ম্লান হয়ে যায় ইতিহাস

বাঙালির অমূল্য ইতিহাস আছে, ভাষা-সংস্কৃতির। সেই চর্যাপদের সময় থেকে আজ পর্যন্ত, বাঙালি হারিয়েছে অনেক। প্রাপ্তিও কম নেই। সুদীর্ঘ সময়ে, বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পার হয়ে বাঙালি আজ নিজস্ব পরিচয়ে অহংকারের পর্যায়ে। পৃথিবীর কয়টি দেশ আছে, যার নামগন্ধে জড়িয়ে আছে- ভাষা? এই বাংলাদেশটিই, ভাষায় মোড়ানো। তবু এক ধরনের উন্নাসিকতা, আমাদের আচ্ছন্ন করে। আমরা ভাষাশহীদদের কথা মনে রাখি না। রাখতে চাইও না! ব্যস্ত থাকি, নিজেকে নিয়ে। আপন স্বার্থপরতার কাছে, ঢাকা পড়ে যায় ইতিহাস ও ঐতিহ্য। কেবলমাত্র বিশেষ দিনে, লোক দেখানো শ্রদ্ধা জানাই তাদের। কর্তব্য মনে করে, তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি।

গতকাল দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত- ‘ভাষার মাসে কদর বাড়ে সালাম জব্বারের’ শিরোনামের সাংবাদের মাধ্যমে জানা যায়- ‘শুধু ভাষার মাসেই কদর বাড়ে। গণমাধ্যমকর্মী, প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে। সারা বছর কারও কোনো খোঁজখবর থাকে না।’ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ভাষাশহীদ আবদুস সালামের ভাইয়ের ছেলে মো. নুরে আলম। একই অবস্থা আরেক ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বারের জন্মস্থানের। সারা বছর তেমন কোনো লোকসমাগম না দেখা গেলেও ভাষার মাসে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। এ বছরও জেলা পরিষদের উদ্যোগে চলছে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে সাজসজ্জার কাজ।

সংবাদে আরও জানা যায়- ২০০৮ সালে আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু বছরজুড়ে থাকে সুনসান নীরবতা। জাদুঘরে সালামের একটি ছবি ছাড়া আর কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে একজন লাইব্রেরিয়ান ও একজন কেয়ারটেকার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারাও অলস সময় কাটান। তবে ভাষার মাস এলেই লোকজনের আনাগোনা বাড়ে।

ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বার ময়মনসিংহের গফরগাঁও থানার পাঁচুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। তার নামে রাওনা ইউনিয়নের পাঁচুয়া গ্রাম নামকরণ করা হয়েছে জব্বারনগর। শহীদ জব্বার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হয়। গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের আলমারিতে শোভা পাচ্ছে ৪ হাজার ১৩০টি বই। জাদুঘরটি গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। লাইব্রেরিয়ান মো. কায়সারুজ্জামান জানান, জাদুঘরের সামনে, শহীদ মিনার কিংবা ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বারের ম্যুরালের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার ঝোঁক তরুণদের। ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বারের ব্যবহৃত কোনো স্মৃতি এখানে নেই। কিন্তু অন্য ভাষাশহীদদের কথা আমরা ভুলে গেছি।

ভাষাশহীদ ওহিউল্লাহর বয়স ছিল ৮ কিংবা ৯। সম্ভবত কনিষ্ঠতম ভাষাশহীদ। ২২ তারিখে নবাবপুর রোডের খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে পাকিস্তানি শাসকচক্রের বুলেট রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমানের শিশুপুত্র ওহিউল্লার মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়। তার লাশটাও গুম করে ফেলা হয়েছিল।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র বরকত ১৯৫১ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পাস করেন। রফিকউদ্দিন ছিলেন মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের আইকমের ছাত্র। শফিউর রহমান ঢাকার হাইকোর্টে হিসাবরক্ষণ শাখায় চাকরি করতেন। ২৬ বছরের সুঠাম যুবক আব্দুল আওয়াল ২২ ফেব্রুয়ারি শহীদ হন। রিকশাচালক আব্দুল আওয়াল বাবা, মা, স্ত্রী এবং ছয় বছরের কন্যার সঙ্গে বাস করতেন ঢাকার হাফিজুল্লাহ রোডে।

এসব এখন ইতিহাস। এরা আমাদেরই সূর্যসন্তান। যাদের রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি- বাংলা ভাষা। সেই পথ ধরেই বাঙালি এগিয়েছে স্বাধীনতার পথে। এইসব সূর্যসন্তানের আত্মাহুতির ইতিহাস আমরা ভুলে যেতে চাই! যাদের রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি বাংলা ভাষা- তাদের কাছে জাতির ঋণ, কোনোদিনও শোধ হবে না। ভুলে গেলে চলবে না- রক্তঋণ কোনোদিন শোধ হয় না।