আমার আরও কিছু দেখানোর দরকার আছে : চম্পা

বাংলা সিনেমার একসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা চম্পা, যিনি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও পদচারণা করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রতীক আকবর।

রাত-আড্ডায় বসেছেন কয়েকজন নবীন-প্রবীণ। তাদের মধ্যে অতি পরিচিত শর্মিলা ঠাকুর, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আরও আছেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, রুপা গাঙ্গুলি, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, যিশু সেনগুপ্ত, টাবুসহ কয়েকজন। সেখানেই আড্ডা দিতে বসেছেন গুলশান আরা চম্পা। পরিকল্পনা চলছিল অরণ্যে ঘুরতে যাওয়ার।

নির্মাতা গৌতম ঘোষ এভাবে একটি দৃশ্য ধারণ করেছিলেন তার ‘আবার অরণ্যে’ সিনেমায়। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমাটিতে এক ফ্রেমে উপমহাদেশের কয়েকজন কিংবদন্তি এবং কয়েকজন জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে চম্পার উপস্থিতি গর্বের ব্যাপারই বটে।

একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে সীমানা পেরোনো এবং গুণীদের সঙ্গে কাজ করার এমন গর্বের ঘটনা আরও আছে চম্পার ক্যারিয়ারে। যার শুরু ১৯৯৩ সালে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ সিনেমার মাধ্যমে। এ সিনেমায় মালা চরিত্রে কাজ করাটা চম্পার অভিনয় জীবনের জন্য টার্নিং পয়েন্ট বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। সে গল্পে পরে আসছি।

চম্পা আরও কাজ করেছেন ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া ‘লাল দরজা’ সিনেমায়। যার পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। সন্দীপ রায়ের পরিচালনায়ও অভিনয় করেছেন এ অভিনেত্রী।

১৯৯৩ (পদ্মা নদীর মাঝি), ৯৫ (টার্গেট), ৯৭ (লাল দরজা), ২০০৩ (আবার অরণ্যে) সালে পশ্চিমবঙ্গের নামকরা সব পরিচালকের সঙ্গে কাজ করছিলেন তিনি।

‘পদ্মা নদীর মাঝি’ সিনেমার গল্পে আসা যাক। সিনেমাটা চম্পার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, অভিনেত্রীর ভাষ্যে, “আমি ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ সিনেমার আগে অনেকগুলো সিনেমা করেছি, কিন্তু কোনো স্বীকৃতি পাইনি। বাংলাদেশের সিনেমা-সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করতেন, আমি অভিনয়ই পারি না। গৌতমদা চোখে আঙুল দিয়ে মালা চরিত্রের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন, তোমাদেরই মেয়ে, দেখো অভিনয় করতে পারে কি না। তখন থেকে অনেকে চোখ মেলে তাকিয়েছেন আমার দিকে। আমি যদি এ ধরনের সিনেমা না করতাম, আজও হয়তো অনেকে চোখ মেলে তাকাত না আমার দিকে। এটা আমার বিশ্বাস।”

মালা চরিত্র চূড়ান্ত করার ঘটনাটিও বেশ মজার। গল্পটি শোনালেন চম্পা, ‘গৌতমদা আসবেন জেনে আমি নিজেই রান্নাঘরে ছিলাম। যখন বেল বাজল, আমি নিজে দরজা খুলেছি। পরে তার মুখে শুনেছি, যখন আমি দরজা খুলি, কোনো মেকআপ ছিল না আমার, রান্নাঘরে থাকায় মুখে কিছু ঘাম ছিল, চুলগুলো উষ্কখুষ্ক; ওই লুখে দেখেই নাকি তিনি পেয়ে গেছেন তার মালাকে।’

সিনেমাটি প্রদর্শিত হয়েছিল কলকাতায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শাবানা আজমি। তিনি চম্পাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘তুমি কী অভিনয় করেছো, সেটা তুমি নিজেও বুঝতে পারোনি।’ হাসতে হাসতে চম্পা বললেন, ‘তখন মোবাইল থাকলে একটা ছবি তুলে রাখতাম।’

‘পদ্মা নদীর মাঝি’ সিনেমার পোস্টারের কাজ করেছিলেন সন্দীপ রায়। সেখানে চম্পাকে দেখে ‘টার্গেট’ সিনেমায় তাকে চূড়ান্ত করেন সন্দীপ। কলকাতায় কাজ করার সুবাদে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের নজরে পড়েন চম্পা।

