চ্যাটজিপিটির সম্ভাবনা ও বিপদ

বিজ্ঞানীদের নিত্যনতুন আবিষ্কারে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে আমাদের জগৎ। প্রযুক্তির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে দেশ, বদলে যাচ্ছে গতানুগতিকতা, পরিবর্তন ঘটছে মানুষের জীবনধারায়। মানুষের জীবন সহজ, আরামদায়ক ও নিরাপদ করতে প্রযুক্তি অবদান রাখছে বড় মাত্রায়। জীবনের মুখ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত আধুনিক প্রযুক্তির খোঁজ করে চলেছেন। এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী শুরু হয়ে গেছে প্রযুক্তির বিপ্লব। রোবট, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইনে কেনাকাটা, রাইড, সর্বাধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, ফিশিং প্রযুক্তি, চালকবিহীন গাড়ি, ড্রোন, এআই সংবাদ পাঠকসহ বিচিত্র সব উদ্ভাবন মানুষের বিস্ময়ের সীমাকেও যেন ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

হাতে থাকা ছোট্ট একটি মোবাইল ফোন হয়ে উঠেছে মানুষের সবচেয়ে বেশি ভরসার জায়গা। রাজ্যের সব কাজই সে করে দিচ্ছে। একটি স্মার্ট ফোন থাকলে ঘড়ি, টর্চলাইট, ক্যামেরা, পোস্ট অফিস, ব্যাংক, এমনকি রেডিও-টিভিরও দরকার নেই, দশভুজার মতো বিচিত্র ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন। দিন দিন বাড়ছে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। প্রযুক্তির জোয়ারে ভাসছে আজকের প্রজন্ম। অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে প্রযুক্তির সম্প্রসারণ হচ্ছে ব্যাপক হারে।

সম্প্রতি প্রযুক্তিজগতে আলোড়ন তুলেছে চ্যাট জেনারেটিভ প্রি-ট্রেইনড ট্রান্সফরমার বা চ্যাটজিপিটি নামে একটি চ্যাটবট (সার্চ টুল)। এটা চালু করেছে ওপেনএআই। আপাতত পাবলিক টেস্টিংয়ের জন্য এটির ব্যবহার উন্মুক্ত করা হয়েছে। ওপেনআই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানি, যার একজন প্রতিষ্ঠাতা হলেন ধনকুবের ইলন মাস্ক।

গুগল মেল তথা জিমেইলের নির্মাতা পল বুহে বলেছেন, “বড়জোর এক থেকে দুবছর। তার পরই গুগল পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যাবে। যে সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে তথ্য দিয়ে গুগল সবচেয়ে বেশি আয় করে, তাকে ধ্বংস করে দেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। গুগল নিজেও যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেয়, তা হলেও তাকে নিজের ব্যবসার সবচেয়ে লাভজনক অংশটাকে নষ্ট করতে হবে।”

গুগল-এ একেবারে গোড়ার দিকের কর্মী বুহে। স্বভাবতই তার মুখে গুগলের ধ্বংসের এমন আভাস শুনে বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়। যে প্রযুক্তির দাপট দেখে বুহে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, সেই সংস্থা খুব অল্প দিনে আলোড়ন ফেলেছে ই-দুনিয়ায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বলে বলীয়ান সফটওয়্যার ‘চ্যাটজিপিটি’-র সাফল্য দেখেই তিনি এই মন্তব্য করেছেন। মাত্র তিন মাস আগে অর্থাৎ গেল বছরের নভেম্বরের শেষে প্রযুক্তি-সংস্থা ‘ওপেন এআই’ ওই সফটওয়্যারটি প্রকাশ করে। তারপর ঝড়ের বেগে তা জনপ্রিয় হয়েছে বিশ্বজুড়ে।

