ভূমির বদল ভাষার বদল

মহাবিশ্বে পৃথিবী ছাড়া অন্য কোনো গ্রহ বা গ্যালাক্সিতে প্রাণের আবির্ভাব ও সভ্যতা বিকশিত হয়েছে কি না আমরা এখনো জানি না। সৌরজগতের এক ছোট্ট নীলগ্রহে আমরা প্রাণের আবির্ভাব, রূপান্তর ও গণবিলুপ্তি দেখে চলেছি। অকোষী থেকে বহুকোষী, ঘাস থেকে ঘড়িয়াল কিংবা ম্যামথ থেকে মানুষ কত প্রাণপ্রজাতির আবির্ভাব আর বিলুপ্তি ঘটেছে এই গ্রহে। কিন্তু অযুত নিযুত প্রাণস্পন্দনের ভেতর প্রজাতি হিসেবে মানুষ কী করে সর্বময় ক্ষমতার কর্তৃত্ব দখল করল তা এখনো বিস্ময়ের।

কেন বৃক্ষ বা সরীসৃপ কিংবা অণুজীব বা নীল তিমি এই জায়গা দখল করতে পারল না? কিংবা মানুষ হিসেবে মানুষের সব প্রজাতিই কী এমন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছিল? যদিও এই ক্ষমতা এই গ্রহকে ছিন্নভিন্ন আর রক্তাক্ত করে এর টিকে থাকাকেই প্রশ্নের মুখোমুখি করছে বারবার। কিন্তু হোমো ইরেকটাস, ডেনিসোভান, নিয়ানডার্থাল, হোমো ফ্লোরিয়েনসিস এইসব মানবপ্রজাতি কেন পৃথিবীর কর্তৃত্ব ছিনতাই করতে পারল না? মানবপ্রজাতির ভেতর কেন কেবলমাত্র ‘হোমো স্যাপিয়েন্সরাই’ এক নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী ক্ষমতা অর্জন করল? কীভাবে পারল? দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা লোকআখ্যান কিংবা বিদ্যায়তনিক বহু গবেষণায় এর নানা যুক্তি, প্রমাণ ও ব্যাখা আছে। এসব ব্যাখা ও নথিকে পাঠ করে ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ মানুষের ক্ষমতা অর্জনের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে বোঝা যায়। আর তা হলো ‘গল্প বানানো ও গল্প বলবার’ এক বিস্ময়কর দক্ষতা। হোমো স্যাপিয়েন্স মানুষ এক গল্পকে হাজার রকম করে বলতে পারে, গল্পের শতকোটি মানে তৈরি করতে পারে কিংবা গল্পটিকে উধাও করে দিতে পারে। মেরুদন্ডী, সরীসৃপ, বৃক্ষ কী পতঙ্গের জীবনেও গল্প আছে, কিন্তু সেটি হোমো স্যাপিয়েন্স মানুষের মতো নয়। আর তাই পৃথিবীতে একটা মাত্র প্রজাতি হিসেবে মানুষের লাখো কোটি ভাষা জন্ম নিয়েছে, বিলুপ্ত হয়েছে, নয়া ভাষার রূপান্তর ঘটছে। বরফজমাট তুন্দ্রা, বর্ষারণ্য আমাজন, বিস্তীর্ণ কালাহারি, উচ্চতম হিমালয় কিংবা বৃহত্তম বদ্বীপে মানুষের ভাষার এত ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য কেন?

মানুষের ভাষা মূলত গড়ে ওঠে ও বিকশিত হয় তার চারধারের প্রাণ ও প্রতিবেশ ঘিরে। প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আগলে। ভূমি হলো ভাষা গড়ে উঠবার পয়লা ময়দান। এক ভূমিতে জন্ম নেওয়া কোনো ভাষা ভূমিহারা হয়ে আরেক কোনো অচিন ভূমিতে গিয়েও জন্মভূমির চিহ্ন ও প্রতীকগুলো মেলে ধরে। ভাষা সবসময় কোনো না কোনো ভূমির দিনলিপি প্রকাশ করে। ভূমি ও ভাষার এই জটিল সমীকরণই মানুষের দিনযাপনের গল্পকে জীবন্ত রাখে। কিন্তু এই গল্প কি নিজের মতো বিকশিত হতে পারছে? ভূমি ও ভাষার পাটাতন থেকে যদি আমরা এই প্রশ্ন হাজির করি তাহলে কী দেখব? আজ দেশের নানাপ্রান্তে ভূমিও ক্ষতবিক্ষত এবং ভাষাও রক্তাক্ত। বহু ভাষা নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে কিংবা বহু ভূমি উন্নয়ন বাহাদুরিতে নিহত হয়ে ভাষা-বিকাশে সহযোগী হতে পারেনি। ভূমির নানা রূপ ও ব্যঞ্জনা থাকলেও যদি কেবল কৃষি ও জুম জমিনের প্রসঙ্গও টানি তাহলে কী দেখব?

রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর দেশে এক শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে। কৃষিজমি হ্রাসের এই নিদারুণ ধারা কেবলমাত্র খাদ্য উৎপাদন, অর্থনীতি কিংবা মানবিক উন্নয়নের সঙ্গেই জড়িত নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাষা মুমূর্ষু হওয়ার নানা ঘাত-প্রতিঘাত। নদী অববাহিকা, হাওর, বাঁওড়, বিল, বরেন্দ্র, চর, গড়, টিলা, পাহাড়, অরণ্য কী উপকূলের কৃষিজমি ও ভাষার পরিবর্তন এবং নিরন্তর রূপান্তর খেয়াল করলে বিষয়টি আন্দাজ করা যায়। চলতি আলাপখানি ভাষা ও ভূমির পরস্পরনির্ভরশীল সম্পর্ক এবং পরিবর্তনশীলতা নিয়ে। আমরা ভূমি ও ভাষার সুরক্ষা চাই, কিন্তু কখনোই আমরা এদের জটিল সম্পর্ককে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিয়ে সামগ্রিকভাবে উভয়ের সুরক্ষাবলয় মজবুত করিনি। আমাদের তৎপরতাগুলো প্রায়শই খ-বিখ-, আমরা আলাদাভাবে কখনো ভাষার সুরক্ষা চাই আবার কখনো আলাদাভাবে ভূমি রক্ষা করতে চাই। ভূমির বদল ঘটলে ভাষা বদলে যায়, বদলে যাওয়া ভাষার সঙ্গে আগের ভূমির সম্পর্কের ভিন্নতা তৈরি হয়। আর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে মানুষের গল্প বলবার আদি কারিগরিতে। আমরা কৃষিজমিনের রাজনৈতিক, প্রতিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা চাই। কারণ আমরা আমাদের সব মাতৃভাষার সামগ্রিক সুরক্ষাবলয় মজবুত করতে চাই। ভূমি ও ভাষার ঐতিহাসিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় ভাষাপ্রশ্নকে জোরালো করবার আহ্বান জানায় চলতি আলাপ।

বদলাচ্ছে ভূমি, বদলাচ্ছে ভাষা

বলা হয়, ভূমি হলো এক মৌলিক প্রাকৃতিক সম্পদ যা মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, শিল্প, ভোগবিলাস, স্বাস্থ্য রক্ষার উপকরণ ইত্যাদি সব কিছুরই উৎস। কৃষিজমি কোনোভাবেই কেবলমাত্র খাদ্যশস্য উৎপাদনের জায়গা নয়। এটি এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যময় বাস্তুসংস্থান এবং এখানে নানা প্রাণী ও উদ্ভিদের যৌথ বসবাসের ভেতর দিয়ে এক জটিল প্রতিবেশব্যবস্থা চালু থাকে। নানা অণুজীব, পতঙ্গ, কেঁচো, কাঁকড়া, শামুক, সাপ, ছোট পাখি, গুল্ম ও বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদের আবাস ও বিচরণস্থল কৃষিজমি। কৃষিজমি একইসঙ্গে কোনো গ্রামীণ সমাজের বসতি স্থাপনের ইতিহাস এবং কৃষিসভ্যতার এক জীবন্ত দলিল। এটি সামাজিক সংহতি ও নানা বর্গ-শ্রেণির ঐক্যের প্রতীক। কৃষিজমি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা প্রকাশ করে। এক এক অঞ্চলের কৃষিজমি এক এক ঋতু মৌসুমে এক এক রং ও ব্যঞ্জনা নিয়ে মূর্ত হয়। কৃষিজমিনের এই প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা জমিনের সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষের ভাষিক সীমানাকে প্রভাবিত করে। প্রস্তাবিত ‘কৃষিজমি সুরক্ষা আইন ২০২১’ উল্লেখ করেছে ‘বাংলাদেশের যে স্থানে কৃষিজমি রহিয়াছে, তাহা এই আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা করিতে হইবে এবং কোনভাবেই তাহার ব্যবহারভিত্তিক শ্রেণি পরিবর্তন করা যাইবে না।’ কিন্তু কী ঘটছে? প্রতিদিন চোখের সামনে-পেছনে দিনদুপুরে খুন হচ্ছে কৃষিজমি, নির্দয়ভাবে শ্রেণি পরিবর্তন করা হচ্ছে। কোনো ন্যায়বিচার নেই, কোনো সুরাহা নেই। অথচ কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাতে থাকে ভাষার পত্র-বিটপ-মূল। ভূমিপ্রশ্নকে আড়ালে রেখে আমরা মাতৃভাষা সুরক্ষার লোক দেখানো ফেনা তুলি ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রকাশিত কৃষি ডায়েরি (২০১১) থেকে দেখা যায় ১৯৭৬ সালে দেশে কৃষিজমি ছিল ৯.৩৯ মিলিয়ন হেক্টর। ১৯৮০-৮১ সালে ৯.৩৮, ১৯৮৫-৮৬ সালে ৯.৪৪, ১৯৯০-৯১ সালে ৯.৭২, ১৯৯৫-৯৬ সালে ৮.৭২, ২০০০-০১ সালে ৮.৪০, ২০০৫-০৬ সালে ৮.৪২ এবং ২০১০-১১ সালে ৮.৫২ মিলিয়ন হেক্টর। আরেক গবেষণা জানায়, গত ৩৪ বছরে দেশে ০.৬৬ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমি কমেছে। জলবায়ু, পানিসম্পদ, ভূমিরূপ, মাটি, উদ্ভিদবৈচিত্র্য, তৃণভূমি কী অরণ্য সবই ভূমির অংশ। আর এসব ঘিরেই গড়ে ওঠে ভাষার পরিসর ও সীমানা। কিন্তু কৃষিজমিনের ক্ষয়ে এই ভাষিক সীমানা বদলে যেতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশে অঞ্চল ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতায় কৃষিজমির ধরনগুলো এক নয়। মহামতি খনার বচনে আছে, রোদে ধান ছায়ায় পান। তার মানে কোনো কৃষিজমিনে রোদ পড়ে, আবার কোনোটি ছায়াময় জমিন। জমির ধরন বুঝে এক এক জমিনে এক এক ফসল। এক এক ফসল বা চাষপদ্ধতি মানে ভাষার নানা উপাদান। শব্দভা-, রূপকল্প ও বাক্যব্যঞ্জনা। হাওরাঞ্চলে বসতবাড়ি বাগানকে বলে ‘বিছরা’, মধুপুর গড়াঞ্চলে নিচু জমিকে বলে ‘বাইদ’ এবং উঁচু জমিকে ‘চালা’, বরেন্দ্র অঞ্চলের ঢেউখেলানো জমিকে স্থানীয়ভাবে বলে ‘গ্যালারি জমি’, মানিকগঞ্জে উঁচু জমিকে বলে কান্দা জমি, সিলেটের খাসি আদিবাসীরা কৃষিজ বাগানকে বলেন ‘জুম’। দেশব্যাপী কৃষিজমির এই আঞ্চলিক ও বাস্তুতন্ত্রগত ভিন্নতা কমছে, পিটিয়ে ভেঙে চুরমার করে একচেহারা করা হচ্ছে সব জমি। বদলে যাচ্ছে জমিনের সঙ্গে সম্পর্কিত ভাষা।

