দীর্ঘদিন নিশ্চুপ থাকার পর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষে (রাজউক) ফের সক্রিয় হচ্ছে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী অনুসারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরই মধ্যে তারা ভেতরে ভেতরে জোটবদ্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে। আর সরকারি এ সংস্থাটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও আরবান রেজিলেন্স প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবদুল লতিফ হেলালী বিএনপি-জামায়াত সমর্থক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ অংশটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের ব্যবসায়িক অংশীদার ও অর্থের অন্যতম জোগানদাতা হিসেবে অনেকের কাছে পরিচিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আবদুল লতিফ হেলালী বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েটে) পড়ার সময় প্রথমে ছাত্রদলের দুর্ধর্ষ ক্যাডার এবং পরে সংগঠনটির নেতা বনে যান। আর ছাত্রদলের নেতা হওয়ার সুবাদে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের নজরে চলে আসেন এবং তার রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব পান। মির্জা আব্বাস গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী থাকাকালীন (১৯৯১-৯৬ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষদিকে) আবদুল লতিফ হেলালী এবং তার সহযোগী নুরুল ইসলাম রাজউকে মাস্টার রোলে (অস্থায়ী/দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে) সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে নিয়োগ পান। নুরুল ইসলাম বর্তমানে রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। যিনি ছিলেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসালামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি।
আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর আবদুল লতিফ হেলালী নিজেকে আড়াল করে নেন। তখন তিনি রাজউকে চাকরির পাশাপাশি মির্জা আব্বাসের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনা এবং তার শাহজাহানপুরের বাসায় থাকতেন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ফের ক্ষমতায় এলে হেলালী ও নুরুল ইসলাম রাতারাতি যেন আঙুল ফুলে কলা গাছ বনে যান। হেলালী-নুরুল ইসলাম এবং শ্রমিক দলের তৎকালীন সভাপতি আমির খসরুর নেতৃত্বে রাজউকে শুরু হয় টেন্ডারবাজি, প্লটবাণিজ্য, নিয়োগ ও বদলিবাণিজ্য। হেলালী এবং নুরুল ইসলাম দায়িত্ব নেন রাজউকের অথরাইজড অফিসারের। আর এ দায়িত্ব নিয়ে নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা না করে ৪-৫ ফুট প্রশস্ত সড়কে বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেন। শুধু তাই নয়, আবাসিক এলাকায় দেন বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন। হেলালী-নুরুল ইসলাম আমলে অনুমোদিত নকশার নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করলে এসবের সত্যতা মিলবে।
অভিযোগ রয়েছে, এই হেলালী, নুরুল ইসলাম ও খসরুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজউকে নিয়োগ পাওয়া ৩৭২ জন কর্মচারীকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে দেওয়া হয়। তাদের ছাঁটাইয়ের পরপরই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রাতারাতি ৯৬ জন কর্মচারী নিয়োগ দেয় হেলালী-নুরুল ইসলাম-খসরু সিন্ডিকেট। তবে তারা সেখানেই ক্ষান্ত দেননি, নিজেদের কর্র্তৃত্ব আরও জোরালো করতে আওয়ামী লীগ সমর্থক কর্মকর্তাদের ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করাসহ সাময়িক বরখাস্ত করে রাখেন। কারও কারও বেতনভাতাও বন্ধ করে রাখা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই সিন্ডিকেটের নিয়োগবাণিজ্যের মধ্যে রয়েছে দুজন সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কোনো লিখিত পরীক্ষা না নিয়েই দুজনের পরিবর্তে ১৬ জন সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ। যার অধিকাংশই ছিল ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা। তাদের অন্যতম একজন তৎকালীন আলোচিত হাওয়া ভবনের মালিক ও বিএনপি নেতা আলী আজগর লবীর ভাগ্নি। আবদুল লতিফ হেলালী ২০০৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার ধামরাই থেকে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টায় ছিলেন। তবে পরে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসায় তার সেই আশা ভেস্তে যায়। এই আবদুল লতিফ হেলালী বর্তমানে রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ‘আরবান রেজিলেন্স প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালক। যার প্রধান কার্যালয় রাজউকের গুলশান-১ কার পার্কিং বিল্ডিংয়ে। এ প্রকল্পের অধীনে নিয়োগ পাওয়া অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী হেলালীর নিকটাত্মীয় এবং বিএনপি-জামায়াতের আশীর্বাদপুষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে। যার ফলে প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় রাজউকের বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভয়ারণ্য হিসেবে অনেকের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প পরিচালক হেলালী কখনোই এ কার্যালয়ে দিনের বেলায় অফিস করেন না। বরং তাকে সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে তদবিরবাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। হেলালীর সঙ্গে দেখা করতে হলে তার গুলশানের অফিসে না গিয়ে সচিবালয়ের ফটকে গিয়ে অপেক্ষা করলে সাক্ষাৎ মেলে বলে লোকমুখে শোনা যায়। অভিযোগ রয়েছে, হেলালী সচিবালয়ে কর্মরত বিএনপি-জামায়াতঘেঁষা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বিএনপির হাইকমান্ডের যোগাযোগ ঘটানো ও সম্পর্ক বজায় রাখার কাজ করে আসছেন। সারাদিন সচিবালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি শেষে সন্ধ্যার পর গুলশানের প্রকল্প অফিসে হাজির হন হেলালী ও নুরুল ইসলাম। এরপর একে একে সেখানে আসতে থাকেন বিএনপি-জামায়াত সমর্থক ও আশীর্বাদপুষ্ট অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার ছক কষেন বলে অভিযোগ।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০১৯ সালের মার্চে রাজউকের প্রধান প্রকৌশলীর (বাস্তবায়ন) পদটি শূন্য হয়। তখন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের দিয়ে মন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবকে পাশ কাটিয়ে সংস্থাটির তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের যোগসাজশে কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে পদটি বাগিয়ে নেন আবদুল লতিফ হেলালী। তিনি কাজটি সহজে করতে সক্ষম হয়েছিলেন তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের বাড়ি বগুড়া জেলায় হওয়ায় এবং তার সঙ্গে বিএনপির হাইকমান্ডের গোপন যোগাযোগ থাকার সুবাদে। প্রধান প্রকৌশলীর (বাস্তবায়ন) দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রকাশ্যে চলে আসেন হেলালী এবং বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের ঠিকাদাররা জানান, ২০১৯ সালে জাতীয় শোক দিবস পালনের কথা বলে রাজউকের ছোট-বড় সব পর্যায়ের ঠিকাদারের কাছ থেকে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে তার পুরোটাই নিজে আত্মসাৎ করেন হেলালী।
তারা আরও জানান, যেসব ঠিকাদার চাঁদা দিতে পারেননি ছয় মাস তাদের বিলের ফাইল আটকে রেখেছিলেন হেলালী। চাঁদাবাজি করে তার অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি জানাজানি হলে রাজউক শাখা শ্রমিক লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতারা নড়েচড়ে বসেন। তারা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সচিবকে বিষয়টি অবহিত করেন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার হেলালীকে তলব করেন। তবে তলবে সাড়া না দেওয়ায় হেলালীর মোবাইল ফোনে কল করেন সচিব। কিন্তু হেলালী তাতেও সাড়া দেননি এবং সচিবের কল রিসিভ করেননি। একপর্যায়ে সচিবের কল না রিসিভ করা ও নিয়মিত অফিস না করার অভিযোগ এনে হেলালীকে মন্ত্রণালয় থেকে শোকজ করা হয়। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ডিপি (ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিউর) রুজু করতে রাজউককে নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ পেয়ে সংস্থাটির তৎকালীন চেয়ারম্যান সাঈদ নূর আলম হেলালীর বিরুদ্ধে ডিপি রুজু করেন। প্রধান প্রকৌশলীর পদে থেকে তার চাঁদাবাজির তথ্য প্রকাশ্যে এলে রাজউক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। চাঁদাবাজির ঘটনা জানাজানির পর থেকে হেলালী আর নিয়মিত অফিস করতেন না। প্রধান প্রকৌশলীর (বাস্তবায়ন) পদে থেকে নিয়মিত অফিসে না আসা, চাঁদাবাজি, প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অবশেষে ওই পদ থেকে হেলালীকে ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর কিছুদিন নীরব থেকে সম্প্রতি তিনি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও দেশ ও সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে রাজউক ও সচিবালয়ে কর্মরত বিএনপি-জামায়াত সমর্থক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উসকানি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এসব কর্মকাণ্ডে তার প্রধান সহযোগী রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম। যদিও বিএনপির নৈরাজ্যে সরাসরি ইন্ধন ও সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নুরুল ইসলামকে গত বছর ডিসেম্বরে সরকারি এক আদেশবলে রাজউক থেকে গাজীপুর উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষে বদলি করা হয়েছে। গত বছর ২৬ ডিসেম্বর রাজউক থেকে অবমুক্ত করা হয় তাকে। আর এরপর থেকেই সাবেক শিবির নেতা, বর্তমানে জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক ও বিএনপি-জামায়াতের অর্থের অন্যতম জোগানদাতা এই নুরুল ইসলাম প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী অবস্থান নেন। তিনি বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় রাজউক ও সরকারের সমালোচনা করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জনমনে বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছেন। একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয় ও রাজউক নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দ্রুতই বিভাগীয় মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ছাড়া তাকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যেকোনো সময় নুরুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে।