তবুও বন্ধু এরদোয়ান-পুতিন

প্রতিবেশী তুরস্কের সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ইস্যুতে মতবিরোধ রয়েছে রাশিয়ার। তা সত্ত্বেও ন্যাটোর পুরনো সদস্য ও মস্কোর এক সময়ের শত্রু আঙ্কারা দিন দিন বড় বন্ধু হয়ে উঠছে। লিখেছেন নাসরিন শওকত

মাত্র পাঁচ বছর আগের কথা। সিরিয়ার সীমান্তে ঢুকে ‘অলিভ ব্রাঞ্চ’ অভিযান শুরু করে তুর্কিয়ে (তুরস্ক)। তুর্কির বিশেষ বাহিনী ব্যাপক বিমান হামলা, সারি সারি সাঁজোয়া কামান ও পদাতিক ট্যাংক নিয়ে সিরিয়ার এলাকাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করে। তুর্কি সামরিক বাহিনীর এই হামলা শুরু হওয়ার মাত্র একদিন আগে সিরিয়া সরকারের অনুরোধে অঞ্চলটিতে ঘাঁটি গাড়ে রুশ বাহিনী। এই ঘটনা মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যে চরম উত্তেজনার জন্ম দেয়। তবে কূটনৈতিক এই  টানাপড়েনেও সম্পর্ক ছিন্ন করেনি এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র। সিরিয়া, ককেশাস ও ইউক্রেন সংঘাত তখনো তাজা। গুরুতর এই রাজনৈতিক স্বার্থ উভয় পক্ষকেই আপসের টেবিলে নিয়ে আসে। একটি গঠনমূলক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনাও চালিয়ে যায় তারা। রাশিয়ার তুরস্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এক সময়ের শত্রু ও ন্যাটোর সবচেয়ে পুরনো এই সদস্য রাষ্ট্রটি কীভাবে রাশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী অংশীদার হয়ে উঠেছে।

সিরিয়া সংকট

সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ আলেপ্পো। এর কুর্দি অধ্যুষিত শহর আফরিন। এই শহরটি পরস্পরবিরোধী দুটি কুর্দি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একটি ‘কুর্দি পিপল ডিফেন্স ফোর্সেস’, অপরটি বিদ্রোহী (মিলিশিয়া) কুর্দিদের দল ‘ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টি’। আফরিনের কাছাকাছি স্থানে এই বিদ্রোহীদের কিছু গোষ্ঠী সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। এর জবাবে সিরিয়ার সরকারি বাহিনীও পাল্টা হামলা চালাতে গিয়ে তুরস্ক সীমান্তের কাছাকাছি চলে আসে। আঙ্কারাও পাল্টা আক্রমণ চালায়। ২০১৮ সালের ২০ জানুয়ারি, আফরিনের ওই দুই কুর্দি বাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে পরিচালিত হওয়া এই অভিযান ‘অপারেশন অলিভ ব্রাঞ্চ’ নামে পরিচিত। এই ঘটনা মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যে চরম উত্তেজনার জন্ম দেয়। ফলে সম্পর্কের অবনতি হয় এই দুই দেশের মধ্যে।

