গায়ক তিনি, ছায়ানটে গান শিখেছেন পেশাদার গায়কের মতোই। উদীচীর সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ঢাকার বিএফ শাহীন স্কুলে ও তিতুমীর কলেজে পড়াশোনা করেছেন। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে সেনাবাহিনীর চাকরিতে যান। এ পেশার সঙ্গে পরিবারের স্বপ্নও অনেকাংশে জড়িয়ে ছিল। ব্যারাকের জীবনে ইতি টেনে জড়ান সাংবাদিকতায় ইউনিফর্মের বাইরে বেরিয়ে চাকরি শুরু করেন নিউ নেশনে, ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে। সাংবাদিক হিসেবে শুধু প্রতিবেদন নয়, কলামও লিখেছেন। সাংবাদিকতার সঙ্গে অভিনয়েও যুক্ত ছিলেন। একসময় সাংবাদিকতা ছেড়ে অভিনয়ে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন। পেশা-নেশার বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন। বিচিত্র এই জীবনে যে কাজটি বরাবর করতেন এবং করেন তা হলো, ফটোগ্রাফি। ভালো রাঁধতেও পারেন। শখ তার ঘুরে বেড়ানো; প্রায় সব জেলায় ঘুরেছেন। সময় পেলেই আড্ডায় মাতেন। শখ তার আরও আছে খেলা দেখা এবং নেটফ্লিক্সে ছবি দেখা। তিনি হাসান মাসুদ। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশবের অনেকটা সময় কেটেছে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে।
নিউ নেশন থেকে ডেইলি স্টারে যোগ দেন। ডেইলি স্টারে ছিলেন সাড়ে আট বছর। এরপর বিবিসিতে সাড়ে চার বছর কাটিয়ে সাংবাদিকজীবনের ইতি ২০০৮ সালের ৩১ মে। লেখালেখি এখনো করেন। খেলাধুলা নিয়ে কলাম লেখেন জাতীয় বিভিন্ন দৈনিকে। ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের সময় একটি জাতীয় দৈনিকে কলাম লিখেছেন। ক্রিকেট, ফুটবল ছাড়াও ছেলেদের টেনিস দেখতে বেশি আগ্রহী। ডেইলি স্টারে কাজ করার সময় বিয়ে করেন। ১৯৯৯ সালে। খেলার খবর জোগাড় করতে নানা দেশে গেছেন। স্মৃতিতে জাগ্রত ঘটনার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নেপালে যুব ফুটবলে যেবার স্বর্ণপদক পেল বাংলাদেশ, সেবার মাঠে থেকে কভার করেছি সেই ঘটনা। সে দিনটাই বিশেষ আমার কাছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন আর তেমন আড্ডা দিতে পারি না। একটা সময় বেশ আড্ডা দিতাম। বেশির ভাগ দিনই ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইবিএতে। নিজের থেকে বছর দশেকের ছোটদের সঙ্গে আড্ডা ভালো জমে।’ বন্ধুদের কথা জানতে চাইলে বলেন, ‘এ বয়সে আর বন্ধু থাকে না। কেউ কারও প্রকৃত বন্ধুও হয় না। তবে ছোটবেলার বন্ধুরা প্রকৃত বন্ধু। আমার শৈশব কেটেছে ইসলামাবাদে, সেখানকার কারও সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই।’
ফেইসবুকে শৈশবের কবির নামে এক অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ হতো। কিন্তু ২২ ডিসেম্বর ফেইসবুক আইডি হ্যাক হওয়ায় সেটাও বন্ধ এখন। এতে অবশ্য ভালোই হয়েছে। এখন হাতে অনেক সময়। তার মনে হয়, বর্তমান প্রজন্ম নতজানু এক প্রজন্ম। সব সময় মাথা নত করে কী যেন দেখে! কী দেখে? সম্ভবত আত্মিক-মতাদর্শিক বিষয়েও তারা নত মস্তক।
হাসান মাসুদ বলেন, এখন ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় ফোনে। তার লেখা বই একটাই উপন্যাস। সেটা বেরিয়েছে ২০১৬ সালে। শিরোনাম ‘একজন কনকের কথা’। লেখালেখি অনেক আছে, তবে পান্ডুলিপি করা হয়ে উঠছে না। সেনাজীবন নিয়ে একটি বই লিখবেন ভেবেছেন। কাজটা অনেকটা এগিয়েওছে।
