বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকটের কারণে বিদেশি ফলের দাম যতটা বাড়ার কথা বিক্রি হচ্ছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে। মৌসুমি আমদানিকারক, মধ্যস্বত্বভোগী এবং আড়তদার দাম বৃদ্ধির এ কারসাজিতে জড়িত। এতে পকেট ভারী হচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীদের আর ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ।
আমদানি হওয়া তাজা ফলের বড় অংশই হচ্ছে আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর ও নাশপাতি। বিদেশি ফলের সিংহভাগ আমদানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই। ২০২১-২২ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টন তাজা ফল আমদানি হয়। তার আগের অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৫ লাখ ৮৪ হাজার টন ফল। ডলার সংকট ও বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে বিদায়ী অর্থবছরের শেষ হিসেবে বিদেশি ফল আমদানি প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ফলের বাজার বাদামতলী। ১৯ কেজির এক কার্টন আমদানি করা ফুজি চায়না আপেল এ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৬০০ টাকা দরে। এ আপেল পাইকাররা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার ১০০ টাকায়। আর ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে তার চেয়েও বেশি দামে। বাজারে এক কেজি আপেল এখন বিভিন্ন মানভেদে ২৬০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সুপারশপ বা বিশেষায়িত দোকানগুলোতে দাম আরও বেশি। গ্রিন আপেল কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। যা তেলের দাম বাড়ার আগে ছিল ২৪০ থেকে ২৮০ টাকা। ফুজি আপেল কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, যা আগে ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। মাল্টার কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২১০ টাকা, যা আগে ছিল ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা। কমলা বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি, যা আগে ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং বিদেশি ফল আমদানিকারক দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান সাথী ফ্রুটস লিমিটেডের মালিক সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডলার সংকটের কারণে গত প্রায় ছয় মাস ধরে নিয়মিত ফল আমদানিকারকদের বেশিরভাগ এলসি খোলার সুযোগ পায়নি। অথচ এতদিন যাদের ফল আমদানিতে দেখিনি এমন মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে বিদেশি ফল ঠিকই আমদানি করেছে। আমদানি করা এসব ফল মজুদ রেখে চাহিদার তুলনায় কম পরিমাণে সরবরাহ করছে। কোনো বিদেশি ফলের দাম দুই-তিনগুণ বা তার বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। বিদেশি ফলের দাম বেশি হওয়ার কারণে দেশি ফলের দামও অনেকে বাড়িয়ে বিক্রি করছে।’
এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈশ্বিক মন্দা এবং ডলার সংকট চলছে। এসবের কারণে ব্যবসায়ীরা বেশি দামে পণ্য সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ন্যূনতম লাভে পণ্য বিক্রি করলেও দাম আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে। তবে কিছু ব্যবসায়ী এ অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অনেক পণ্যের দাম যতটা বাড়ার কথা তার চেয়ে বেশি বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। এফবিসিসিআই এ অন্যায়কে সমর্থন করে না।’
ডলার সংকটের কারণে বিভিন্ন ব্যাংকের পক্ষে ঢালাওভাবে এলসি খোলার অনুমতি দেওয়া সম্ভব হয় না। সরকার বিলাসজাত খাদ্য হিসেবে বিদেশি ফল আমদানিতে এলসি খোলায় কড়াকড়ি করতে নির্দেশ দেয়। সম্প্রতি সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘এখন ডলার সেভ করা দরকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে যেটা অপরিহার্য, সেটাতেই আমরা বেশি জোর দিচ্ছি। বিদেশি মুদ্রায় অতিরিক্ত চাপ না পড়ে এ জন্য বিদেশি ফল আমদানিতে এলসি একটু সীমিত করা হয়েছে। সময় ভালো হলেই আবার খুলে দেওয়া হবে।’
তবে সরকারের এ কড়াকড়ির মধ্যে ফল আমদানি কমলেও থেমে থাকেনি। মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি কিছু ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশি ফল আমদানি করেছেন। অভিযোগ পাওয়া গেছে, মৌসুমি আমদানিকাররা আমদানি করা ফলের সবটা বাজারে ছাড়েননি। মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে এবং আড়তদারের কাছে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করেছেন। অনেকে আবার সরাসরি পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেছেন। অনেকে নিজস্ব এজেন্টের মাধ্যমে খুচরা পর্যায়েও সরবরাহ করছেন। বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্রেতার কাছে বিদেশি ফল স্বাভাবিক দামের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরে ফলপট্টিতে অসুস্থ মায়ের জন্য ফল কিনতে আসা মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার অসুস্থ মাকে ডাক্তার ডালিম, আপেল, মাল্টা খেতে বলেছেন। কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু আমার ৪০ বছরের জীবনে বিদেশি ফলের এত বেশি দাম দেখিনি। এক ধরনের ফলও কিনতে পারিনি। দেশি ফলের এখন সিজন নয়। যা বিক্রি হচ্ছে তার দামও বেশি। পরিবারের অন্যরা না খেলেও চলে, অসুস্থ মায়ের জন্যও ফল কেনা সম্ভব হলো না।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অতীতেও দেখা গেছে ব্যাংক তার পুরনো বড় গ্রাহকদের কিছু সুবিধা দিয়ে ধরে রাখে। কিন্তু আমাদের আপত্তি হলো সুবিধা নিয়ে কে বা কারা সাধারণ ক্রেতাকে জিম্মি করে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করে কষ্টে ফেলছে। এসব তদন্ত করে দেখা উচিত। তবে নিয়মিত ব্যবসায়ীদের অনেকে জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বৃদ্ধির বেশি দিতে হচ্ছে বলেও বিদেশি ফলের দাম কিছুটা বেশি রাখতে বাধ্য হচ্ছে। তবে তার সংখ্যা অল্প।’
সাথী ফ্রুটস লিমিটেডের মালিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বহু বছর থেকে বিদেশি ফল আমদানি করছি। বিদেশি ফল বিক্রির সবচেয়ে বড় বাজারের একটি বাদামতলীতে বিদেশি ফল আমদানিতে এবারে অনেক নতুন মুখ দেখছি যাদের এতদিন দেখিনি। আমি ভোক্তা অধিকারসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে বিষয়গুলো বলেছি।’
বাংলাদেশে অন্যতম ফল রপ্তানিকারক দেশ চীন। দেশটির ব্যবসায়ীরা ইংরেজি বছরের প্রথম ১৫ দিন ছুটি কাটান। এ সময় ফল রপ্তানি বন্ধ থাকে। প্রতি বছরের মতো এবারও রপ্তানি প্রায় বন্ধ রেখেছিলেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে আপেলের চাহিদা বেশি থাকলেও অন্যতম আপেল আমদানিকারক দেশ ভারতে এখন এটির পিক সিজন না। এসব কারণেও বাংলাদেশের নিয়মিত বিদেশে ফল আমদানিকারকরা ১৫ দিন আগে এলসি খুলতে পারলেও চাহিদামতো বিদেশি ফল সংগ্রহে সমস্যায় পড়েছেন। বাংলাদেশের বিদেশি ফল আমদানিকারকরা নিউজল্যান্ড, চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বিদেশি ফল আমদানির বিষয় চূড়ান্ত করেছেন। এসব দেশ থেকে বাংলাদেশে আনার জন্য গত শুক্রবার জাহাজে বিদেশি ফল তোলা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট খাতের নিয়মিত আমদানিকারকরা জানান, রমজানের আগে বা প্রথম ভাগে এসব বিদেশি ফলভর্তি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তারা আশা করেছেন এসব বিদেশি ফল দেশের বাজারে ছাড়া হলে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, দাম কমবে।
২০২১ সালে আমদানির হিসাব অনুযায়ী, দেশের মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৬ লাখ ৮৮ হাজার কেজি বিদেশি ফল খায়। আর খুচরা মূল্যে প্রতিদিন ফল বেচাকেনা হচ্ছে কমবেশি ২৭ কোটি টাকার। ধারণা করা হয়, দেশে খুচরা পর্যায়ে বছরে ফলের বাজারের আকার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।