আরও এক বছর আগে ফেরা যাক। আফরিনের কুর্দিদের সঙ্গে বিরোধী পক্ষের পুনর্মিলন কেন্দ্রের একটি গোষ্ঠীকে পরিচয় করিয়ে দেয় রাশিয়া। তখন থেকে রুশ সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি এক ধরনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি হয়ে ওঠে কুর্দিদের জন্য। ‘অলিভ ব্রাঞ্চ’ অভিযানের শুরুর দিকে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীকে আলেপ্পোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের তেল রিফাত এলাকায় স্থানান্তরিত করা হয়। এর অর্থ হলো, তুরস্ক যে কুর্দিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে, সেই কুর্দিদেরই নিরাপত্তা দিচ্ছে রাশিয়া। এতে মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যকার দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। তখন কুর্দিরা মনে করেছিল, তুরস্কের সামরিক বাহিনীর ওপর হামলার জন্য রাশিয়া সবুজ সংকেত দিয়েছে। এতে তুরস্ক ও কুর্দি বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এই প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মিডিয়া গ্রুপ রসিয়া সেগোদনিয়া রাউন্ড টেবিলে সামরিক বিশেষজ্ঞ ভøাদিমির ইভসিভ বলেছেন, ‘ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক। তাই রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব কল্পনা করা খুব কঠিন। রাশিয়া চাইলেই তখন তুরস্কের বিমান ভূপাতিত করতে পারত। কিন্তু মস্কো তা করেনি।’ এখানে দুই দেশের মধ্যে অন্য স্বার্থ কাজ করেছে। অলিভ ব্রাঞ্চ অভিযান সমাপ্তির পর সিরিয়া ইস্যু একাধিক ক্ষেত্রে রাশিয়া-তুর্কি সম্পর্ককে হুমকির মুখে ফেলার প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে। তখন তুর্কি সামরিক বাহিনীর সমর্থনে বিদ্রোহী মিলিশিয়ারা সিরিয়ার সরকারি সেনাবাহিনীর অবস্থান ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে। রাশিয়ার মহাকাশ বাহিনীর সহায়তায় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশারের সেনারা হামলাটি প্রতিহত করে। এর ফলে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সম্পর্কের আবারও অবনতি ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিদরা দুটি বহিরাগত শক্তির (মস্কো-আঙ্কারা) মধ্যে সত্যিকারের সামরিক সংঘর্ষের সম্ভাবনায় শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মধ্যে আলোচনা হয়, যা শেষ পর্যন্ত ওই উত্তেজনার অবসান ঘটায়।

ককেশীয় সমস্যা

মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব শুধুমাত্র সিরিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দশকের আরও একটি বেদনাদায়ক সমস্যাও রয়েছে, যার কেন্দ্র ককেশাস অঞ্চল। এখানকার নাগার্নো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে সশস্ত্র বিরোধে জড়িত আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান। সম্প্রতি ককেশাসের এই বিরোধ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তুরস্ক প্রকাশ্যে আজারবাইজানের পক্ষকে সমর্থন করছে। অন্যদিকে রাশিয়া এই অঞ্চলে শান্তিরক্ষার জন্য মধ্যস্থতার চেষ্টা ও কূটনৈতিক আলোচনা করে। কিন্তু এই মধ্যস্থতা করতে গেলে রুশ বাহিনীর সঙ্গে তুর্কিদের সংঘর্ষ বাধে। এখানেও দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট পুতিন ও এরদোয়ান এখনো বিষয়টি নিয়ে সরাসরি আলোচনা করেননি। নাগার্নো-কারাবাখের বিষয়ে তাদের শেষ আলোচনা হয় ২০২২ সালের ১ নভেম্বর। এর পরই রুশ প্রেসিডেন্ট তার তুর্কি প্রতিপক্ষকে আজারবাইজানের রাষ্ট্রপতি ইলহাম আলিয়েভ ও আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ানের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসার আহ্বান জানান। দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্ক এখন এই পর্যায়ে রয়েছে। দুই দেশের প্রেসিডেন্ট নিয়মিত যোগাযোগও রাখছেন। এটি রাশিয়ার জন্য একটি চাপের বিষয়ও বটে। কারণ এই দ্বন্দ্ব সমাধান না হলে তুর্কি ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হবে, যেটা রাশিয়া একেবারেই চায় না। রাশিয়া মূলত ন্যাটোভুক্ত দেশ তুরস্কের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখে চলতে চায়। যাতে পশ্চিমা দেশগুলোকে চাপে রাখা যায়। একই স্বার্থ রয়েছে তুরস্কেরও। দেশটি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ ছুড়তে চায়।

