গ্যাস-বিদ্যুৎ-কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি

প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে পোশাকশিল্পের

দফায় দফায় গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ও কাঁচামালের উচ্চমূল্য দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দেবে। আবার বিশ^ অর্থনৈতিক মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিচ্ছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। ফলে আগামীতে রপ্তানিমুখী এ খাত ঘিরে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পোশাকশিল্পের সার্বিক তথ্য-উপাত্ত উল্লেখ করে এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন তৈরি পোশাক মালিক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান। গতকাল মঙ্গলবার পোশাকশিল্পে আইনশৃঙ্খলাজনিত বিষয় নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় পোশাক শিল্পোদ্যোক্তা, বিজিএমইএ পর্ষদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বিজিএমইএ সভাপতি জানান, গত জানুয়ারিতে দুই দফায় বিদ্যুতের দাম ১০ শতাংশ ও গ্যাসের দাম আড়াই গুণ বাড়ানোয় দেশের শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় অনেকাংশে বেড়ে গেছে। কিন্তু বিশ^বাজারে জ¦ালানি তেল ও গ্যাসের দাম অনেকটাই কমে এসেছে।

ভর্তুকির চাপ কমাতে ফেব্রুয়ারি থেকে গ্যাসের নতুন যে দর ঠিক করেছে সরকার, সব রকম খরচ হিসাবে ধরলেও তা আরও কমানো সম্ভব বলে মনে করছে বিজিএমইএ। সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি ফারুক হাসান হিসাব দেখিয়ে বলেন, দেশীয় গ্যাস, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি গ্যাস এবং খোলাবাজার বা স্পট মার্কেট থেকে তাৎক্ষণিক কেনা এলএনজি গ্যাসের মিশ্রণই জাতীয় গ্রিডের গ্যাস। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির গ্যাসগুলোর দাম প্রতি ইউনিট ১২ থেকে ১৩ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আর স্পট মার্কেটের এলএনজি একসময় বেড়ে গিয়ে প্রতি ইউনিট ৭০ ডলারে উঠে গেলেও এখন সেটা কমে ১৭-১৮ ডলারে নেমেছে।

‘আমরা বিজিএমইএ থেকে যেটা বলতে চাচ্ছি, তা হচ্ছে আগে যখন বেশি প্রাইস ছিল, সেই সময় গ্যাসের দাম ঠিক করা হয়েছিল। এখন স্পট এলএনজির দামটা অনেক কমেছে। ফলে সরকার এখন যে দামটা ঘোষণা করেছে, তা হিসাব করে দেখলে আরও কমে আসবে।’

বিজিএমইএর সভাপতি বলেন, ‘আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২২ সালে ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে ২ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি, বিশ^ বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ২০২২ সালে ৪ দশমিক ৩ থেকে কমে ২০২৩ সালে ২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়াবে। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানিসহ প্রধান বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধি যে কমছে, তা দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ সারা বিশে^ই দেখা দিয়েছে মূল্যস্ফীতি। পোশাকের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। আমরা দেখছি যে আমদানিকরা একসঙ্গে বড় অর্ডার না দিয়ে ছোট সøটে অর্ডার দিচ্ছেন। ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করছেন, আবার অনেক ক্রেতা ডেফার্ড পেমেন্টের দিকে ঝুঁকেছেন। এই মুহূর্তে পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করে কারখানা চালানোর মতো অর্ডার কোনো কারখানার কাছেই নেই।’

ফারুক হাসান আরও জানান, গত দেড় বছরে সুতার দাম বেড়েছে ৬২ শতাংশ, কনটেইনার ভাড়া বেড়েছে ৩৫০-৪৫০ শতাংশ, ডাইস ও  কেমিক্যালের খরচ বেড়েছে ৮০ শতাংশ। গত বছরের শুরুতে মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। গত ৫ বছরে পোশাকশিল্পে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ বেড়েছে। কভিডের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা পরিচালনার খরচ আরও বেড়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে চলমান জ¦ালানি সংকটের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের অপ্রতুলতার কারণে কারখানাগুলোতে ডিজেল নিয়ে জেনারেটর চালানো হচ্ছে।

এদিকে পোশাকশিল্পের শত শত কোটি টাকার রপ্তানিযোগ্য পণ্য কাভার্ড ভ্যান থেকে চুরির হোতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। সর্বশেষ ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পোশাকশিল্পের পণ্য চুরির একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মূলহোতা শাহেদসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

ফারুক হাসান বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পরিবহনকালে এসব তৈরি পোশাক পণ্য চুরি হয়েছে। একটি চোর চক্রের মূল হোতা শাহেদসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আশা করছি, বাকিদের গ্রেপ্তার করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ১৭-১৮টি মামলার আসামি শাহেদ এর আগে গ্রেপ্তার হলেও প্রতিবার জামিনে বের হয়ে পুরনো পেশায় ফিরে যান। এই অপরাধীরা কীভাবে এত সহজে জামিন পান, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিজিএমইএ সভাপতি।

শুধু শাহেদ নন, গার্মেন্টস পণ্য চুরির জগতে আরও মাস্টারমাইন্ড ও চক্র রয়েছে। তারা ধরা পড়লেও প্রায়ই কোনো শাস্তি ভোগ না করে আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসছেন। এই অপরাধীদের কারণে আমাদের পোশাকশিল্প বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’