বহু দেশের সংকট দূর হয়েছে আইএমএফের ঋণে

আব্দুল বায়েস। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। অর্থশাস্ত্রে বিশাল পান্ডিত্য তার। ৪০ বছর ধরে জড়িত অধ্যাপনার সঙ্গে। ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য। বর্তমানে আছেন ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে। খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে। আইএমএফের ঋণপ্রাপ্তি, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আর্থিক খাতে এর প্রভাব এবং গণমানুষের জীবনমান নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বললেন দীর্ঘক্ষণ। হৃদ্যিক সেই আলাপচারিতা তুলে ধরা হলো পাঠকের উদ্দেশে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান।

দেশ রূপান্তর : জাতীয় অর্থনীতির যে বাস্তবতায়, আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়া হলো তাতে কি সংকট কাটবে?

আব্দুল বায়েস : কাটবে তো বটেই। তবে সংকটের মাত্রা কতটুকু, আর আমি পেয়েছি কতটুকু- এই দুটোর হিসাব করতে হবে। বর্তমানে যে সংকটের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি এবং সামনে যে সংকট দেখা দেবে- তা উত্তরণে, এই ঋণ সমস্যার সমাধান আনবে।

দেশ রূপান্তর : পেয়েছি কতটুকু? এটা কোত্থেকে পাব? কে দেবে- সরকার?

আব্দুল বায়েস : না। এটা তো দেবে, আইএমএফ।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু এর ফলে সাধারণ জনগণের ওপর, বাড়তি একটা চাপ তৈরি হবে না?

আব্দুল বায়েস : বাড়তি চাপ অনেক আগেই আসা উচিত ছিল। তাহলে আজ আইএমএফের কাছে যাওয়ার দরকার ছিল না।

দেশ রূপান্তর : যেমন?

আব্দুল বায়েস : আগেই যদি ট্যাক্স রেট বাড়ানো হতো জিডিপির অনুপাতে, করপোরেট শাসন সংস্কার করে, অটোমেশন এনে, বর্তমান সমস্যার সমাধান করা যেত। এসব তো ১৫ বছর ধরে কথা হচ্ছে। এই যে বিভিন্ন সেক্টরে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে, এটা কেন? আমাকে আগে, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক থাকতে হবে।

দেশ রূপান্তর : এর মানে, আমাদের ব্যর্থতার কারণেই ঋণ নিতে হলো?

আব্দুল বায়েস : অবশ্যই। তবে এটা পুরোপুরি ‘ব্যর্থতা’ না বলে, পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা বলা ভালো। তবে এটাও ঠিক, পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় ব্যর্থ হয়েছে বলেই- প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছে। সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে বলেই, এই মার্কেট ইকোনমির উৎসব। একটা ব্যর্থতা, আরেকটার জন্ম দেয়।

প্রথম দিকে যখন আইএমএফের ঋণ নেওয়া হতো, তখন মিছিল-মিটিং-জ্বালাও পোড়াও হতো। এখন তো ‘টুঁ’ শব্দও কেউ করে না। কেন করে না? তারা বুঝতে পেরেছে, বাস্তবতা অনেক কঠিন। আমার মনে হয় ঋণ, ‘আপাত’ একটা স্বস্তি দেবে। কিছু দিনের জন্য। এই সময়ের মধ্যে যদি বিভিন্ন সংস্কার না করতে পারে, তাহলে সরকারকে পস্তাতে হবে। চড়া মূল্য দিতে হবে।

দেশ রূপান্তর : ব্যাংক ব্যবস্থাপনা সংস্কার, দুর্নীতি হ্রাস, অর্থ পাচার রোধ এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সরকারের আগ্রহ কেমন?

আব্দুল বায়েস : এবারই প্রথম না। এর আগেও আইএমএফের ঋণ নেওয়া হয়েছে। তখনো এসব শর্ত ছিল। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? 

দেশ রূপান্তর : এসব বিষয়ে সরকারের আগ্রহ কম- এটাই আপনি বলতে চাইছেন?

আব্দুল বায়েস : নেই তো। একেবারেই নেই। সরকারের আগ্রহ হলো- ব্যাংক লুট হচ্ছে? ঠিক আছে। কিছু টাকা দিয়ে, এটিকে বাঁচিয়ে রাখো। দেখো- বেসিক ব্যাংক, ফার্মারস ব্যাংক এসব প্রতিষ্ঠানকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। কেন? এদের পারফরমেন্স কী? সমাজে এদের অবদানই বা কী? কিচ্ছু না। আমি কেন বলছি না- এই দায় আমি নেব না? মিল-কলকারখানা সব কিছুই তো।  হ্যাঁ, সংস্কার করা কঠিন। এটি অ্যান্টিবায়োটিকের মতো। বর্তমানে কষ্ট দেবে। তবে, ভবিষ্যতে ভালো ফল দেবে।

দেশ রূপান্তর : আরেকটু পরিষ্কার করলে ভালো হতো? 

আব্দুল বায়েস : সরকারের সারপ্লাস বাড়বে। বাজেট ডেফিজিট কমবে। সরকার সেটিকে উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে পারবে। বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে ব্যয় করতে পারবে। আমাদের এখানে ট্যাক্স রেট অনেক কম। মাত্র ১০%। ২০-৩০% সব দেশে।

দেশ রূপান্তর : তাহলে কি আপনি কর বৃদ্ধির কথা বলছেন?

আব্দুল বায়েস : না, না। তা বলছি না। ব্যক্তির ওপর কর বৃদ্ধির কথা বলছি না। নেট কর বাড়ানোর কথা বলছি। দুটো উপায়ে, রাজস্ব বাড়ানো যায়। এর একটি হচ্ছে- নেট বাড়ানো। উপজেলা পর্যায়ে যে সমস্ত বাড়ি-গাড়ি, তারা কি সবাই ট্যাক্স দেয়? আর,  ব্যাংক কারা তৈরি করে? খেলাপি কারা? সেখানে সুব্যবস্থা আনতে হবে।

দেশ রূপান্তর : বিদ্যুৎ, জ¦ালানি, সারের ক্ষেত্রে ভর্তুকি তুলে দিলে সমাজে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে?

আব্দুল বায়েস : কৃষিতে কোনোভাবেই ভর্তুকি কমানো যাবে না। এটা প্রয়োজনীয়।  যত শর্তই তারা দিক। এটা ঠিক হবে না।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু নিত্যপণ্যের মূল্য তো দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে না?

আব্দুল বায়েস :  তা তো অবশ্যই। কিন্তু তা হচ্ছে, সরকারের অদক্ষতার জন্য। কারণ, চুরি-অপচয়-দুর্নীতি আমি থামাতে পারছি না। সেই দায় পড়ছে, সাধারণ মানুষের ওপর। একটা উদাহরণ দিই। এই যে, ব্যাংকে সুদের হার- এত বেশি কেন? এর কারণ হচ্ছে- হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে যারা ডিফল্টার, ব্যাংকের সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া হয়- সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। দায়ভার সব সাধারণ মানুষের। তাতে কোনো সংকট হবে না। আইএমএফ যত শর্তই দিক, লাভ নেই। মনে রাখতে হবে, এই সরকার

কৃষিবান্ধব। কৃষির ওপর কোনো হুমকি এলে, এটা মেনে নেওয়া হবে না। এই সরকার কৃষিক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়নি। দেবেও না। তবে কৃষিক্ষেত্রে কিছু দুর্নীতি আছে।  

দেশ রূপান্তর : ম্যাক্রো অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাব পড়বে?

আব্দুল বায়েস : হ্যাঁ, পড়বে তো। তবে, ক্রাইসিসের সময় আমাকে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশে একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে লাভ আছে? সব লস। শুধু বিপিসি, যেটা মনোপলি। সেটা প্রচুর লাভ করে। কিন্তু প্রতিযোগিতা করে লাভ করেছে, এমন একটা খাতও নেই। কিন্তু কোরিয়াতে আছে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস লাভ করছে। সেখানে বাংলাদেশ বিমান লস করে, রেলওয়ে লস করে- তাকে বাঁচাতে হবে! তাদের ভর্তুকি দিতে হবে। কেন? আমি বুঝি না।

দেশ রূপান্তর : বিশ্বের অনেক দেশ, আইএমএফের ঋণ নিয়ে বিপদে পড়েছে। আমাদের কি তেমন কোনো সম্ভাবনা আছে?

