‘মুচলেকা রয়েছে যে, খালেদা জিয়া রাজনীতি করবেন না।’ সাজাপ্রাপ্ত আসামি রাজনীতি করতে পারে না। ২৬ জানুয়ারি সংসদে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এ কথা বলেছিলেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। গত রবিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি (আইনমন্ত্রী) বেশ জোর দিয়ে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনীতি করতে আইনি বিধিনিষেধ নেই। তবে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন না।
আওয়ামী লীগের দুই দায়িত্বশীল নেতার এমন বক্তব্য রাজনীতির মাঠে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতাসীন দলের অন্য নেতারাও এ পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের হেতু খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। তবে এর পেছনে কী কারণ রয়েছে তা বুঝে উঠতে পারছেন না। তবে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থাকতে পারে এমন আভাস দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা।
আওয়ামী লীগের অন্তত এক ডজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের বক্তব্য বিতর্ক তৈরি করে। এ প্রসঙ্গে কেন নেতাদের বক্তব্য দিতে হবে সে প্রশ্নও তোলেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তাদের অনেকে দুজনের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ বলেছেন, সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ সেলিম কেন এমন কথা বলবেন? আইনমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন এমন কথাও আছে দলের ভেতরে।
দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, মাঠের পরিস্থিতি বোঝার জন্য এ আলোচনা তোলা হয়ে থাকতে পারে। দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে প্রায় সবাই বলেছেন, দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে দায়িত্বহীন বক্তব্য দিলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। সরকার পরিচালনার শুরুতে দায়িত্বহীন কথা বলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে অনেকে। মাঝে কমেছিল। এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে।
দলের তিন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, উপনির্বাচনে বিএনপির সাবেক নেতা উকিল আবদুস সাত্তারকে জেতাতে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রকাশ্য কর্মকা- কী ছিল? ভূমিকা কী ছিল? এতে কি দুই পয়সার উপকার হয়েছে? বরং সংসদে উকিল সাত্তার যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।
আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না। আগে দলীয় বিভিন্ন ফোরামে, সভায় নানা আলোচনা হতো। সেসব আলোচনা থেকে একটা নির্দেশনা পাওয়া যেত। এখন ফোরামে কোনো আলোচনা হয় না।
আওয়ামী লীগ সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ ক্ষোভ ঝেড়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কী বলব? আমার সঙ্গে এসব কথাবার্তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এ কথা ঠিক, এতে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এসব বড় বড় মন্ত্রী-নেতার বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। দলীয় ফোরামে এখন কোনো কিছু নিয়ে আলাপ হয় না।’
সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আলটিমেটলি খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন না আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে এটাই বোঝানো হয়েছে বলে আমি মনে করি। শেখ সেলিম মুচলেকা বিষয়ে কেন বলেছে আমার জানা নেই। আসলে বেশি ছাড় দিয়ে দিয়েছে তো নেত্রী (শেখ হাসিনা)! তাই এত কথা।’
আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক নজিবুল্লাহ হিরু প্রসঙ্গটি পাস কাটিয়ে বলেন, ‘এ সম্পর্কে আমি জানি না। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বারের নির্বাচন। আমি এ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’
সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য কামরুল ইসলাম বলেন, ‘ইচ্ছে করলে খালেদা জিয়া রাজনীতি করতে পারবেন’ এই কথা আইনমন্ত্রী কীভাবে বললেন আমার বোধগম্য নয়। এর পক্ষে তার ব্যাখ্যা কী, কোন আইন দেখিয়ে বললেন, আমার বোধগম্য হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ৪০১ ধারা অনুযায়ী নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত রাখা হয়েছে। আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়া সারা দেশ ঘুরে প্রচার-প্রচারণা করতে পারবেন। ১০ ডিসেম্বরের আগে আমানউল্লাহ আমান বলেছিলেন, খালেদা জিয়া পল্টনে বক্তব্য দেবেন, সে কথাই তাহলে ঠিক! খালেদা চাইলে নির্বাচনও করতে পারেন, তাহলে তিনি নির্বাচনও করুন।’
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই তাকে বাসায় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। নিয়ম হচ্ছে, একজন লোক সাজাপ্রাপ্ত হলে তাকে “মুক্তি” নিতে হলে শর্তযুক্তভাবে জামিন নিতে হবে। তার জামিনে কী শর্ত দেওয়া হয়েছে তা বলা মুশকিল। নিঃশর্তে জামিন হবে না তো! তবে প্রসঙ্গটি নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা কেন বুঝতে পারি না।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘দলীয় কোনো প্রচেষ্টায় খালেদা জিয়ার মুক্তি হয়নি। পারিবারিকভাবে কোন শর্ত দিয়েছে, কী দেয়নি তা সরকারই জানে।’ তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত আছে। স্থগিতাবস্থায় তিনি রাজনীতি করতে পারেন না। আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা ভালো দিতে পারবেন। আমি যা বুঝি, রাজনীতি করার ক্ষেত্রে কাউকে সরকারের বাধা দেওয়ার কথা নয়। সরকার তখনই বাধা দিতে পারে যখন আইনের ব্যত্যয় হয়।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে দুর্নীতির দুই মামলায় খালেদা জিয়ার ১৭ বছরের সাজা স্থগিত হয়েছে। সাময়িকভাবে মুক্তি পেয়েছেন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসন রাজনীতি করতে চাইলে তাকে দেওয়া ‘শর্ত’ মেনে চলতে হবে। তবে সেই শর্ত কী তা স্পষ্ট করেননি ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক।