেদন ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে আরও সময় লাগতে পারে। ইতিমধ্যে জেলাভিত্তিক জনসংখ্যাও প্রকাশিত হয়েছে। উপজেলাভিত্তিক হিসাব প্রস্তুতের কাজ চলছে। ইসির সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা যে সফটওয়্যারের সাহায্যে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ করেন, সেটি দিয়ে এক মাস ধরে বিভিন্ন তথ্যের পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে পাওয়া খসড়া তথ্যের ভিত্তিতেই কাজ হচ্ছে।
নির্বাচন ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব ফরহাদ আহম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিকল্পনা ব্যুরোর কাছ থেকে জনশুমারির একটা খসড়া পেয়েছি। তা দিয়েই কাজ এগিয়ে রাখছি।’
সূত্র বলেছে, আগে সীমানা নির্ধারণ করতে আইনি অনেক সমস্যা হতো। কোনো কোনো আসনের ভোটাররা বা প্রার্থীরা মামলাও করতেন। ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ছিল ওই এলাকার ভোট। কিন্তু ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশনকে আইনের অধীনে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়ে ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ’ আইন পাস হয়। আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, ইসির সীমানা নির্ধারণের বিষয় নিয়ে দেশের কোনো আদালত বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন করা যাবে না।
সীমানা আইন-২০২১-এ আরও বলা আছে, সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে উল্লিখিতসংখ্যক সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে পুরো দেশকে উক্ত সংখ্যক একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকায় ভাগ করা হবে। এ ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং জনশুমারির ভিত্তিতে যথাসম্ভব বাস্তবভিত্তিক বণ্টনের কথা বলা হয়েছে। আইনের ৮ নম্বর ধারায় একটি উপধারা যুক্ত করা হয়। তাতে বলা আছে, দৈব-দুর্বিপাকে বা অন্য কোনো কারণে আঞ্চলিক সীমানা নির্ধারণ করা না গেলে বিদ্যমান সীমানার ভিত্তিতেই নির্বাচন হবে। তবে ইসিকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হলেও বিতর্ক ও ঝামেলা এড়াতে এবার জনসংখ্যা নয়, প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে গুরুত্ব দিয়ে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা সাংবাদিকদের বলেছেন, জনসংখ্যার ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে গেলে নানা প্রশাসনিক অসুবিধার সৃষ্টি হবে। তাই সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অখণ্ডতা এবার সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই যত দ্রুত সম্ভব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের কাছে ইসি আবেদন না চাইলেও অনেকেই নিজ থেকে আবেদন জমা দিচ্ছেন। এর মধ্যেই প্রায় ১০০ আসনে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে আবেদন করেছেন সংক্ষুব্ধরা। সংশ্লিষ্ট আসনের সরকারি-বিরোধী প্রার্থীর দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি চাইলে সীমানার বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আপত্তি ও পরামর্শ জমা দিতে পারবেন।
অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, ‘কত আবেদন জমা পড়েছে তার সমন্বিত হিসাব আমরা এখনো করিনি। প্রায় ১০০টির মতো আবেদন জমা পড়েছে।’
সংশ্লিষ্ট এলাকার বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, আইনজীবীসহ বিভিন্ন মহল থেকেই বেশি আবেদন জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। অনেকেই বর্তমান সীমানা বহাল রাখা, কেউ কেউ আগে যে সীমানায় নির্বাচন হয়েছিল তা বহাল রাখার কথা বলেছেন। মৌখিক তদবির থাকলেও এমপিদের কেউ এখনো লিখিত আবেদন করেননি। মন্ত্রী, এমপি ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য আবেদনে রয়েছে। বেশির ভাগ মন্ত্রী-এমপির পক্ষে যারা আবেদন করেছেন, তারা বর্তমান সীমানাতেই নির্বাচন করার পক্ষে।
সূত্র বলছে, কুমিল্লা-১ ও কুমিল্লা-২ আসনের সীমানা নিয়ে পাঁচটি আবেদন জমা পড়েছে। একটিতে কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা) ও কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনের সীমানা পরিবর্তন করে হোমনা ও মেঘনা উপজেলার সমন্বয়ে আসন পুনর্নির্ধারণ এবং আরেকটি আবেদনে কুমিল্লা-১ ও ২ আসনের সীমানা পরিবর্তন করে হোমনা ও মেঘনা উপজেলায় সীমানা পুনর্নির্ধারণ চাওয়া হয়েছে। পূর্ব ইতিহাস অনুযায়ী, হোমনা ও মেঘনা উপজেলার সমন্বয়ে নির্বাচনী এলাকা পুনর্নির্ধারণের আবেদনও জমা পড়েছে ইসিতে।
সিরাজগঞ্জ-১ ও ৫ আসন নিয়েও আবেদন জমা পড়েছে। এতে সিরাজগঞ্জ জেলায় সমন্বয়ের (বেলকুচি ও কামারখন্দ) ভিত্তিতে আসন পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। পিরোজপুর-৩ আসনের (মঠবাড়িয়া উপজেলা) বর্তমান সীমানা বহাল চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।
জানা গেছে, আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দেওয়ার সময় শেষ হলে প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করবে ইসি। এরপর দাবি, আপত্তি ও শুনানি শেষে চূড়ান্ত করা হবে সংসদীয় আসনের সীমানা। বর্তমান কমিশন রাজনৈতিক বিতর্ক এড়াতে প্রয়োজন অনুসারে আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনার পক্ষে এবং সেভাবে প্রস্তুতি রাখছেন বলে একাধিক কর্মকর্তার দাবি।
সীমানা পুনর্নির্ধারণসংক্রান্ত কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত আবেদন আহ্বান করিনি। তারপরও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে দরখাস্ত দিচ্ছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতারা যোগাযোগ করছেন। দুই রকম দরখাস্তই আসছে আমাদের কাছে। আমরা জনশুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে পারব না। জুনের মধ্যে আমরা সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ শেষ করব।’
২০০১ সালের নির্বাচনের সময় ১৯৯৫ সালের সীমানার গেজেট বহাল রাখা হয়েছিল। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদ নির্বাচনের আগে সেনাসমর্থিত নির্বাচন কমিশন ১৩৩ সংসদীয় আসনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। প্রতি আদমশুমারির পর সীমানা পুনর্নির্ধারণের নিয়ম রয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই ৫৩টি আসনে পরিবর্তন আনে কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিদায়ী নূরুল হুদা কমিশন সর্বশেষ ২৫টি সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন করেছিল।
জনশুমারির জন্য গত বছরের জুন মাসে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ সালের প্রাথমিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬। পুরুষ ৮ কোটি ১৭ লাখ ১২ হাজার ৮২৪ জন ও নারী ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬ জন। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।