ব্রয়লারের কেজি ৩৫০ টাকা!

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে চড়া দামে খাবার সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ কারসাজির প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। এখানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ৩৫০ টাকা কেজিতে সরবরাহ করা হয়। রোগীদের সব খাবারই চড়া দামে সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালে বাজারের দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে রোগীদের খাবার সরবরাহ করে সরকারের কোটি কোটি টাকা তছরুপ করা হচ্ছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, খাবারের মূল্যতালিকা দরপত্র কমিটির মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছে।

জামালপুর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে জেলার সাত উপজেলা এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী, রাজিবপুর ও পাশের শেরপুর জেলার রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। সব সরকারি হাসপাতালের মতো এ হাসপাতালের অন্তঃবিভাগেও ভর্তি রোগীদের তিন বেলা খাবার (পথ্য) সরবরাহ করে সরকার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারের মাধ্যমে এ খাবার সরবরাহ করে থাকে।

হাসপাতালের প্রশাসনিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে হাসপাতালের অন্তঃবিভাগে ভর্তি রোগীদের খাবারের (পথ্য) তালিকায় সকালের নাশতায় পাউরুটি, সাগর কলা, ফার্মের মুরগির ডিম, চিড়া, চিনি, দুধ ও বিস্কুট দেওয়া হয়। দুপুরে ও রাতের খাবারে ভাত, খাসির মাংস, ডিম, রুই/কাতলা মাছ, ফার্মের মুরগির মাংস, গ্রাস কার্প মাছ ও বিভিন্ন সবজি থাকে। রুটিন অনুযায়ী একেক দিন একেক ধরনের খাবার রোগীদের দেওয়া হয়।

গত বছর ১ নভেম্বর কার্যকর হওয়া ডায়েট স্কেলের তালিকা থেকে জানা যায়, হাসপাতালে সরবরাহ করা প্রতি কেজি ফার্মের মুরগি ৩৫০, প্রতিটি ডিম ১৬, প্রতিটি সাগর কলা ১১ টাকা ৫০ পয়সা, দুধ প্রতি লিটার ৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি এলাচ ২ হাজার ৬০০, ভাত ৮৫, প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ২৩০, প্রতি কেজি খাসির মাংস ১ হাজার ৫০, প্রতি কেজি মসুরের ডাল ১৭০, প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ১৫০ ও প্রতি কেজি রুই/কাতলা মাছ ৪৫০ টাকা ধরা হয়েছে। ছোটখাটো অন্যান্য পণ্যের দামও বাজারের দামের চেয়ে বেশি ধরা হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভর্তি রোগীদের খাবার সরবরাহের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাসুম এন্টারপ্রাইজকে নির্বাচিত করেছে। নির্ধারিত দাম গত বছর ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য সরবরাহ করা খাবারের দাম বাজারের দামের চেয়ে অনেক বেশি। হাসপাতালে সরবরাহ করা প্রতিটি খাবার (পথ্য) শহরের বাজারে অনেক কম দামে পাওয়া যায়। হাসপাতালের তালিকায় থাকা পণ্য বাজারের দামের চেয়ে বেশি দাম ধরে দরপত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কারসাজিতে প্রতি বছরই খাবারের দামে এমন অনিয়ম করা হয়। হাসপাতালের খাবারের মান নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচার এ অনিয়মের জন্য দায়ী। অনিয়ম বন্ধ করে সরকারি টাকা তছরুপের হাত থেকে রক্ষা করা ও ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত খাবার সরবরাহ করার দাবি জানায় স্থানীয়রা।

গত মঙ্গলবার সকালে পৌর শহরের স্টেশন বাজারের মুরগি ব্যবসায়ী মো. সুরুজ্জামানের সঙ্গে কথা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, এখন খুচরা বাজারে ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগে প্রতি কেজি ১৩০-১৫০ টাকায়ও বিক্রি হয়েছে। ব্রয়লার মুরগি কখনো ৩৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়নি।

স্টেশন বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ী রাজীব সাহা দেশ রূপান্তরকে জানান, খুচরা বাজারে এখন মোটা চাল ৫৫, তেল ১৮৫ টাকা লিটার, প্রতিটি ডিম ১১ আর ডাল (মোটা) প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি এলাচ ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজার এখন ঠিকঠাক আছে। কোনো সমস্যা নেই। হাসপাতালের পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে পাঁচ দিন আগে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছেন মাদারগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালিয়ার সোলাইমান হোসেন। তার স্বজনরা বাড়ি থেকে খাবার দিয়ে যান। তা-ই তিনি খান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতালে যে খাবার দেওয়া হয় তার মান খারাপ। খাওয়া যায় না। যে পরিমাণ খাবার দেওয়া হয় তা দিয়ে হয়ও না। পরিমাণে কম।’

পুরুষ সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে কথা হয় মেলান্দহ উপজেলার ঝাউগড়ার হারুন অর রশিদের সঙ্গে। খাবারের বিষয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে যে খাবার দেওয়া হয় তা দিয়ে হয় না। তাই বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসতে হয়।’

মাদারগঞ্জের ঝাড়কাটার হামিদা বেগম শারীরিক দুর্বলতা ও পায়ের গিঁটে ব্যথা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনকার খাবার আমি খাইতে পারি না। এই খাবার অনেকেই খায় না। বাড়ি থাইক্যা খাবার নিয়ে আসতে হয়।’

জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহে অনিয়ম আমরা প্রতি বছরই লক্ষ করি। মূল্যতালিকায় যেসব পণ্য কখনোই দেওয়া হয় না, সেসবের দাম বাজারের দামের চেয়ে অনেক কম দেখানো দেয়। আর যেসব পণ্য/খাবার নিয়মিত দিতে হয়, সেগুলোর দাম বাজারের দামের চেয়ে অনেক বেশি ধরা হয়।’

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতালের খাবারের মূল্যতালিকা দরপত্র কমিটির মাধ্যমে নির্ধারিত। নির্ধারিত ঠিকাদারকে আমরা খাবার সরবরাহের অনুমোদন দিয়েছি।’