অনেকেই ভয় পাচ্ছেন যে চীন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত একটা যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। তা যদি হয়, তাহলে তার প্রতিক্রিয়া হবে বিশ্বব্যাপী। বিশ্বের ইতিহাসে এ রকম ১৬টি উদাহরণ আছে, তার মধ্যে ১২টিই শেষ পর্যন্ত শেষ হয়েছে যুদ্ধে। প্রাচীন গ্রিসে এথেন্স চ্যালেঞ্জ করেছিল স্পার্টা-কে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে জার্মানি চ্যালেঞ্জ করেছিল ব্রিটেনকে, ঠিক তেমনি এ যুগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করছে চীনের উত্থান। ওয়াশিংটন আর পেইচিংয়ের দ্বন্দ্ব হচ্ছে আজকের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নির্ণায়ক ঘটনা।
অনেকে বলেন, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হয়তো এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধও শুরু হতে পারে। তবে এ যুগে তার কেন্দ্রে থাকবে প্রযুক্তিগত প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা। কারণ মেধাস্বত্ব চুরি, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য এবং গুপ্তচরবৃত্তিএকাধিক কারণে চীনা প্রযুক্তিকে উদ্বেগের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তারা ভয় পাচ্ছে যে, চীন হয়তো শিগগিরই এমন সব প্রযুক্তিতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নিয়ে নিতে পারে, যার ওপর ভবিষ্যতের উন্নয়ন নির্ভর করবে। কারণ আগামী দশকেই চীন একটা বৈশ্বিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চায়। তবে চীনের যদি অর্থনৈতিক উন্নতি অব্যাহত থাকে তাহলেই এটা সম্ভব হবে। কিন্তু যাই ঘটুক, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বন্দ্ব থেকেই যাবে। এ ক্ষেত্রে কৌশলগত হিসেবে হঠাৎ কোনো ভুলের বিপদ সব সময়ই আছে। কারণ এ উত্তেজনা নিরসন কীভাবে করা হবেতা তো কোনো বইয়ে লেখা নেই।
সাম্প্রতিককালে গোয়েন্দাবৃত্তির উপকরণ হিসেবে বেলুনের ব্যবহার হয় না বললেই চলে। ফরাসি বিপ্লবের সময় প্রথমবারের মতো গোয়েন্দা বেলুনের ব্যবহার হয়েছিল। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের সময় গুপ্তচররা বাইনোকুলার নিয়ে এ ধরনের অতিকায় বেলুনে চড়ে শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করত। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরের ওপর নজরদারির জন্য এ বেলুন ব্যবহার করেছিল। সেই আমলে গোয়েন্দা বেলুন বাতাসের টানে অনেক সময় দিগ্ভ্রান্ত হয়ে যেত।
কিন্তু এখনকার আধুনিক বেলুন ক্যামেরা, রাডার ও রেডিও ডিভাইসসজ্জিত থাকায় তা সাধারণত পথ হারায় না। আর এরই মধ্যে স্পাই স্যাটেলাইট প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি হয়েছে। এ ছাড়া দূর থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনুষ্যবিহীন ড্রোন চলে আসায় নজরদারির জন্য এখন আর বেলুন ব্যবহৃত হয় না। তবে বেসামরিক গবেষণার কাজে এখনো কোথাও কোথাও এগুলো ব্যবহার করা হয়।
অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানার আকাশে একটি চীনা বেলুনের উপস্থিতি দুদেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। গবেষণার কাজে বেসরকারি উদ্যোগে এ বেলুন ওড়ানো হয়েছিল বলে চীন দাবি করা সত্ত্বেও এ ঘটনার জের ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন তার চীন সফর বাতিল করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে পেন্টাগন ঘোষণা করেছিল, তারা আন্তঃমহাদেশীয় পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদস্থল মন্টানার আকাশে ভাসমান একটি বেলুনের গতিবিধির ওপর নজর রাখছে। ওই সময় অতিকায় বেলুনটিকে ভূপাতিত করলে সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে মনে করে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সেটিকে গুলি করে ফেলতে বারণ করেছিলেন। তবে ৪ ফেব্রুয়ারি সেটি পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি আসার পর মার্কিন বিমানবাহিনী সেটিকে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভূপাতিত করে। পেন্টাগন বলেছে, যে বেলুনটি তারা ভূপাতিত করেছে, সেটি চীনের স্পাই স্যাটেলাইটের চেয়ে বেশি তথ্য দেওয়ার মতো সক্ষমতাবিশিষ্ট নয়। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধীরগতির কারণে কক্ষপথে স্থাপন করা কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহের তুলনায় এসব বেলুন থেকে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে ভূপৃষ্ঠের ছবি তোলা যায়। এ ছাড়া ধাতব ড্রোন বা এয়ারক্র্যাফট যত সহজে রাডারে ধরা পড়ে, তত সহজে এসব বেলুন ধরা পড়ে না।
