সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জেলার আদালতে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনায় আইন ও বিচারাঙ্গনে উদ্বেগ ও শঙ্কা বেড়েছে। গত চার মাসে পিরোজপুর, খুলনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নীলফামারী জেলা আইনজীবী সমিতির ৩১ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট।
বিচারকের সঙ্গে অশালীন আচরণ, বিচারককে হুমকি দেওয়া, অদালতে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় স্লোগান এবং বিচারকাজে বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগ উঠেছে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে। এক মাসের বেশি সময় ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতে ঘটে যাওয়া ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, অতীতে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও এখনকার মতো কখনো হয়নি। বিচারপ্রার্থীরা যাতে জিম্মি না হয়ে পড়েন সে জন্য বিচারক-আইনজীবীদের আরও সহনশীল হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। কারণ বিচারাঙ্গন ও আইনাঙ্গনের পরিপূরক হচ্ছে আইনজীবী (বার) ও আদালত (বেঞ্চ)।
এক মাসের বেশি সময় ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতে অস্থির পরিস্থিতির অনেকটাই অবসান হয়েছে। গত মঙ্গলবার থেকে স্বাভাবিক বিচারকাজ চলছে। যদিও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ ফারুকের এজলাস বর্জন অব্যাহত রয়েছে। তিনি ছুটিতে থাকায় এ আদালতের বিচারকাজ পরিচালনা করছে অন্য একটি নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল।
বিচারপ্রার্থীদের শেষ আশ্রয়স্থলে কেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তা জানতে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বারের শীর্ষ আইনজীবী এবং আদালতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর।
তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আদালতের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি; কিছু আইনজীবীর প্রভাব বিস্তারের প্রয়াস, কিছু আইনজীবীর বাড়াবাড়ি আচরণ; আইনজীবী ও বিচারকদের ‘ইগো’ সমস্যা বা নিজ সিদ্ধান্তে স্থির থাকা, কোনো কোনো বিচারকের বিচক্ষণতার ঘাটতি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অনুজ্জ্বল ভূমিকা এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার নেপথ্যে : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিচারকের সঙ্গে আইনজীবীদের অপ্রীতিকর ঘটনা ও আইনজীবীদের আদালত বর্জনের ঘটনার নেপথ্যে নানা কারণ আলোচিত হচ্ছে। জেলা ও দায়রা আদালতের নাজির মো. মোমিনুল ইসলামের (ইতিমধ্যে বদলি হয়েছেন) বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও জেলার শীর্ষ বিচারকদের ভুল বুঝিয়ে পরিস্থিতি অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করেছেন আইনজীবীরা। জেলার প্রবীণ ও শীর্ষ আইনজীবীদের অনেকে মনে করেন, বিচারক ও আইনজীবীদের ইগো বা ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা পরিস্থিতি অন্যদিকে নিয়ে গেছে। আবার আইনজীবীদের অনেকে অত্যুৎসাহে উদ্ধত আচরণ করেছেন।
আইনজীবীরা বলেন, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির মোমিনুল ইসলাম আদালত চত্বরে ১৫-২০ জন ভেন্ডারকে অবৈধভাবে বসান। ভেন্ডারদের কোর্ট ফি দেওয়ার জাল সিøপ ও জাল স্ট্যাম্প বিক্রি, ২ টাকার কোর্ট ফি ১০ টাকায় বিক্রি করার বিষয়ে আপত্তি তুললেও মোমিন মাসোহারা নিয়ে তাদের পক্ষেই অবস্থান নেন। তার বিরুদ্ধে আদালতের রায়, আদেশ ও নিষেধাজ্ঞার আদেশ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ রয়েছে আইনজীবীদের। এসব বিষয়ে জেলা ও দায়রা জজ শারমিন নিগারকে অবহিত করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উপরন্তু মোমিনের বিরুদ্ধে বিচারক শারমিন নিগারকে ভুল বোঝানোর অভিযোগ তুলেছেন বারের শীর্ষ আইনজীবীরা। মোমিনের বিরুদ্ধে গত বছর ৭ ডিসেম্বর জেলা বারের সাধারণ সভায় সিদ্ধান্তের নিরিখে দুদকে ১০ ডিসেম্বর অভিযোগ করা হয়।
আইনজীবীরা বলেন, বার ভবন থেকে জেলা ও দায়রা জজ আদালত পর্যন্ত যেতে একটি রেইনশেড নির্মাণের চেষ্টা করে জেলা বার। জেলা জজ ও জেলা প্রশাসককে জানিয়ে গত বছর ২ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হয়। জেলা বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মফিজুর রহমান বাবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯টি খুঁটি বসানোর পর কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। আমরা অপারগতা প্রকাশ করি। ভেন্ডারদের কাছ থেকে মোমিনের মাসোহারা নেওয়ার বিষয়টি জেলা ও দায়রা জজকে অবহিত করি। কিন্তু আমাদের বলা হয়, মোমিন মসজিদের জন্য এ টাকা নেন। এ ছাড়া শহরের পুরাতন কাচারি এলাকায় টিনশেডসহ চার শতাংশ জায়গা কোটি টাকার বিনিময়ে নাজির মোমিন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে কয়েকজনকে শত বছরের জন্য লিজ দেন, যা তার এখতিয়ারের বাইরে।’