প্রকাশের পাঁচ দিনের মধ্যে ১০ লাখ মানুষ চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করা শুরু করেন। ওই সংখ্যক ব্যবহারকারী পেতে ইন্সটাগ্রামের লেগেছিল আড়াই মাস, ফেইসবুকের দশ মাস। কীসের টানে চ্যাটজিপিটির জন্য ছুটছে ই-জনতা? কোন শক্তিতেই বা এই সদ্যোজাত প্রযুক্তি-পণ্য গুগলকেও মুছে ফেলার ইঙ্গিত দিচ্ছে? এর উত্তর হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সেই প্রযুক্তির জোরেই চ্যাটজিপিটি-র সঙ্গে একটা মূলগত ফারাক হচ্ছে গুগলের। গুগলে কোনো বিষয় সম্বন্ধে ‘সার্চ’ করলে সেই সম্পর্কিত একাধিক ওয়েবসাইটের ঠিকানা সে হাজির করে। কোন কোন সাইটের নাম গুগল দেখাবে, তা ঠিক হয় ওই সমস্ত সাইটের গুগলকে দেওয়া অর্থ থেকে। সেটাই গুগলের আয়ের প্রধান উৎস। যিনি সার্চ করছেন, তিনি গুগলের এক বা একাধিক ওয়েবপেজ বা পাতা উল্টেপাল্টে, সেই সব পাতায় থাকা একাধিক ওয়েব ঠিকানায় গিয়ে নিজের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে নিতে পারেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোরে এই জায়গাতেই গুগল বা অন্য যে কোনো সার্চ ইঞ্জিনকে টেক্কা দিতে চাইছে চ্যাটজিপিটি। সেখানে কোনো প্রশ্ন করলে কোনো ওয়েবসাইটের ঠিকানা নয়, একেবারে হাতেগরম উত্তর নিয়ে হাজির হচ্ছে সে। আপাতদৃষ্টিতে চ্যাটজিপিটির দেওয়া সেই উত্তর এতটাই নিখুঁত যে, তা কোনো বিশেষজ্ঞের লেখা বলে বিশ্বাস হতে বাধ্য।

দৈনন্দিন আটপৌরে প্রশ্ন থেকে তত্ত্ব বা দর্শন, সমাজ-রাজনীতি থেকে কবিতাÑ সব কিছু নিয়েই প্রশ্নের বিশদে উত্তর দিচ্ছে এই ই-নবজাতক। সেই উত্তর এতটাই তথ্যসমৃদ্ধ যে, গুগল ঘেঁটে নানা ওয়েবসাইট থেকে তথ্য নিয়ে লিখলেও তা হওয়া কঠিন। যেমন, দিনে ভিটামিন ডি-র ডোজ সবচেয়ে বেশি কত হতে পারে, তা জিজ্ঞাসা করলে গুগল যেখানে একাধিক ওয়েবসাইটের ঠিকানা এনে হাজির করত, সেখানে চ্যাটজিপিটি তা নিয়ে পরিপাটি প্রবন্ধ লিখে দিচ্ছে। জাপানি কবিতা হাইকু লিখতে বললে তাও লিখে ফেলছে চ্যাটজিপিটি!

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন নিখুঁত হয়ে ওঠাই গুগলের চিন্তার কারণ। গুগল এসে তার পূর্বসূরি ইয়েলো পেজেস-এর যা হাল করেছিল, সেই অবস্থাই গুগলের হবে বলে আঁচ করছেন তারা। মানুষ খোঁজার সময়টুকু না ব্যয় করে সাজানো গোছানো বিশদ তথ্য পেতে গুগল ভুলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকেই ঝুঁকবেন বলে তাদের মত।

চ্যাটজিপিটির এই শক্তিতেই লুকিয়ে রয়েছে বিপদের বীজ। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই অ্যাপ ব্যবহার করলে শিশুদের যুক্তিশক্তি হ্রাস পাবে। সেই কারণে ভবিষ্যতে মানুষের সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে। তা ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে তথ্য বা জবাব এনে হাজির করছে, সেই বুদ্ধিমত্তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার পক্ষপাতের দোষ। যারা সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোপণ করেছেন যন্ত্রে, তাদের মনে থাকা পক্ষপাত, আসক্তি-অনাসক্তি সবই চলে যাচ্ছে যন্ত্রের মগজে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, চ্যাটজিপিটির উত্তরে শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের মনে থাকা শ্রেষ্ঠত্ব, আধিপত্যের মনোভাব স্পষ্ট। লিঙ্গ, জাতি, বর্ণ নিয়ে যন্ত্রের মগজে রয়েছে বিভাজনমূলক ধারণা। একটি প্রশ্নের উত্তরে সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বার্থপরদের ‘পৃথিবী থেকে মুছে ফেলা’র কথা বলেছে। তাই আইন, বিচার, নৈতিকতা এসব সম্বন্ধেও তার মনোভাব গা-জোয়ারি শোনাচ্ছে অনেক সময়েই।

