ভারত-পাকিস্তানের মর্জিতে ঝুলে আছে সার্ক সম্মেলন

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) বয়স এখন ৩৭ বছর। এর মধ্যে ১৮টি সম্মেলন হয়েছে। চার্টার অনুযায়ী প্রতি বছর একটি করে সম্মেলন হওয়ার কথা। কিন্তু শুরু থেকেই বিলম্বে এই জোটের সম্মেলন হয়ে আসছে। তবে সর্বশেষ ২০১৬ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের ইসলামাবাদের সম্মেলন হওয়ার দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পরও সেটি স্থগিত হয়ে যায়। ইসলামাবাদের সম্মেলনে যোগ না দেওয়া বিষয়ে প্রথমেই ভারত সিদ্ধান্ত জানায়। এরপর বাংলাদেশও আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ না দেওয়ার বিষয়টি জানায়। এরপরই সার্কের সর্বশেষ সদস্যরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ভুটানও অসম্মতি জানায়। এরপর থেকেই মূলত সার্ক অকার্যকর হয়ে পড়ে।

৯ বছর ধরে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হচ্ছে না। সার্কের সনদ অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলো একমত না হলে শীর্ষ সম্মেলন হতে পারে না। মূলত ভারত ও পাকিস্তানের ঐকমত্য না হওয়ায় ঝুলে আছে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। ভারত ও পাকিস্তান রাজি হলেই শীর্ষ সম্মেলনটি হতে পারে বলে জানিয়েছে কূটনৈতিক সূত্র। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, করোনা মহামারীর সময় থেকেই সার্ক সক্রিয় করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে দেশগুলো। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই আরও বেশি করে সার্ক আলোচনায় আসছে। ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভুটানসহ দেশগুলো চায় সার্ক গঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে এগিয়ে নিতে সংস্থাটি সক্রিয় হোক।

দেশগুলোর এমন মনোভাবের মধ্যে প্রায় ২০ বছর পর সার্ক মহাসচিব পাচ্ছে বাংলাদেশ। চলমান আফগানিস্তান পরিস্থিতির কারণে এরই মধ্যে সদস্যদেশগুলো বাংলাদেশ থেকে মহাসচিব চূড়ান্ত করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে।

শ্রীলঙ্কার ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসে সম্প্রতি যোগ দিয়েছিলেন নেপালের সদ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করা বিমলা রায় পাওডেল। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ও সংস্থাটির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন বিমলা রায় পাওডেল। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন বলেন, ‘তিনি সার্কের বিষয়টি আলোচনায় তুলেছেন। আমি বলেছি, আপনারা বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেন। দেখেন ভারত-পাকিস্তানকে রাজি করাতে পারেন কি না। আমরা চাই রিজিওনাল কিছু অর্গানাইজেশন গড়ে তুলতে; যাতে আমাদের সমস্যাগুলো আমরা সমাধান করে ফেলতে পারি।’ তাহলে নতুন কোনো জোট হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জোট-ফোট কিছু না। আমরা মেন্টালি রেডি। আমরা জোট করেছিলাম “সার্ক”। তখন এ নিয়ে পশ্চিমারা বলেছে, পুরমেন্স ক্লাব। এখন আবার পুরমেন্স ক্লাবে নজরও দিচ্ছে। আমরা  ইটানিং মাল্টি লেটারিজমও চাই। ইটানিং মাল্টি লেটারিজম দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, এটা আমরা চাই না।’

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, সার্কের বর্তমান মহাসচিব এসালা রোয়ান উইরাকুনের দায়িত্ব শেষ হবে ২৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর আফগানিস্তান থেকে মহাসচিব নিয়োগের কথা থাকলেও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ থেকে মহাসচিব নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে সাধারণত একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অথবা সাবেক কূটনীতিককে মহাসচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে সার্ক সচিবালয়কে অবহিত করা হবে। এখানে অন্য দেশগুলোর মতামত নেওয়া বা অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশি মহাসচিবের মেয়াদ যখন শেষ হবে, তখন যদি আফগানিস্তান পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, তখন দেশটি পরবর্তী মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

সার্ক সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের ৮ ডিসেম্বর সার্ক প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত দুই দফায় সংস্থাটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছে বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠার পর সংস্থাটির প্রথম মহাসচিব হিসেবে ১৯৮৫ সালের ১৬ জানুয়ারি থেকে ১৯৮৯ সালের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফায় ২০০২ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ২০০৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে।

নেপালের কাঠমান্ডুতে সার্কের শেষ শীর্ষ সম্মেলন হয়েছিল ২০১৪ সালের নভেম্বরে। এরপর সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে।

২০২০ সাল থেকে সার্কের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন শ্রীলঙ্কার কূটনীতিক এসালা রোয়ান উইরাকুন। গত বছরের জুনে পাঁচ দিনের সফরে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। ওই সফরে বৈঠকগুলোতে তিনি সার্ককে বিদ্যমান জটিলতা থেকে বাঁচাতে বাংলাদেশের হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সংযোগ স্থাপনে সার্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশের ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। সার্ক ব্যবস্থার মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন পদ্ধতি সক্রিয় ও অনুপ্রাণিত করতে বাংলাদেশের সদিচ্ছার প্রশংসা করেন।