ইউক্রেন সংকট

রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সসম্যায় রূপ নিয়েছে। এটিকে এখন শুধুমাত্র দুই দেশের সংকট বলা যাচ্ছে না। রাশিয়া-ইউক্রেন-তুরস্ক পাশাপাশি দেশ। ফলে এই অঞ্চলে সবার নিজ নিজ স্বার্থ থাকায় মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যকার সম্পর্কের নির্ধারক হিসেবে হাজির হয়েছে এই যুদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে তুরস্ক চাইছে যেভাবেই হোক রাশিয়া-ইউক্রেন তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলুক। এজন্য একমাত্র মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর আগেই এরদোয়ান ইউক্রেন সংকটে আঙ্কারাকে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব দিতে অনুরোধ করেছিলেন পুতিনকে। ২০২২ সালের শেষ দিকে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছিলেন, ‘আমরা এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করি। বিশেষ করে ক্রিমিয়ার তুর্কিদের বিষয়ে। আমরা আমাদের রুশ বন্ধুদের সঙ্গে বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে এই বিষয়গুলো নিয়ে বারবার আলোচনা করেছি। আমরা চাই না যে, এই অঞ্চলটিতে  যুদ্ধ প্রভাব বিস্তার করুক।’

এদিকে কিয়েভ ‘ক্রিমিয়া প্ল্যাটফর্ম’ নামে রাশিয়াবিরোধী এক শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। আঙ্কারা সেখানে অংশগ্রহণ করে এবং ইউক্রেনকে সামরিক ড্রোন সহায়তা দেয়। আঙ্কারার এই অবস্থানকে স্পষ্টতই নিরপেক্ষ ভাবতে পারছে না রাশিয়া। তাই তাকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও আপাতত মানতে নারাজ মস্কো। তারপরও এই দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী হওয়ায় নানা ইস্যুতে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে স্বার্থ জড়িত রয়েছে।

দৃঢ় বন্ধন

উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট ন্যাটোর মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার তুরস্ক। এদিকে পশ্চিমা এই সামরিক জোটের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হলো রাশিয়া। কিন্তু সেই ন্যাটোর সদস্য তুরস্কের সঙ্গে রাশিয়ার দা-কুমড়া সম্পর্ক হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে আঞ্চলিক রাজনীতির বেশ কিছু বিষয় নিয়ে অর্ন্তদ্বন্দ্ব ও মতবিরোধ রয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশ দুটি নিজেদের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আর এই সম্পর্ক মজবুত হওয়ার প্রধান কারণ মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যকার পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, যা শেষ কয়েক বছরে দ্রুতগতিতে বেড়েছে। ২০২১-২০২২ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা ২০২১ সালের প্রথম ৯ মাসের তুলনায় দ্বিগুণ। এই লেনদেনের ক্ষেত্রে রাশিয়া পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোকে বাদ দিয়ে বেশির ভাগ পণ্যই আঙ্কারা থেকে আমদানি করে।

এই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা প্রসঙ্গে রুশ গণমাধ্যমকে দ্য ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড ইকোনমি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক ভিক্তর নাদেইন- রায়েভস্কি বলেছেন, ‘বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে উচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যা দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তির একটি। আঙ্কারা এ বছর রপ্তানিতে রেকর্ড গড়েছে এবং রপ্তানি করা এই পণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল মস্কোর। রাশিয়ার মতো এমন বাণিজ্যিক বন্ধুকে হারালে অর্থনৈতিক দিক থেকে তুরস্ক বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।’

এছাড়াও রাশিয়ার জ¦ালানি সম্পদের ওপরও যথেষ্ট নির্ভরশীল তুরস্ক। এর আগে তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদলু এজেন্সি এক প্রতিবেদনে দাবি করে যে, আঙ্কারা রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অন্য সরবরাহকারীদের দিকে ঝুঁকছে (এনার্জি মার্কেট রেগুলেশন অথরিটির মাসিক প্রতিবেদন অনুসারে)। এই প্রতিবেদন সত্ত্বেও রুশ ফেডারেশন জ¦ালানির ক্ষেত্রে এখনো তার শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে।