বাংলাদেশে ভাসমান জমি গোপালগঞ্জের বিলাঞ্চলে ‘গাউতা’ এবং পিরোজপুর-বরগুনা অঞ্চলে ‘ধাপ চাষ’ নামে পরিচিত। সিলেটের দুই টিলার মাঝের জমিকে আদিবাসী লালেং (পাত্র) ভাষায় বলে গুল। পাহাড়ি এলাকার জুমজমিনগুলো কেবল চাষ বা উৎপাদন নয়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বিকাশের সঙ্গেও জড়িত। বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে একটি পাহাড়ের নাম ম্রো ভাষায় শোংনাম (ভূতের পাহাড়)। এর নানাভাগে নানা ফসল ফলে। কিন্তু করপোরেট পর্যটন বাণিজ্য এই পাহাড়ের শ্রেণি পরিবর্তন করে না দিতে চায় ম্যারিয়ট হোটেল। কক্সবাজারের টেকনাফসহ সমুদ্র উপকূলে জোয়ার প্লাবিত কৃষিজমি এবং নারিকেল জিঞ্জিরা বা সেন্টমার্টিনসহ সমুদ্র দ্বীপসমূহের ভূমিবৈচিত্র্যের সঙ্গে এখানকার জনগোষ্ঠীর ভাষা মিশে আছে। শংখ বা সাঙ্গুসহ পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি নদীতীরের ঢালু জমি, ঝালকাঠির বিশঘর কুরিয়ানাসহ  বরগুনা, পিরোজপুরের পেয়ারা বাগান, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমতল অঞ্চলের তুলা চাষের জমি, ফুল চাষের জমি, চলনবিলের জলমগ্ন জমি, সিলেটের আদিবাসী খাসিদের পানজুম, টাঙ্গাইলের মধুপুরের আনারস ও মিশ্রফসল চাষের চালা জমি, রাঙ্গামাটির সাজেকের লুসাই আদিবাসীদের চা ও কমলা বাগান, দিনাজপুরের লিচু বাগান, হাওরাঞ্চলের বিছরা ক্ষেত, পানবরজ, সাতক্ষীরা-খুলনার কনকনা পদ্ধতিতে মিষ্টিপানির আধার তৈরি করে চাষকৃত জমি, দেশজুড়ে টানি ও ছেমা জমিন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘালয় পাহাড় পাদদেশের সীমান্ত জমি, চরাঞ্চলের বালুময় ভূমির সঙ্গে বিন্যস্ত ও বিস্তৃত হওয়া ভাষিক পরিসরগুলো আজ নানাভাবেই আঘাতপ্রাপ্ত। ভাষা বদলে যাওয়ার শতসহস্র কারণের সঙ্গে ভূমির বদল কিংবা ভূমির পরিবর্তনও এক অন্যতম কারণ, যা, আমরা ভাষাপ্রশ্নের মূল ময়দানে কখনোই হাজির করছি না।

