ইপিজেডে ট্রেড ইউনিয়ন রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ

বর্তমানে বাংলাদেশে যে শ্রম আইন রয়েছে তা আরও যুগোপযোগী ও শ্রমিকবান্ধব করে সংশোধনের তাগিদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সরকার বাংলাদেশকে শর্ত দিয়েছে যে শ্রম আইনের সংশোধন করলেই কেবল বন্ধ থাকা ‘জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস’ বা (জিএসপি) সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধা চালু হবে।

বিশ্বের প্রভাবশালী দেশটি আরও জানিয়েছে, দ্রুত জিএসপি সুবিধা পেতে চাইলে বাংলাদেশকে শ্রম আইন সংশোধন করতেই হবে।

ঢাকায় সফরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু দেশটির এ অবস্থান জানিয়ে যান বলে নিশ্চিত করেছেন পররাষ্ট্র এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য। দেশ রূপান্তরকে তারা বলেন, এখনই শ্রম আইন সংশোধন করার সুযোগ সরকারের হাতে নেই।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সদস্যভুক্ত এবং স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশ হওয়ার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু সুবিধা পেয়ে থাকে। এর অন্যতম একটি সুবিধা হলো বাংলাদেশি পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বিশেষ বাণিজ্য-সুবিধা।

উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পেতে শুরু করে। ২০১৩ সালের জুনে জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব, শ্রমিকদের অধিকার ও শ্রমিকদের বিভিন্ন দুর্ঘটনায় যথাযথ ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে প্রভাবশালী এ দেশটি বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু ঢাকা সফরে এসে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি শ্রম আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেন বলে জানিয়েছেন এ দুটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য।

গত ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফারুক খান। উপস্থিত ছিলেন দুই কমিটির সদস্য শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, নুরুল ইসলাম নাহিদ, আব্দুল মজিদ খান, নাবিল আহমেদ ও নিজাম উদ্দিন জলিল ডন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করতে বিষয়টি শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করা ও দেশের সব ইপিজেডে শ্রমিকদের দাবি আদায়ে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার সংশ্লিষ্ট আইনে রাখার ব্যাপারে আগ্রহ দেখান ডোনাল্ড লু। বৈঠকে তিনি বলেন, শ্রম আইনে শ্রমিকের কল্যাণ নিহিত থাকতে হবে। সব শিল্প ও শিল্পাঞ্চল শ্রমিকবান্ধব করে তুলতে আইনি নীতিমালা থাকতে হবে।

অবশ্য বৈঠকে দুই মন্ত্রী ডোনাল্ড লুকে অবহিত করেন যে শ্রম আইন সংশোধন এখনই সম্ভব নয়; বিশেষ করে ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দিয়ে শ্রম আইন সংশোধন করা সম্ভব নয়।

দুই মন্ত্রীই লুকে আরও বলেন, ইপিজেডে ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগকারী রয়েছে। তাদের সরকারের পক্ষ থেকে আশ^স্ত করা হয়েছে এখানে ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ থাকবে না। এখন শ্রম আইন সংশোধন করে ট্রেড ইউনিয়ন করার অনুমতি দেওয়া হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেঁকে বসতে পারে। ওই সব অঞ্চলের শিল্প প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন না করতে নির্দেশনা থাকলেও ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে শ্রমিক কল্যাণ সমিতি করার অনুমোদন আছে। তাতে করে শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে লুর কাছ থেকে শ্রম আইন সংশোধনের প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ওই বৈঠক সূত্র আরও জানায়, শ্রম আইন সংশোধন করার পদক্ষেপ গ্রহণ না হলে বন্ধ থাকা জিএসপি সুবিধার জটিলতা শিগগিরই সমাধান হবে না তাদের এমন অবস্থান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার। ডোনাল্ড লু জানিয়ে দিয়েছেন, জিএসপি জট খুলতে শ্রম আইন সংশোধন করা খুবই জরুরি। শ্রমিক কল্যাণ সমিতি থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য সেটা যথেষ্ট নয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার মনে করে, শ্রমিক ইউনিয়ন-জাতীয় কোনো সংগঠন ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে তোলার সুযোগ পেলে যেকোনো ইস্যুতে শ্রমিকরা আন্দোলন সংঘটিত করার চেষ্টা করবেন। তাতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কাজের পরিবেশ নষ্ট হতে পারে। এসব শঙ্কা মাথায় রেখেই শ্রম আইন এখনই সংশোধন করতে চায় না সরকার।

সরকার না চাইলেও শ্রম আইন সংশোধন এখন না করলে বাংলাদেশের জন্য আরও বিপদ অপেক্ষা করছে বলে জানান আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য। তারা বলছেন, ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ না দিলে বাংলাদেশ বৈদেশিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। তাই বিষয়টি সরকার বিবেচনায় রেখেছে।

জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ইপিজেডে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাই তো ট্রেড ইউনিয়ন চান না। দেখা যাক, ভবিষ্যতে কী হয়।’