এসব বলতে বলতে টুকরো টুকরো আরও স্মৃতি মনে পড়ে চম্পার। তিনি বলতে থাকেন, ‘বোম্বের অভিনেতা ওমপুরি আমাকে বলতেন বাংলাদেশের শাবানা আজমি আর ডাকতেন চম্পা ভারতী নামে।’

‘সন্দীপ রায়ের সিনেমার ডাবিং হচ্ছিল, ওখানে গিয়েছিলেন বলিউড অভিনেতা অনুপম খের। তিনি আমাকে তার সিনেমার জন্য প্রস্তাব দেন এবং স্ক্রিপ্টও পাঠান। পরে অবশ্য সিনেমাটা হয়নি। এটাও একটা বড় গল্প আমার জীবনে।’

দেশের এত এত কাজের পাশাপাশি ওপার বাংলার কাজ চম্পাকে করে তুলেছে আরও মহিমান্বিত। তার পরও কি চম্পা তার বড় দুই বোন সুচন্দা ও ববিতার আড়ালে পড়ে থাকলেন? না, চম্পা এমনটা মনে করেন না। তার মতে, ‘আমার এ রকম মনে হয় না। আমি চম্পা বাদ দেন, তারা আমার বোন এটাই তো অনেক গর্বের। তাদের নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে যোগ্যতা বেশি। আপনারা সেভাবেই তাদের মূল্যায়ন করেন। হয়তো আমার আরও কিছু দেখানোর দরকার আছে। কিন্তু আমি আরও কিছু দেখানোর সুযোগটা পেলাম কোথায়। আমার আক্ষেপ আছে, রাগ আছে, কষ্ট আছে, অভিমান আছে, আবার ভালোবাসাও আছে। ভালোবাসা আছে এজন্য কাজ করে গেছি। কেউ কখনো বলতে পারবে না যে, আমার জন্য কাজের ক্ষতি হয়েছে।’

চম্পা স্পষ্টই বললেন, ‘আর্টিস্ট হিসেবে আমাকে স্বীকৃতি দেওয়া হতো না। আমাকে মূল্যায়ন সঠিকভাবে করেনি ইন্ডাস্ট্রি। তবে দর্শকরা আমাকে মূল্যায়ন করেছে। বিদেশেও বাংলাদেশিরা আমার চোখ দেখে চিনে ফেলেন, ছবি তুলতে চান।’

এ অভিনেত্রীর কিছু রাগ আছে নিজের ওপরে। এ কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমি কিছু উল্টাপাল্টা সিনেমা করে ফেলেছি, যেটা আমার উচিত হয়নি। এখন অনেক শক্ত হয়ে গেছি। যেটা করেছি করেছি। কিছু আছে অনুরোধের ঢেঁকি গিলে ফেলেছি। নিজেকে ধিক্কার দিই কেন ওগুলো করেছি।’

এখন যখন অনেক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নিয়ে অপেক্ষা করছেন তখন আবার কাজের ঘাটতি। ‘এ ব্যাপারটা নিয়ে আমার প্রচণ্ড দুঃখ আছে। এক দুদিনে একটা আর্টিস্ট তৈরি হয় না। গুরুজনরা বলতেন, অভিনয় দেখে যেন মনে না হয় যে অভিনয় করছি। জীবনে চলার পথে এত কাজ করে যখন এটা রপ্ত করেছি, তখনই কাজগুলো দূরে সরে গেছে। সুযোগ নেই, কাজ পাচ্ছি না, ও রকম কাজ নেই দেখানোর মতো। খুব আক্ষেপ আমার’, বলেন তিনি।

এখন যারা কাজ করছেন তারা অনেক মেধাবী বলে জানালেন চম্পা। তাদের কাজ দেখে মন জুড়িয়ে যায় অভিনেত্রীর। কিন্তু সেখানেও পলিটিকস। বলেন, ‘নতুন কেউ আমাকে নিয়ে কাজ করতে চাইলে মাঝখানের মানুষের কারণে কাজটা শেষ পর্যন্ত আর আসে না।’

নিজের অভিনীত ‘বিশ্বসুন্দরী’, ‘রিকশা গার্ল’ সিনেমা নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট চম্পা। এ রকম আরও কাজ করতে চান এ অভিনেত্রী।