১৯৮২-এর মার্চে স্বৈরাচার বাংলাদেশের মসনদে আসীন হয়। ঐ সময় সব স্থবিরতার বিরুদ্ধে ছাত্র-আন্দোলন ছাড়া যারা প্রথম প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তারা বাংলাদেশের থিয়েটারকর্মীরা।
১৯৯০-এ স্বৈরাচারের পতন হলো গণআন্দোলনের মুখে। তথাকথিত গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো। নাটকের বিষয়বস্তু হঠাৎ যেন দিক নির্ধারণে হোঁচট খেলো। নাটকেও দুই পক্ষের দেখা মিলল স্পষ্ট অবস্থানে। গণতন্ত্র উত্তরণের প্রথম পদক্ষেপে বাংলাদেশের থিয়েটারের শক্তিকে কাজে লাগানো বা এর পেশাদারি উত্তরণে রাষ্ট্রের এগিয়ে আসার আশা ছিলহলো না। বরং কীভাবে যে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হয়ে গেল থিয়েটারের মূলধারা, তা মালুম করা দুরূহ নয়। চলল, চলছে, চলবে ‘গণতন্ত্রের এই ধারা’।
আমাদের থিয়েটারে নানা চড়াই-উৎরাই হলো, ভাঙাগড়া ইত্যাদি। নাটক এবার বিষয় ও প্রয়োগে নানা মাত্রিকতা পেতে থাকল। লড়াই-সংগ্রামের বিষয়বস্তুর সঙ্গে নান্দনিকতার যোগ আরও বিস্তার পেল। মহিলা সমিতি আর গাইড হাউজের দমবন্ধ গুদাম ঘরের অস্বস্তি কাটিয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে জাতীয় নাট্যশালা হলো। দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নাট্যশিক্ষা যুক্ত হলো। পুরনো মঞ্চগুলো জরাজীর্ণ, নতুন মঞ্চগুলো বেশিরভাগই অভিনয় অনুপযোগী। তার থেকে বড় কথা নাট্যকর্মীর সংখ্যা এবং পৃষ্ঠপোষকতা ঢাকার বাইরে নিম্নপর্যায়ে নেমে এলো। জন-গিজগিজ ঢাকা শহরে থিয়েটার শুধু সেগুনবাগিচা আর অদূরে বেইলি রোডে নবনির্মিত মহিলা সমিতির ড. নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে উপস্থিত থাকল। দর্শক সংখ্যা কমতে থাকল।
গত শতকের ৯০ দশকের শেষভাগে বেসরকারি টিভি, বিনোদনের সার্বক্ষণিক পসরা সাজিয়ে বসল। নাট্যকর্মীদের জীবন-জীবিকার যেন একটা নতুন পথ খুলল। যারা সেই স্রোতে মিশে গেলেন, তাদের বেশিরভাগই আর থিয়েটারে ফিরতে পারলেন না। একে একে আরও এলো ইউটিউব, ওটিটি, নানান পেশাদারি এবং দ্রুত বিক্রির নানান মাধ্যম। বাংলাদেশের প্রথম থিয়েটারের দিকপালদের পর আর নতুন কোনো প্রজন্ম দাঁড়াল কি? দাঁড়াবে কেন? বৈশ্বিক-অর্থনীতি, ভোগবাদী চিন্তার বিস্ফোরণ, থিয়েটারের বাইরে জীবন-জীবিকার তাগিদ রীতিমতো জীবনযুদ্ধের নামান্তর হলো। আমাদের প্রথম প্রজন্ম জ্ঞানে-চিন্তায় অগ্রসরমান ছিল এবং ঘটনাচক্রে তাদের সবারই জীবনধারণের অন্য জীবিকা ছিল। পরের প্রজন্মের ছাত্রত্ব শেষে বা যৌবন-প্রারম্ভেই জীবিকার তাগিদ তাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। সত্তর দশকের মেধাবী তারুণ্য থিয়েটারকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তা পঁচিশ বছরের ব্যবধানে অগ্রগতি সূচকে খেই হারিয়ে ফেলল।
১৬ কোটি মানুষের দেশে যথার্থ নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতার তালিকা তৈরি করতে গেলে আসল হতাশার চিত্রটি ভেসে উঠবে। প্রক্রিয়াটিই যেন থেমে গেছে। এর পেছনের অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক। একটি শিল্পমাধ্যমে শুধু অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করে যাওয়ার বোকা প্রতিশ্রুতিতে পেট ভরে না। দু-একজন রেপাটরির মতো কিছু করে সামান্য অর্থ কলাকুশলীদের হাতে দিয়েছেন, যা প্রায় প্রতীকী ব্যঞ্জনা পেয়েছে।
একেবারে নতুন যারা থিয়েটারে যুক্ত হচ্ছে, তাদের একটা অংশ এখানে শেখার জন্য আসেন। তারা মনে করেন, থিয়েটারের শিক্ষা সিনেমা, টেলিভিশন, ওটিটি ইত্যাদিতে সাহায্য করবে। একদল আসেন ‘দেখি তো কী হয় এখানে’ এই টাইপের। কেউ আসেন আড্ডার জায়গা ভেবে, কেউ সদ্য নেশা ছেড়ে রিহ্যাব শেষে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য ভিড় করেন, কেউ আসেন ‘হুদাই’। এরা বেশিরভাগই ছাত্র-ছাত্রী, এদের কেউ কেউ মজা পেয়ে যান। মজা বেশিদিন স্থায়ী হয় না নানান চাপে। কেউ সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন, কখন অন্যত্র জায়গা পাবেন সেই ক্ষণটির জন্য। আর আছে, দেখতে এসে থেকে যাওয়া লক্ষহীন স্বপ্নহীন কিছু কর্মী। তাদের যেন আর কোথাও যাওয়ার নেই। মেধাবীরা অনেকদিন থিয়েটার করেন না। কেন সে দিনের পর দিন সময় দেবেন শুধু থিয়েটারের লোক হওয়ার জন্য? কী তার দায়? দায় একটা এক সময় ছিলরাজনৈতিক, সামাজিক।
একটি মোটামুটি থিয়েটার দাঁড় করাতে যেখানে পঁচিশ থেকে ত্রিশজন কলাকুশলী প্রয়োজন তার মূল্য কোটি টাকা ছাড়ানোর কথা। এই কোটি টাকার থিয়েটারের জন্য অপেক্ষা কবে ফুরাবে বোঝা মুশকিল। আমরা জানি, অভিনেতাদের দক্ষতাবৃদ্ধি, অনুশীলন ইত্যাদি জরুরি বিষয়। অনুশীলনের প্রথম ধাপ মহড়া এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন দর্শকের সামনে প্রতিবার পরীক্ষা দেওয়া। মহড়া কোথায় হবে? নিজস্ব মহড়ার জায়গা খুঁজে পাওয়াও তো দুরূহ। আর দর্শকের সামনে যে পরীক্ষাটা হবে সেটা কীভাবে? মাসে একবার দুবার মঞ্চে দাঁড়ালে কি দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে? নাট্যমঞ্চ বরাদ্দের ক্ষেত্রে যে রেশনিং ব্যবস্থা, তাতে বছরে একটি নাটকের বড়জোর চব্বিশটি প্রদর্শনী হতে পাবে।
আর নাট্যমঞ্চগুলোর কারিগরি সুবিধা প্রতিদিনই অপ্রতুল হতে থাকে। খোদ শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চগুলোর লাইট, সাউন্ডসহ কারিগরি যে সহযোগিতা দরকার হয়, তা পাওয়া যায় না। তবে সবই পাওয়া যায় বা ব্যবস্থা করতে হয় ভিন্নভাবে, মানে ভাড়া করা বাইরের যন্ত্রপাতির মাধ্যমে। এমনও শোনা যায়, এই ভাড়া করার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিজস্ব ব্যবসার যোগাযোগ আছে। মানে, সরকারি চাকরিও করছেন, আবার এই প্রতিষ্ঠানে নিজের ব্যবসাও করছেন। এই চোর বা ডাকাতদের বিচার কারা করবে? সর্বত্র অরাজকতা, পরিকল্পনাহীন, সুদূরপ্রসারী চিন্তা-রহিত একটি সার্বিক অব্যবস্থা।
এতসব দুরবস্থার মধ্যেও অনেক ভালো ভালো নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। বাংলাদেশের অন্তত পঁচিশটি দল নাট্যচর্চা করছে। ৫০ বছর পূর্তি করেছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সারির নাট্যদলগুলো। নতুন নতুন নাট্যদল সম্ভাবনার স্বাক্ষর রাখছে। নাট্যাঙ্গন মুখরিত করছে নবীন নাট্যকর্মীদের উজ্জ্বল উপস্থিতি। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নবীন বা মাত্রই-ভুক্ত হওয়া শিক্ষানবিশদের চিন্তার স্বচ্ছতা, সৃজনভাবনা এবং প্রচেষ্টা অবাক করেছে! চিন্তায় অগ্রগামী এই নতুনরাই থিয়েটারকে যথার্থ পথে নিয়ে যাবেন।