কয়েকজন আইনজীবী বলেন, গত বছর ১ ডিসেম্বর অবকাশ ছুটি শুরুর আগে আইনজীবীরা মামলা দাখিল করতে গেলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ ফারুক মামলা নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। আইনজীবীরা চাপাচাপি করলে তাদের প্রতি আপত্তিকর মন্তব্য করেন তিনি। এ ঘটনায় ২৬ ডিসেম্বর সাধারণ সভা করে ১ জানুয়ারি থেকে ওই বিচারকের আদালত বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ১ জানুয়ারি আইনজীবীদের অনুপস্থিতিতে বিচারক আটটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। আইনজীবীরা মনে করেন, তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। গত ২ জানুয়ারি বিচারক মোহাম্মদ ফারুক রীতির বাইরে গিয়ে পুলিশি পাহারায় এজলাসে ওঠেন। ওইদিন বেশ কয়েকজন আইনজীবী এজলাসে অশোভন আচরণ করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৩ জানুয়ারি বিচারকরা আদালতে প্রতীকী বিচারকাজ করে চলে যান। ওইদিন শীর্ষ বিচারকরা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে বৈঠক করেন। এরপরই তারা আদালতের সব ফটকে তালা ঝুলিয়ে কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। আইনজীবীরাও পাল্টা কর্মসূচি দেন। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ৫ জানুয়ারি জেলা বারের কয়েকজন আইনজীবীকে হাইকোর্ট আদালত অবমাননার রুল দিয়ে তলব করলে আইনজীবীদের একাংশ বিচারকদের অপসারণের দাবিতে কর্মসূচি পালন শুরু করেন।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তানভীর ভূঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জাল কোর্ট ফি ও স্ট্যাম্প বিক্রয়কারীদের উচ্ছেদ করেছিলাম। নাজির মোমিন তাদের আবারও বসানোর ব্যবস্থা করেন এবং জেলা ও দায়রা জজকে ভুল বুঝিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে উসকে দেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ন্যায়সংগত কারণে মাঠে আছি। মোহাম্মদ ফারুকের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত তার আদালত বর্জন চলবে।’
বার কাউন্সিলের অনুজ্জ্বল ভূমিকা : সারা দেশে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার পর এ ধরনের পরিস্থিতি যাতে আর না ঘটে তার উদ্যোগ নেয় বার কাউন্সিল। গত ২৮ জানুয়ারি বার কাউন্সিল ভবনে জেলা বারের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বর্ধিত সভা করেন নেতারা। কিন্তু সেখানে বক্তব্য দেওয়া নিয়ে বিবাদে জড়ান সরকারপন্থি ও বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। ওইদিন বার কাউন্সিল থেকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়ার কথা বলা হলেও কাজের কাজ হয়নি। বার কাউন্সিলের একজন সাধারণ সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অতীতে আদালতে অপ্রীতিকর ঘটনায় বার কাউন্সিলের সিনিয়র নেতারা তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামলেছেন। এবার তেমনটি হয়নি।
বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান (অ্যাটর্নি জেনারেল) এএম আমিন উদ্দিন ও ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। বার কাউন্সিলের কমপ্লেইন অ্যান্ড ভিজিল্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ রাজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। জেলা বারের শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কেউ যেন আদালতে অসহিষ্ণু আচরণ না করেন।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে বিচারক-আইনজীবী উভয়ই অনড় অবস্থানে থাকেন। আইনজীবীদের অনেকেই হয়তো বাড়াবাড়ি করেছেন। এজলাসে বিচারকদের গালি দেওয়া, হুমকি দেওয়া ঘোরতর অন্যায়। কিন্তু তারা কেন এমন করছে তা খুঁজে বের করা উচিত। আমার মনে হয়, উচ্চ আদালত দুপক্ষকেই ডেকে তাদের বক্তব্য শুনে সমাধান দিতে পারে। বার কাউন্সিলরকেও আরও বলিষ্ঠ হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আদালতে এখন মূল সমস্যা দুর্নীতি। প্রায়ই এ প্রসঙ্গটি উঠছে। বিচারকদের অধস্তনরা যে দুর্নীতি করে এতে সন্দেহ নেই। এর ফলে আইনজীবীর মধ্যে অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়।’
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোমতাজ ফকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুডিশিয়ারি ও আইনজীবী মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একটা পরিবারের মতো। পরিবারে যেমন ঝগড়া হয় তেমনি আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যেও মাঝেমধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। আশা করি, পরিস্থিতি আর খারাপের দিকে যাবে না। সত্বর সমস্যার সমাধান হবে।’