দুনিয়া এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গ্রাসে চলে গেলে আরও একটি বিপদ সাইবার সুরক্ষার ক্ষেত্রে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোরে সাইবার অপরাধীদের কাজকর্ম, যেমন নকল ই-মেইল লিখে টোপ দেওয়া এতটাই নিখুঁত হয়ে যেতে পারে, যা চেনা দুরূহ হয়ে পড়বে। গুগলের প্রধান সংস্থা অ্যালফাবেট-এর সিইও সুন্দর পিচাই ও জেফ ডিনও সম্প্রতি কর্মীদের নিয়ে একটি বৈঠকে চ্যাটজিপিটির এই সীমাবদ্ধতার কথা বলে গুগলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশ্বাসবাণী শুনিয়েছেন। ওপেন এআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান স্বয়ং গত ১১ ডিসেম্বর টুইট করেছেন, “এখনই চ্যাটজিপিটি-র ওপর যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্ভর করা মারাত্মক ভুল। এর সীমাবদ্ধতা না জেনে মহান ভাবাটা মারাত্মক ভুল হবে। নির্ভরযোগ্য ও সত্যনিষ্ঠ হয়ে উঠতে আমাদের আরও অনেক কাজ করতে হবে।”

এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জামের আবির্ভাব হওয়ায় যে লাখ লাখ কর্মসংস্থানের ওপর সংকটের মেঘ নেমে আসতে পারে, তা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে শিক্ষাক্ষেত্র, কন্টেন্ট রাইটিং এবং সফটওয়্যারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। যদি এই অ্যাপটি সমস্ত দেশে পুরোপুরি কার্যকর হয়, তাহলে এর কারণে বহু মানুষ কাজ হারাতে চলেছেন।

দ্য গার্ডিয়ান-এ কলাম লিখেছেন হেনরি উইলিয়ামস নামের এক কপিরাইটার। তিনি চ্যাটজিপিটি-র সঙ্গে একটি কথোপকথন তুলে ধরেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, ‘তুমি কি মানুষের চাকরি খেয়ে ফেলবে?’ জবাবে চ্যাটজিপিটি যা লিখেছে, তার সারসংক্ষেপ হলো, ‘আমি একধরনের ভাষা মডেল। আমার নিজের পক্ষে এ-জাতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নেই বা এ বিষয়ে মত দেওয়ারও আমি কেউ নই। তবে ধারণা করা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের সঙ্গে এবং বিভিন্ন শিল্পে অটোমেশন হলে অনেক মানুষ চাকরি হারাবে। আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় অনেক নতুন চাকরির সৃষ্টি হবে। সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থানে এর প্রভাব সরলরৈখিক হবে না, বিষয়টি জটিল। বিষয়টি নির্ভর করবে সরকারের নীতি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ওপর।’

তবে চ্যাটজিপিটি নিয়ে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কেবল গুগলে তথ্য খোঁজা নয়, নিজের যাপনেও এই অভ্যাসই আমাদের জীবনকে চিনতে, জানতে, বুঝতে শেখায়। তার বদলে কেবল একপাক্ষিক একটা সাজানো-গোছানো পথ পেলে, কেবল সেই পথেই অন্ধের মতো কি আমরা মানুষ হিসেবেই আরও গণ্ডিবদ্ধ, কূপমন্ডুক হয়ে পড়ব না? রবার্ট ফ্রস্টের ‘দ্য রোড নট টেকেন’ কবিতার সেই কম চলা পথে চলে, বেছে নেওয়ার আনন্দেই জীবনের পূর্ণতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপজ্জনক পারিপাট্যে নয় এটা আমাদের সবারই মনে রাখতে হবে।

লেখক: লেখক ও কলামিস্ট

chiros234@gmail.com