উদযাপনে একুশ পোশাকে বর্ণমালা

ভাষার মাসে একুশের রঙ হিসেবে সাদা আর কালো আমাদের ভাবনার জগৎকে অধিকার করে আছে। সেই সঙ্গে ছাই ও ঘিয়ে, কখনো লাল রঙও জায়গা করে নিয়েছে। ফ্যাশন হাউজগুলো পোশাকের নকশায় নানাভাবে একুশের মোটিফ ও রঙ তুলে ধরে একুশ উদযাপন করেন। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

একুশের পোশাকে সবার প্রথমে আসে রঙ। প্রধান বিষয় হচ্ছে বাংলা ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন সেসব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা বোঝাতে সাদা ও কালো রঙ। এ দুটো রঙ ছাড়া একুশকে কোনোভাবেই প্রকাশ করা যায় না। নকশায় নিত্যনতুনত্ব আনতে পোশাকে সাদাকালো রঙের ব্যবহারের পাশাপাশি শুরু হয়েছে একুশের মোটিফ, কবিতা, স্লোগান ও বর্ণমালা। পোশাকের অবয়ব অলংকরণে নানাভাবে বর্ণমালাকে মোটিফ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একুশের পোশাকে দেশীয় রীতি ধরে রাখতে শাড়ি, কামিজ, কুর্তা, ফতুয়াকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পোশাকের নকশায় মাধ্যম হিসেবে আছে ব্লকপ্রিন্ট, স্ক্রিনপ্রিন্ট, মেশিন ও হ্যান্ড এমব্রয়ডারি। পোশাকে সাদা-কালো রঙের ব্যবহার প্রসঙ্গে নিত্য-উপহারের কর্ণধার বাহার রহমান বলেন, ‘পোশাকে কালো রঙের ব্যবহার কারণ বাংলা বর্ণমালা আমরা কালো কালিতে লিখি, আবার শোক হিসেবেও কালো রঙ ব্যবহার হয়। একুশের রক্তাক্ত ইতিহাস, তাই লাল যোগ হয়েছে। আর শুদ্ধতার প্রতীক সাদা রঙকে সমতল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আগে একুশকে শুধু শোক দিবস হিসেবে পালন করা হতো। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও। তাই এই অর্জনকে বোঝাতে লাল রঙ যোগ করা হয়েছে।’

ফ্যাশন হাউজ বিবিয়ানার স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার লিপি খন্দকার বলেন, ‘সাদা-কালো রঙ কিন্তু মৌলিক রঙ। স্বাধীনতার আগে এ দেশের মেয়েদের পোশাক ছিল শাড়ি আর রঙ ছিল সাদা কোড়া। এরপর সাদা শাড়ির চিকন পাড়ে এলো কালো রঙ। আর সাদা শাড়ির চিকন কালো পাড়ই একুশে ফেব্রুয়ারির পোশাক হয়ে গেল। আর ছেলেদের প্রভাতফেরির পোশাক ছিল খাদির সাদা পাঞ্জাবি। কিন্তু দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে পোশাকের রঙ ও ধরনেরও বদল ঘটেছে। একুশের প্রধান বিষয় হচ্ছে শোকের সঙ্গে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো। এ ভাবগম্ভীর বিষয়টি কালো রঙ দিয়ে বোঝানো হয়। আর সাদার অর্থ হচ্ছে শুদ্ধতা ও শ্রদ্ধা। তাই এ দুটি রঙ ছাড়া একুশকে কোনোভাবেই বোঝানো সম্ভব নয়। যেহেতু আমাদের আত্মত্যাগ আর লড়াই ছিল ভাষার জন্য, সেহেতু ভাষা ও বর্ণমালা এখানে অনেক বেশি সংযুক্ত। একুশের পোশাকে সাদা-কালোর সঙ্গে বর্ণমালা কিংবা কোনো পঙ্ক্তিমালা কিংবা কোনো মোটিফ ছাড়া ভাবাই যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারির পোশাকে সাদা-কালোর সঙ্গে অল্পস্বল্প লালও দেখা যাচ্ছে। শাড়ির পাশাপাশি সালোয়ার-কামিজ, কুর্তা, টপ, শার্ট, টি-শার্টও জায়গা নিয়েছে।’

