বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণের ভারে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়া পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মধ্যে ঋণসহায়তার আলোচনা কার্যত কোনো উপসংহার ছাড়াই শেষ হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রায় ১০ দিনের সফর শেষে পাকিস্তান ত্যাগ করেছে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল। কিন্তু তাদের দেওয়া শর্তের সব বিষয় মানার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি শাহবাজ শরিফ সরকার। ফলে সংস্থাটি থেকে যে ৭০০ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা পাওয়ার কথা পাকিস্তানের, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে বলে দাবি দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলোর। অনেকে বলছেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিক থেকে পরবর্তী শ্রীলঙ্কা হওয়ার পথে আরও এগিয়ে গেছে পাকিস্তান।
এদিকে বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলছে, পাকিস্তানের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ শোচনীয়ভাবে কমে ৩১০ কোটি ডলারে নেমেছে, যা দিয়ে তিন সপ্তাহের আমদানি ব্যয়ও মেটানো যাবে না। জরুরি ভিত্তিতে বিদেশি সহায়তা না পেলে কিংবা প্রবাসী পাকিস্তানিরা বিপুল রেমট্যান্স না পাঠালে শিগগিরই বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়তে যাচ্ছে দেশটি। এর মধ্যেই দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, খেলাপি তকমা এড়াতে বা দেওলিয়াত্ব কাটাতে আগামী এক বছরে সুদে-আসলে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার বা ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা; যা দেশটি ইতিমধ্যে যেসব সহায়তা প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি।
পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, আগামী এক বছরে ২ হাজার ১৯৫ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে পাকিস্তানকে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৩৪ কোটি ডলার আসল এবং বাকি ২৬০ কোটি ডলার পরিশোধ করবে ঋণের সুদ হিসেবে। তবে এ সময়ের মধ্যে কোনো বিদেশি ঋণ পাওয়ার আশা নেই বললেই চলে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি বলছে, এক মাসে দেশটিকে ৩৯৫ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। পরের তিন মাসে আরও ৪৬৩ কোটি ডলার এবং শেষের আট মাসে ১ হাজার ৩৩৭ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। আর আগামী সাড়ে তিন বছরে (ফেব্রুয়ারি ২০২৩-জুন ২০২৬) প্রায় ৮ হাজার কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
পাকিস্তান কুয়েত ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির (পিকেআইসি) গবেষণাপ্রধান সামিউল্লাহ তারিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউনকে বলেন, পাকিস্তান একটি মারাত্মক আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; আর সে জন্য প্রয়োজন ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ।
তিনি বলেন, চলমান আর্থিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বৈদেশিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আয় বাড়ানোর জন্য সব বিকল্পগুলো নিয়ে কাজ করা উচিত।
তারিক বলেন, কীভাবে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো যায়, সে ব্যাপারে নিখুঁত পরিকল্পনা করতে হবে। প্রবাসী পাকিস্তানিদের আস্থা বাড়াতে হবে এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রোশান ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে (আরডিএ) লেনদেন নিরাপদ করতে দেশীয় অর্থনীতিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।
অনাবাসী পাকিস্তানিদের বিনিয়োগ থেকে আরও বিদেশি মুদ্রা পেতে পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিনিয়োগ প্রশংসাপত্র ‘নয়া পাকিস্তান সার্টিফিকেট’-এ রিটার্নের হার সংশোধন করেছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, পাকিস্তান সরকারের উচিত বিদ্যমান ঋণ পুনর্গঠন করা, নতুন আইএমএফ প্রোগ্রামে প্রবেশ করা, আমদানি কমিয়ে রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে শ্রমিকদের রেমিট্যান্স বৃদ্ধি করা।
আরিফ হাবিব লিমিটেডের গবেষণাপ্রধান তাহির আব্বাস বলেন, পাকিস্তান সরকারের উচিত বিদেশি ঋণ ‘পুনর্গঠন’-এর পরিবর্তে ‘রি-প্রোফাইলিং’ করা। রি-প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে সরকার চীন, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বন্ধু দেশগুলোসহ দ্বিপক্ষীয় ও বাণিজ্যিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে চার-পাঁচ বছর সময় পেতে পারে ঋণ পরিশোধের জন্য।
তবে মূল্যস্ফীতিতে লাগাম পরাতে না পারলে সেটি সহজ হবে না বলেই মনে করেন তিনি। তাহির আব্বাস বলেন, দুর্বল রাজস্ব আয় এবং রুপির দরপতনের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশের ওপরে উঠতে পারে এবং ২০২৩ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ২৭ শতাংশ হতে পারে।