এরই মধ্যে তুরস্কের প্রথম পারমাণবিক কেন্দ্র আক্কুয়ো নির্মিত হচ্ছে। দক্ষিণ উপকূলের মার্সিন প্রদেশে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করে দিচ্ছে রাশিয়া। বিশেষজ্ঞ  নাদেইন-রায়েভস্কি মস্কোর এই পদক্ষেপকে দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে মনে করেন। বৈশি^ক পারমাণবিক শিল্পের ‘নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি’ মডেলের প্রথম প্রকল্প আক্কুয়ো। মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যে এই প্রকল্পের চুক্তিটি সই হয় ২০১০ সালে, যার প্রকল্প ব্যয় আনুমানিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ নাদেইন-রায়েভস্কি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘আঙ্কারার মূলধন বিনিয়োগ ছাড়াই এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুরো নির্মাণ ব্যয় বহন করছে রাশিয়া। তুর্কি গ্রাহকরা আগের সম্মত মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে এই  ঋণ পরিশোধ করবেন। এই মডেল রাশিয়ার জন্য বেশ লাভজনক। আমরা তুরস্ককে একটি গ্যাস কেন্দ্রে (হাবে) পরিণত করছি, যারা ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করবে। এটা আঙ্কারার জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগও। যেহেতু সে (তুর্কিয়ে) জ¦ালানির সরবরাহকারী হবে, তাই দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে দরকষাকষিরও সুযোগ থাকবে তার হাতেই। তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তুরস্ক অবশ্যই কম দামে তা বিক্রি করবে না।’

এদিকে রাশিয়ার অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস-এর ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের একজন সদস্য আমুর গাজিয়েভ বলেছেন, ‘তুরস্ক ও রাশিয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা অর্জন করেছে। যার মধ্য দিয়ে নিজেদের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক ও গঠনমূলক আলোচনা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে তারা।’ এই বিশেষজ্ঞ গণমাধ্যম আরটিকে বলেছেন, ‘উভয় দেশই একে অপরের নীতি ও স্বার্থকে সম্মান করে চলে এবং পরস্পরের প্রতি সম্মানজনক যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য একটি প্রক্রিয়াও তৈরি করেছে। তাদের মধ্যকার আলোচনার এই ধরনটি তুরস্ক ও ন্যাটো বা তুরস্ক ও অন্য পশ্চিমা রাষ্ট্রের মধ্যে যে আলোচনা হয়, একেবারেই সেই মনিব-হুজুর গোছের নয়। আরও স্পষ্ট করে বললে, দুুটি সমশক্তির রাষ্ট্রের মধ্যকার আলোচনা এটি। একটি কার্যকরী দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার নেপথ্যের রহস্য এটিই।’ অপরদিকে এরদোয়ান ও পুতিনের সম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করে নাদেইন-রায়েভস্কি বলেছেন, ‘এই দুই শীর্ষ নেতার মধ্যকার ব্যক্তিগত সম্পর্কও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পুতিন এরদোয়ানকে প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী একজন ‘‘খাঁটি মানুষ’’ বলে মনে করেন। অবশ্য তুর্কি প্রেসিডেন্টের জন্য এটি একটি নতুন পরিচয়ও বটে! রুশ প্রেসিডেন্টের বাধ্যবাধকতার প্রতি এতদিন আনুগত্য দেখিয়ে এসেছেন এরদোয়ান।’

আমুর গাজিয়েভের মতে, এই দুই দেশের দৃঢ় সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উভয় পক্ষই পারস্পরিক চুক্তির অধীনে নিজেদের বাধ্যবাধকতা নিয়মমাফিক মেনে চলে। সিরিয়া দখলের সময়কার কাঠামো নির্ধারণ, কারাবাখ চুক্তি এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোতে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।