শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া নিয়ে সংঘর্ষ হামলা, আহত ৩১

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবারের এসব সহিংসতায় কমপক্ষে ৩১ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ক্রম ভেঙে জুতা পায়ে বেদিতে ওঠার প্রতিবাদ করায় ছাত্রলীগের হামলায় পাঁচ নেতাকর্মী আহত হওয়ার অভিযোগ করেছে ছাত্র ইউনিয়ন। ফেনীর সোনাগাজীতে ছাত্রলীগের হামলায় দলের আট কর্মী আহত হয়েছে বলে দাবি করেছে বিএনপি। আর ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বিএনপি-ছাত্রলীগ সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া মানিকগঞ্জে শ্রমিক লীগের দুপক্ষের মারামারিতে ১০ জন এবং বগুড়ার ধুনটে মহিলা আওয়ামী লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষে দুই নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। বিস্তারিত চট্টগ্রাম ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে :

চট্টগ্রামে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে মহানগর ছাত্রলীগের হামলায় ছাত্র ইউনিয়নের পাঁচ নেতাকর্মী আহত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিউনিসিপ্যাল মডেল হাই স্কুলে অস্থায়ী শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে। আহতরা হলেন ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি ইমরান চৌধুরী, কোতোয়ালি থানার সাধারণ সম্পাদক এসএম নাবিল, পাহাড়তলী থানার সভাপতি ডেনি বিশ্বাস, সাংগঠনিক সম্পাদক বর্ষা দেবী এবং হালিশহর থানার সহসভাপতি মিজানুর রহমান আরিফ।

ছাত্র ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি ইমরান চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, ‘সিরিয়াল ভঙ্গ করে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা বেদিতে জুতা নিয়ে ওঠেন। প্রতিবাদ করায় আমাদের নেতাকর্মীর ওপর কোতোয়ালি থানা ছাত্রলীগ ও দক্ষিণ জেলা যুবলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়।’ তবে এ হামলায় তাদের সংগঠনের কেউ জড়িত নয় বলে দাবি করেন মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর।

সোনাগাজীতে ছাত্রলীগের হামলায় ফুল দিতে পারেনি বিএনপি : ফেনীর সোনাগাজীতে ফুল দিতে যাওয়ার পথে ছাত্রলীগের হামলায় দলের আট কর্মী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গত সোমবার রাতে শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সোনাগাজী উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও শহীদ জিয়া মঞ্চের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুর হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘রাত সাড়ে ১১টার দিকে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ বেদিতে ফুল দিতে রওনা হয়। বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছলে ছাত্রলীগের ২০-২৫ জন নেতাকর্মী হঠাৎ লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। তারা পিটিয়ে আমাদের আট কর্মীকে আহত করে। এ ছাড়া ছাত্রলীগের লোকজন আমাদের হাত থেকে ফুলের তোড়া কেড়ে নিয়ে ভেঙে রাস্তায় ফেলে দেয়।’

তবে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রাসেল বলেন, ‘বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে মারামারি হয়েছে। ছাত্রলীগ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত না।’

সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মো. খালেদ হোসেন বলেন, ‘রাতে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাওয়ার পথে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও বিএনপির নেতাকর্মীরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মুখোমুখি হয়ে যান। এ সময় উভয়পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। তাৎক্ষণিক পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং দুপক্ষকে সরিয়ে দেয়।’

মানিকগঞ্জে শ্রমিক লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ : মানিকগঞ্জে শহীদ মিনারের পাদদেশে জেলা শ্রমিক লীগের দুপক্ষে মারামারি হয়েছে। এতে উভয়পক্ষের ১০ জন আহত হয়। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম মহীউদ্দীনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা শেষে ফুল দেওয়ার জন্য শ্রমিক লীগের সভাপতির নাম বলার পর উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে জেলা শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল জলিল ও বাবুল সরকারের নেতাকর্মীদের মধ্যে এই সংঘর্ষ বাধে। জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ও পুলিশের হস্তক্ষেপে আধা ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় শহীদ বেদিতে ফুল দিতে আসা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে ফুল না দিয়ে অনেকে শহীদ বেদি থেকে চলে যান।

কালীগঞ্জে বিএনপি-ছাত্রলীগ সংঘর্ষ : ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে সরকারি মাহাতাব উদ্দিন ডিগ্রি কলেজে শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে বিএনপি ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় একটি ককটেলের বিস্ফোরণ হয়। গতকাল সকালে সরকারি মাহাতাব উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ফিরছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। কলেজের গেটের সামনে পৌঁছলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয় তাদের। একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে পথচারীসহ উভয়পক্ষের অন্তত ছয়জন আহত হন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহতদের উদ্ধার করে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে ছাত্রলীগকর্মী ইরফান রাজা রুকুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কালীগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুল আলম বলেন, ‘আমাদের ছেলেরা দাঁড়িয়ে ছিল। সেখানে বিএনপির নেতাকর্মীরা এসে হামলা চালায়। তারা পরিকল্পিতভাবেই আগে থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে এসেছিল। ফিরে যাওয়ার সময় তারা একা পেয়ে ছাত্রলীগকর্মী ইরফান রাজা রুকুকে কুপিয়ে আহত করে। একটি ককটেল বিস্ফোরণও ঘটানো হয়।’

তবে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেরার পথে পেছন থেকে আমাদের ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ধাওয়া করলে জনতা প্রতিরোধ করে। সে সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ককটেল বিস্ফোরণও ঘটায়। এ ঘটনায় আমাদের ৮-১০ নেতাকর্মী আহত হয়েছে।’

ধুনটে মহিলা আওয়ামী লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ : বগুড়ার ধুনটে মহিলা আওয়ামী লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ হয়। এতে আহত হয়েছেন সংগঠনের দুই নেতাকর্মী। গতকাল দুপুর ২টার দিকে উপজেলা পরিষদ সড়কের একটি খাবার হোটেলে সামনে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে সোমবার রাতে দুপক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। আহতরা হলেন চৌকিবাড়ী ইউনিয়ন মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক লিপি আকতার (৩৮) ও মহিলা আওয়ামী লীগের কর্মী কাউসার জাহান কেয়া (৩০)। লিপিকে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আর কেয়াকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

জানা গেছে, উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পপি রানী পোদ্দার ও সাধারণ সম্পাদক সুলতানা জাহানের মধ্যে দলীয় কর্মকা- নিয়ে বিরোধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দুপক্ষের নেতাকর্মীরা পাল্টাপাল্টি বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে রাত ১২টা ১ মিনিটে মুজিব চত্বর এলাকায় শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ সময় উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণকালে উভয়পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করে। এরই মধ্যে গতকাল দুপুর ২টার দিকে মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পক্ষের নেত্রী লিপি আকতার উপজেলা পরিষদ চত্বরে একটি হোটেলে খাবার খেতে বসেন। এ সময় সাধারণ সম্পাদকের পক্ষের কর্মী কাউসার জাহান কেয়া ওই হোটেলে ঢুকে তাকে গালাগাল করতে থাকেন। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে মারামারিতে তারা আহত হন।

* প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছে চট্টগ্রাম ব্যুরো এবং সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিরা