ইবি ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনা তদন্তের নির্দেশ হাইকোর্টের

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করতে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে এই নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা ছাত্রলীগ নেত্রী ও তার সহযোগী ছাত্রীকে ক্যাম্পাসের বাইরে রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া নির্যাতনের শিকার ওই শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে হাইকোর্টের আদেশে। এ সংক্রান্ত রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেয়।

নির্যাতনের অভিযোগটি তদন্ত করতে একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী অধ্যাপক এবং প্রশাসন ক্যাডারের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি করতে বলেছে হাইকোর্ট। কমিটির প্রতিবেদন পরবর্তী সাতদিনের মধ্যে জমা দিতে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসনকে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় ইবি প্রশাসনের করা কমিটির প্রতিবেদনও হাইকোর্টে দাখিল করতে বলেছে আদালত।

এর আগে গত রবিবার রাতে ইবি শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সানজিদা চৌধুরী ও তার অনুসারীরা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশরতœ শেখ হাসিনা হলের গণরুমে প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীর ওপর নির্যাতন চালান বলে অভিযোগ ওঠে। রাতভর নির্যাতনের পর তাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করা হয় বলে জানিয়েছেন ওই ছাত্রী। এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন গত বুধবার হাইকোর্টের নজরে আনেন আইনজীবী গাজী মো. মহসীন ও আজগর হোসেন তুহিন। আদালত তাদের বিষয়টি লিখিত আকারে আনতে বলে। এরপর দুই আইনজীবী এ বিষয়ে রিট আবেদন করেন। আদালতে আবেদনের শুনানিতে ছিলেন অ্যাডভোকেট গাজী মো. মহসীন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়।

অভিযুক্তরা ক্যাম্পাসে, ভুক্তভোগী আতঙ্কে : ইবি ক্যাম্পাসে প্রথম বর্ষের ছাত্রীকে নির্যাতনের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, অভিযুক্তরা ক্যাম্পাসে হলেই অবস্থান করছে। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি করেছে। কিন্তু দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ নির্যাতনের শিকার ছাত্রী ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়িতে গিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ক্যাম্পাসে ফিরে ক্লাস করতে চাই। কিন্তু যেতে ভয় পাচ্ছি। আমার নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে এখনো প্রশাসন থেকে যোগাযোগ করা হয়নি।’

তবে হাইকোর্টের গতকালের আদেশের পর শেখ হাসিনা হলের প্রভোস্ট অভিযুক্তদের ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ দেন। তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন ওই হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. শামসুল আলম। এ প্রসঙ্গে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশের পর অভিযুক্তদের ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী শনিবার থেকে হলের তদন্ত কমিটির কাজ শুরু হবে।’ প্রভোস্টের নির্দেশের পর গতকাল সন্ধ্যার পর অভিযুক্ত দুজন হল ছেড়ে ক্যাম্পাসের বাইরে চলে যান বলে জানা গেছে। 

এদিকে শেখ হাসিনা হলে নির্যাতনের এই ঘটনার পর ছাত্রীরা গণরুম ছেড়ে বাসায় চলে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। আতঙ্কে ও পারিবারিক চাপে বাধ্য হয়ে তারা বাসায় ফিরে যাচ্ছেন। এমনই একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথম বর্ষের ছাত্রীকে নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে পরিবার জানতে পেরে বাসায় যেতে বলেছে। এজন্য বাসায় যাচ্ছি। এছাড়াও হলে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এমন পরিবেশ স্বাভাবিক করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

ইবি প্রশাসনের তদন্ত কমিটি শুরু করেনি কাজ : ছাত্রী নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে ইবি প্রশাসনের গঠন করা তদন্ত কমিটি এখনো কাজ শুরু করেনি বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই কমিটির আহ্বায়ক আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. রেবা ম-ল গতকাল বলেন, ‘আজ হাইকোর্টের নির্দেশনার বিষয়টি শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে আগামীকাল তদন্ত কমিটির সবাই বসব। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

সার্বিক বিষয়ে ইবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের বিষয়টা জেনেছি। হাইকোর্ট থেকে আমাদের কাছে একটা নির্দেশনা আসবে। আমি ইতিমধ্যে প্রক্টরিয়াল বডি ও পুলিশ প্রশাসনকে ভুক্তভোগী ছাত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টি জানিয়েছি। আশা করছি আগামী রবিবারের মধ্যে হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা আসবে। এরপর অফিশিয়ালি লিখিতভাবে হল কর্র্তৃপক্ষকে অভিযুক্ত ছাত্রীদের ক্যাম্পাস ছাড়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও সিকিউরিটি অফিসকে জানিয়েছি।’