তিনি যে অভিনেতা হবেন, ভাবনায় ছিল না। হঠাৎ করেই ১৯৯৫-এ মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ব্যাচেলর’ দিয়ে অভিনয় শুরু। এই সিনেমায় তিনি ‘আজকে না হয় ভালোবাসো’ গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন। তারপর নাটক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প অবলম্বনে প্রয়াত খালেদ খানের প্রযোজনায় একটা নাটক করেন তিনি। তাতে সহ-অভিনেত্রী ছিলেন দীপা খন্দকার। তারপর ফারুকীর ‘সিক্সটি নাইন’। নাটকের সংখ্যা এখন সঠিক বলতে পারেন না।
নাটক নিয়ে তিনি বললেন, ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার টেলিফিল্মটা আমার কাছে বিশেষ। সেটাতে যেমন কষ্ট করেছি, তেমনি মনেও দাগ কেটেছে। টানা ১০ দিন প্রচণ্ড গরমে ট্যাক্সিতে শ্যুটিং। মজার অনুভূতির কথা যদি বলতে হয়, সেটা সালাউদ্দিন লাভলুর পরিচালনায় সান টু সান সিরিয়াল। কারণ সূর্য ডুবে গেলে আর কাজ হতো না।
এখন এত কাজ আর করেন না। মাসের ৮ থেকে ১০ দিন শ্যুটিং থাকে। এখন ওয়েব সিরিজ বেশি করছেন। অবসর সময়টা তিনি নেটফ্লিক্স দেখে কাটান। বেড়ানোর নেশা শৈশব থেকেই। সেন্ট মার্টিন ও কক্সবাজার সপরিবারে ঘুরে এলেন গত সপ্তাহে। কুষ্টিয়া ছাড়া বাংলাদেশের সব জেলাতেই ঘুরে বেড়িয়েছেন।
ফটোগ্রাফি তার একরকম নেশা। সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন জায়গা কমই আছে, যেখানে তিনি যাননি বা ছবি তোলেননি। হাসান মাসুদের পছন্দের খাবারের তালিকাটা বেশ বড়। চিকেন কর্ন স্যুপ, টম ইয়াম স্যুপ যেটাকে বাংলাদেশে থাই স্যুপ বলে, গরুর মাংস, চিংড়ি খেতে ভালো লাগে তার।
তিনি বলেন, ‘রান্না তো সবাইকে কমবেশি পাড়তে হয়। আমিও ভালো রাঁধি। তবে মাছ ভাজতে জানলেও রাঁধতে জানি না। মাছ রান্নায় মসলার হিসাবটা গোলমেলে হয়ে যায়। রান্নার হাতেখড়ি বিবিসিতে কাজ করতে গিয়ে লন্ডনে। তখন রোজই রাঁধতে হতো। ছুটির দিনে বাঙালি বন্ধুরা বাড়িতে খেতে চলে আসত।’
হাসান মাসুদ বলেন, ‘ক্রীড়া সাংবাদিকতা এখন অনেক দূর এগিয়েছে। খেলা নিয়ে অনেক কিছু হচ্ছে। ক্রিকেটে তো এখন থ্রি-সিক্সটি গেম। তবে আমার তো মনে হয় আজকালের অনেক সাংবাদিক এর ফিল্ড পজিশন বোঝেন না। আমরা যখন সাংবাদিকতা শুরু করি আমি, উৎপল শুভ্র, মোস্তফা মামুন, সাইদুর রহমান, আমরা খেলা দেখে খেলার রিপোর্ট করতাম। এখন সেসব নেই।’
দেশের বাইরে তিনি শ্রীলঙ্কা দলের সাপোর্টার। ২০০৪ সালে ভারত ১৬ বছর পর পাকিস্তান গিয়েছিল খেলতে, ওই সিরিজ কভার করতে গিয়ে ৩৮ দিন ছিলেন। সংবাদ সংগ্রহের বাইরেও অনেক মজা করেছেন, ঘুরে বেড়িয়েছেন। শৈশবের স্মৃতির জায়গাগুলো খুঁজেছেন।
অভিনয় কমিয়ে দেওয়ার অনেক কারণের একটা হলো বয়স। ভালো কনটেন্টের অভাবও আছে। দেশে ভালো স্ক্রিপ্ট রাইটার কম। তাই টেলিভিশনে কাজ কমিয়ে ওয়েবে সময় বেশি দিচ্ছেন। ফারুকীর লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান দিয়ে ওয়েবযাত্রা শুরু। চরকির জন্য অনিমেষ আইচের মাকাল করেছেন। অনিমেষের আরেকটি কাজ করবেন সান টু সান। আরও কটি সিরিজের পরিচালকের সঙ্গে কথা চলছে।
গান শখের বসেই শিখেছেন। ছায়ানট থেকে নজরুলসংগীতের ওপর পাঁচ বছরের কোর্সও করেছেন। ২০০৬ সালে অনেকটা ঝোঁকের বশে হৃদয়ঘটিত নামে একটি অ্যালবামও প্রকাশ করেন। অবসরে বাসার সবাই মিলে গানের আড্ডা হয়। ফটোগ্রাফি যেহেতু নেশা, তাই এটা সব সময় করেন। নেচারের ফটোগ্রাফিই বেশি। বিশেষ করে প্রজাপতির। অনেক ধরনের প্রজাপতির ছবি আছে তার কাছে। তিনি বলেন, ‘যখন যেভাবে থাকি, সেই সময়টা সেভাবেই উপভোগ করি। আমি সময়কে উপভোগ করতে জানি।’