আব্দুল বায়েস : বিপদে পড়েছে অনেক দেশ- পড়বেই তো? পৃৃথিবীর বহু দেশ আইএমএফের ঋণ নিয়ে সমস্যার সমাধান করেছে। আবার কেউ কেউ পানিতে পড়েছে। ঋণ নিয়ে, ঘি খেলে তো তাই হবে। টাকার সুষ্ঠু ব্যবহার হলে, তেমনটি হওয়ার কারণ নেই। এটা ক্ষুদ্রঋণের মতো। তবে বাংলাদেশ অনেক ভালো অবস্থায় আছে। একদম ‘বটমলেস বাস্কেট’ থেকে আজকের পর্যায়ে আসতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। পরের স্টেজ কিন্তু অনেক কঠিন। 

দেশ রূপান্তর : কেমন?

আব্দুল বায়েস : এখন প্রবৃদ্ধির হার গড়ে, ৬%। নিতে চাই, ৮-৯%। আমরা অনেক ভালো অবস্থায় আছি। তবে প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে হলে, অনেক পরিশ্রম করতে হবে। যদিও আমাদের মাথাপিছু আয়, প্রায় ২,৯০০ ডলার।

দেশ রূপান্তর : মাথাপিছু আয় বা পার ক্যাপিটা ইনকাম- বিষয়টা কি সমাজে, সঠিক চিত্র দেয়? কারণ, দেশের সবার আয় তো সমান না? এখন জনসংখ্যার হিসাবে তাকে ভাগ করলে কি তা, বাস্তবসম্মত হবে?

আব্দুল বায়েস : (মুচকি হেসে) তা ঠিক না। এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। সারা পৃথিবীতেই এটা চলছে। এই ইনডিকেটরটাই নিতে হবে। এই হিসাব ছাড়া আর কোনো হিসাব কেউ তো দিতে পারে না। সারা পৃথিবীতেই, তাই। আমাদের সময় গরিবরা তো স্যান্ডেল পরত না। এখন পরে। এখন সাধারণ মানুষের আয় বেড়েছে। এটা তো সত্যি।

তবে, সমাজে বৈষম্য বেড়েছে অনেক।

দেশ রূপান্তর : এই বৈষম্য কমিয়ে আনার কোনো পথ নেই?

আব্দুল বায়েস : কেন থাকবে না। অনেক পথ আছে। যাদের আয় বেড়েছে, তাদের কাছ থেকে ৫০% ট্যাক্স নিলেই হয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই, এভাবে নেওয়া হচ্ছে। নরওয়ে, সুইডেন, কানাডায় তো তাই হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : আইএমএফের বিভিন্ন শর্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-  বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পরিবেশ তৈরি, মানব দক্ষতা বৃদ্ধি, আর্থিক খাতে সুশাসন, এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করা। এসব ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কেমন? 

আব্দুল বায়েস : এগুলো জটিল কিছু না। দিতে হয়, তাই দিয়েছে। একটা আমলাতান্ত্রিক বিষয় আছে না? তবে কিছু বিষয় তো আন্তরিকতা থাকলে, উন্নত করাই যায়। যেমন ধরো, ঋণখেলাপির বিষয়। এটা তো কঠিন কিছু না। এসব হচ্ছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়। এটা তো কোনো টেকনিক্যাল বিষয় না। বাংলাদেশ যত জায়গা থেকে টাকা এনেছে, এই শর্ত ছিলই। 

তবে মোদ্দাকথা হচ্ছে, এই ঋণটাকে ‘গোল্ডেন অপরচুনিটি’ মনে করে- সংস্কারগুলো করে ফেলা। দেরি করা ঠিক হবে না। সংস্কারবিরোধী মনোভাব তো একটা আছেই। বাই নেচার, বাংলাদেশ সোশ্যালিস্ট ওরিয়েন্টেড সোসাইটি। জন্মের থেকেই, আমাদের মধ্যে বামপন্থি একটা চিন্তাভাবনা কাজ করে। প্রীতিলতা, কমরেড মণি সিংহ, কমরেড ফরহাদের বংশধর আমরা। একটা সোশ্যালিস্ট ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে আমাদের জন্ম। যদিও আওয়ামী লীগ বুর্জোয়া অর্থনীতির দ্বারাই পরিচালিত।

  দেশ রূপান্তর : পুঁজিবাজারের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে?

আব্দুল বায়েস : আমার মনে হয় না।