ভূমি থেকে প্রায় ৮০ হাজার ফুট ওপরে রাডারের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব বেলুন কয়েক সপ্তাহ ভেসে থাকতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো এই বেলুন উড়িয়ে চীন আসলে কী ফায়দা হাসিল করতে চেয়েছিল? পেন্টাগন বলেছে, বেলুনটি কানাডার আকাশসীমা পার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে ঢোকার পরই তারা সেটির অবস্থান শনাক্ত করে। মন্টানা ও নর্থ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যে কিছু পারমাণবিক অস্ত্র উৎক্ষেপণ ঘাঁটি আছে। এসব ঘাঁটির ওপর দিয়েই মূলত বেলুনটি উড়ছিল। বিষয়টি উল্লেখ করে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, স্পষ্টতই বেলুনটি নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরস্পরের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরির অভিযোগ করা নতুন কিছু নয়। পেইচিং দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, মার্কিন জাহাজ ও বিমান থেকে চীনের সীমানার কাছে গিয়ে নজরদারি করে থাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এর জবাবে বলে আসছে, তারা আন্তর্জাতিক জলসীমা ও আকাশসীমা থেকে তাদের নজরদারি কাজ চালিয়ে থাকে। এ ছাড়া আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সীমায় গোয়েন্দা বেলুন দেখা গেছে, যদিও সেগুলো এই বেলুনের মতো ছিল না। কিছু বিশ্লেষক বলেছেন, বেলুনটি হয়তো ভুলক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে চলে গিয়েছিল; অথবা এমনও হতে পারে মার্কিন নজরদারি সক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে সেটিকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে পাঠিয়েছিল। এই গোয়েন্দা বেলুন ভূপাতিত করার প্রভাব এখন দুদেশের কূটনীতির ওপর পড়েছে। পাঁচ বছরের বেশি সময় পর কোনো মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে ব্লিঙ্কেনের চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি সফর বাতিল করায় দুদেশের সম্পর্কে আরও শীতলতা নেমে এলো। ওদিকে চীনের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে ‘অনিচ্ছাকৃত এ ঘটনায়’ দুঃখ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাবে। তবে এ টানাপড়েনের রেশ কত দূর গড়াবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়।
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে, এমন কোনো বিষয়ে সমঝোতা করতে পেইচিং কি আগ্রহী? চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হলো তাইওয়ান। চীন তাদের সামরিক বাহিনীকে এমনভাবে তৈরি করেছে, যেন প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে হলেও তাইওয়ানকে পেইচিংয়ের শাসনের অধীন রাখা যায়। পেইচিংয়ের এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, সামরিক বাহিনীর হুমকি তুলে নেওয়া হলে তাইওয়ানের জনগণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসবে। এরপরের বিপজ্জনক ইস্যু হচ্ছে দক্ষিণ চীন সাগর। এই সাগরকে চীন তাদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। আর যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরকে আন্তর্জাতিক জল ও আকাশসীমা বলে মনে করে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বৈরিতা বহুমুখী। কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও মতাদর্শিক। নীতিগতভাবে দুদেশের নেতারা সম্পর্ক মেরামতের আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করলেও বাস্তবে সেটা অর্জনের সহজ কোনো রাস্তা নেই।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
raihan567@yahoo.com