ভূমি ও ভাষার সম্পর্ক

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ কিংবা নওগাঁর গ্রামেগঞ্জে ঘুরলে দেয়াল কি দোকানে নানা ধরনের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। দুইশ বছর আগে হলে হয়তো এই বিজ্ঞাপনের ভাষা বোঝা সম্ভব ছিল না। এখনো বুঝতে বেহুঁশ হতে হয়। বিজ্ঞাপনে লেখা থাকে ‘উঁচু নিচু ডাঙ্গা জমি ভেকু মেশিনে কেটে সমান করা হয়’। মানে হলো বরেন্দ্র অঞ্চলের ঢেউখেলানো স্তরে স্তরে সাজানো আদি জমি মেশিনে কেটে সমান করা হচ্ছে এবং মূলত বোরো  মৌসুমের উফশী ধান লাগানোর জন্য বানানো হচ্ছে বা বাণিজ্যিক ফসলের বাগান। ভূমির এই শ্রেণি পরিবর্তনে ভাষার ক্ষেত্রে কেমন বদল ঘটছে তা বোঝার জন্য আমাদের ঝিনাপাড়া যেতে হবে। রাজশাহীর তানোরের বাধাইড়ের এক খরাপীড়িত প্রাচীন গ্রাম। প্রতিদিন পাতাল কী আসমানের পানি হারাচ্ছে। মাটিতে নেই আর্দ্রতা, বদলাচ্ছে কৃষিজীবন। চুরমার করে সমান হচ্ছে স্তরবিন্যস্ত জমি ও নিখোঁজ হচ্ছে প্রাকৃতিক জলাভূমি খাঁড়ি। আমরা ‘বাতাল’ নামে একটি প্রাচীন শব্দ খুঁজে পেলাম। মাটির উপযুক্ত আর্দ্রতা বা জো বোঝাতে গ্রামের মানুষের ভাষায় আগে এই শব্দ ও ধারণাটি প্রচলিত ছিল। আরও একটি প্রাচীন শব্দ ও ধারণা পাওয়া গেল, ‘লেলপা’। খাঁড়ির গভীর অংশে আগে বাবলা, খয়ের, শেওড়া, জাওয়া ও ভালকা বাঁশ দিয়ে কাঠা তৈরি হতো শুষ্ক  মৌসুমে যেন মাছেরা এখানে থাকতে পারে। এখানেই কিছুদিন পর তৈরি হতো আঠালো থকথকে ‘লেলপা’, আর এটি নির্দেশ করে মাছ ও জলাভূমির সুস্বাস্থ্য। গ্রামের শিশু, কিশোর ও তরুণদের আলাপ করে তাদের শব্দভা-ে ‘বাতাল’ ও ‘লেলপা’ পাওয়া গেল না। এমনকি এসব ধারণাও তাদের কাছে স্পষ্ট না। বরং তাদের গরিষ্ঠভাগের কাছে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন বা জলাভূমি নিখোঁজ হওয়ার কোনো যাতনা বা মানে নেই। টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনে মান্দি গ্রামগুলোই এখানকার আদি জনবসতি। মূলত হাবাহুয়া (জুম আবাদ) করে এখানে মান্দি সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল। ১৯৫০ সালে রাষ্ট্র এই অঞ্চলে জুমচাষ নিষিদ্ধ করে। ভূমির শ্রেণি প্রতিদিন বদলাতে থাকে, বদলাতে থাকে শালবনের আবেং মান্দিদের আচিক ভাষা। রাষ্ট্র, বন বিভাগ ও বাঙালি উপনিবেশিকতায় শালবনের ভূমি দখলের প্রতিটি পর্যায়ে প্রবল প্রতাপে আচিক ভাষায় ঢুকতে থাকে বাংলা শব্দ ও ধারণা। হ.গিচাক, হা.গিসিম, হানচেং, হা.গুবক, হা.খিল ও হা.রংখেক মাটির এই আদি মান্দি শ্রেণিকরণ চলতি সময়ে মধুপুরের আচিক ভাষায় জীবন্ত নেই।

ভূমি, ভাষা ও ভিত্তি

বাংলাদেশে বাঙালির চাইতে আদিবাসী সমাজ কার্যত ভূমিহীন। আদিবাসীদের ভূমি নিয়ে সবচেয়ে বেশি অন্যায়ের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ভূমি দখল ও অন্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাষার বিলুপ্তি ও ওপর থেকে চাপানো পারিবর্তন। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প কেবল লাখো মানুষকে উদ্বাস্তু করেনি বা জন্মমাটি তলিয়ে দেয়নি, এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা-ভূগোলেও ঘটেছে পরিবর্তন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট পরিচালিত ২০১৮ সালে শেষ হওয়া ভাষাগত জরিপের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে আদিবাসীদের ৪০টি মাতৃভাষা আছে। এর ভেতর কন্দ, খাড়িয়া, কোডা, সৌরা, মু-ারি, কোল, মালতো, খুমি, পাংখোয়া, রেংমিটচা, চাক, খিয়াং, লুসাই ও লালেং এই ১৪টি আদিবাসী মাতৃভাষা বিপন্ন। সেইসব আদিবাসী জাতির মাতৃভাষাগুলো বেশি বিপন্ন যারা ভূমিগতভাবে বেশি প্রান্তিক এবং যাদের ভূমি সবচেয়ে বেশি জবরদখল হয়েছে। ভাষা সুরক্ষা প্রশ্নে অবশ্যই আমাদের ভূমির ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। ভূমি ও ভাষার জনভিত্তিকে জোরালো ও তৎপর করতে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন স্পষ্ট করা জরুরি।

লেখক: গবেষক ও লেখক

animistbangla@gmail.com