প্রভাতফেরির পোশাকে সাদা সুতির কাপড়ের মধ্যে নানা ধরন দেখা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ডুয়েট ঐতিহ্যের স্বত্বাধিকারী অনুপ কুমার শীল বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারিতে সাদা বা কালোর আবেদন সব সময়ই থাকবে। দেশি কাপড় আর সাদা-কালো রঙ এই দুটি মিলেই তৈরি হয়েছে আমাদের একুশের পোশাক কিংবা প্রভাতফেরির পোশাক। তবে এখন শাড়ি ও পাঞ্জাবির পাশাপাশি সালোয়ার-কামিজ, টি-শার্টও প্রাধান্য পাচ্ছে।’

প্রভাতফেরির পোশাক প্রসঙ্গে বিশ্ব রঙের কর্ণধার বিপ্লব সাহা জানালেন, ‘সাদা মানেই হচ্ছে শুদ্ধতা, পবিত্রতা ও শ্রদ্ধা। কালোর মধ্যেই রয়েছে সব রঙ। যদিও আমরা কালোকে অশুভ বা শোকের প্রতীক বলেই বিবেচনা করি। তবে এটিও সত্য যে, কালো ছাড়া গভীরতা অনুধাবন করা যায় না। কালোর গুরুত্ব কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। সাদা আর কালোর মিশেলেই প্রকাশ পায় আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। তাই একুশের পোশাক হিসেবে শাড়ি, পাঞ্জাবি, সালোয়ার কামিজ, শার্ট, টি-শার্ট, টপ যেকোনো কিছুই হতে পারে। রঙ হিসেবে সাদা-কালো অ্যাশ এবং লাল রঙকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আর নকশা হিসেবে বর্ণমালা, কবিতা, গান, স্লোগান, দেশাত্মবোধক নানা মোটিফ থাকতে পারে।’

অঞ্জন’স-এর স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার শাহীন আহম্মেদ বলেন, ‘সাদা এমন একটা রঙ, যা কখনো কারও ভালো লাগবে না এমনটা হতে পারে না। সাদা রঙ মানসিক শান্তি ও স্বস্তি দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের সময়ের শুরু থেকেই সাদা পোশাকের প্রচলন ছিল। সাদা পোশাকের ওপরে কালো কাপড়ের শোকের ব্যাজ পরতে দেখা যেত। এখন অবশ্য সাদা-কালো এই দুই রঙের পোশাকই সবাইকে পরতে দেখা যায়।’

কোথায় পাবেন ও দরদাম

দেশীদশের ফ্যাশন হাউজ নিপুণ, কে-ক্র্যাফট, বিবিয়ানা, দেশাল, বাংলার মেলা, রঙ বাংলাদেশ, নগরদোলা, সাদাকালো, অঞ্জন’স সব বয়সীর জন্য একুশের পোশাক পাবেন। এ ছাড়া আড়ং, বিশ্বরঙ, নবরূপা, কারুপল্লী, আজিজ সুপার মার্কেটের নিত্য-উপহার, মেঘ, আর্টিজান, যোগীসহ বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজে একুশের শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, সিঙ্গেল কামিজ, টপস, আনস্টিচ, সিঙ্গেল ওড়না ও ব্লাউজ। জমিন অলংকরণে ব্যবহৃত হয়েছে ব্লকপ্রিন্ট, স্ক্রিনপ্রিন্ট, হাতের কাজ ও প্যাচওয়ার্ক। শুধু মেয়েদের নয়, ছেলেদের আয়োজনও কম নয়। পাঞ্জাবি, পায়জামা, ফুলহাতা ও হাফহাতা শার্ট, টি-শার্ট, পোলো-শার্ট ও উত্তরীয়। মেয়েদের একুশের আয়োজনে আছে সুতি শাড়ি ৮৫০ থেকে ২,০৫০, হাফসিল্ক শাড়ি ২,১০০ থেকে ৩,৫৫০, থ্রি-পিস ২,৫০০ থেকে ৩,৯৯০, সিঙ্গেল কামিজ ১,০৫০ থেকে ১,৮৫০, আনস্টিচ ২,০০০ থেকে ২,৫০০, সিঙ্গেল ওড়না ৫০০ থেকে ৭৫০ ও ব্লাউজ ২৫০-৩৫০ টাকা। ছেলেদের একুশের আয়োজনে আছে ছেলেদের পাঞ্জাবি ১০০০-১২৫০, টি-শার্ট ৩৫০-৪৮০, শার্ট ৭৫০-৯৫০ ও উত্তরীয় ২৫০-৫০০ টাকা। বাচ্চাদের জন্য আছে শার্ট ৩৫০-৫৫০, টি-শার্ট ৩৫০-৩৮০, পাঞ্জাবি ৫৫০-৭৫০, ফ্রক ৬০০-৮৫০ ও সিঙ্গেল কামিজ ৬৫০-১১৫০ টাকা।