ঠিক সময়টা মনে করতে পারছি না তবে পঞ্চাশ বছর আগের তো হবেই। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন একটা কথা বলেছিলেন দেশে এখন রুচির দুর্ভিক্ষ চলছে। কথাটি নিয়ে অনেকবার ভেবেছি। প্রত্যেক সমাজেই কিছু রুচিবান লোক থাকেন আবার কিছু লোক থাকেন যারা রুচির ধার ধারেন না। তাদের দৃষ্টি চলতি হাওয়ার দিকে। তবে রুচিবান মানুষরা মানুষের উন্নত রুচির খোঁজ-খবর দিয়ে থাকেন। কী শিল্প-সাহিত্যে, কী প্রাত্যহিক জীবনে। বর্তমানে কথাটি একেবারেই সত্য বলে মনে হয়। এই দেখে যে, সত্যি রুচির এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ চলছে। এবারে দুর্ভিক্ষের উৎস হচ্ছে মিডিয়া।
দেশে মুক্তচিন্তা মহাপাপ, মুক্তচিন্তার জন্য কত মহৎপ্রাণ জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিল। কিন্তু মুক্তমিডিয়া সগৌরবে মানুষের রুচিকে হত্যা করতে শুরু করল। আজকাল প্রযুক্তির কল্যাণে মিডিয়া এমন একটা মুক্ত জায়গায় চলে গেছে যে সেখানে দুষ্ট রুচি ও নিম্ন রুচির জয়জয়কার। এইসব কুরুচির স্রষ্টারা তাদের সৃজনের ফসল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ কামাই করে চলছে। এর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করা অনেক লোক আছে- তাদের একজন স্বঘোষিত হিরো আলম। বাংলাভাষী দর্শকদের কাছে তিনি বেশ প্রিয়। সুরুচির জন্য বা কোনো সৃজনশীলতার জন্য নয়, তিনি প্রিয় রুচিহীন বিনোদনের খাদ্য তৈরি করে ফেরি করার জন্য। সমাজের অনেক সুরুচিসম্পন্ন লোক বলে খ্যাত ব্যক্তিরাও হিরো আলমের সুখ্যাতি করেন, তাদের স্বাধীন কলমটি দিয়ে দু-চার কথা লিখেও ফেলেন। অবশ্য আজকাল কলম লাগে না, মুখে বলা যায়, কম্পিউটারে পটাপট টাইপ করে মুক্তমিডিয়ায় পোস্ট করে দেন। ফলাফল এই দাঁড়ায় যে, তিনি আর মিডিয়ায় আবদ্ধ থাকতে চান না। তার শক্তিশালী রুচিহীন ঈগলের ডানাটি উড়তে উড়তে এসে জাতীয় রাজনীতিতে অবতরণ করে। স্কুলে একজন শিক্ষক তার নির্বাচনের প্রয়োজনে একটি মাইক্রোবাসও উপহার দেন। শোনা গেল, মাইক্রোবাসটির আট বছরের কোনো কাগজপত্র নেই। একজন চিত্রনায়িকাকেও দেখা গেল নির্বাচনী অভিযানে নেমে পড়েছেন। এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সামান্য ভোটে পরাজিত হয়েছেন। এই নিয়েও প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে লেখাজোখার মাধ্যমে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। তাদের মধ্যে আমিও একজন।
কিন্তু মিডিয়া যেহেতু মুক্ত তা জেনে আমি নিজেও লজ্জা পেয়েছি। আজকাল প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে নাটকের জন্য একটা কথা বেশ চালু হয়েছে। তা হলো দর্শক রোমান্টিক কমেডি চায়, এবং তার সঙ্গে আকার ইঙ্গিতে একটু অশ্লীলতাও চায়। দর্শকদের মধ্যেও একটা বিড়াট অংশ এর সমঝদার। তাদেরও দাবি তাই। নিবেদিতপ্রাণ শত শত পরিচালক এবং কাহিনীকার কলম এবং ক্যামেরা নিয়ে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এবং তারা অরুচির গহিন অরণ্যে ডুব দিয়ে স্বপ্নের হিরো আলমকে ধরতে চাইছেন। এবং নিজেরা একটা আত্মতুষ্টিতে ভুগছেন যে, আমি হিরো আলমের চেয়ে ভালো। কিন্তু যেসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী হিরো আলমকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন তাদের মনের মধ্যে একজন হিরো আলম বসবাস করে। এবং তারা ঘটনাক্রমে একটা লেবাস পরে পদক পুরস্কার পেয়ে সমাজের একটা জায়গায় নিজেদের অধিষ্ঠিত করেছেন।
আমরা সবসময়ই মনে করি পশ্চিমবঙ্গের দর্শক আমাদের চেয়ে ভালো। কিন্তু প্রথম খটকা লাগল যখন বেদের মেয়ে জোছনা ওখানকার সিনেমার সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ফেলল। এবং আমাদের একজন নায়িকা ওখানে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে অনেক বড় নায়িকার ধস নামিয়ে দিলেন। হিরো আলমের প্রতি সাম্প্রতিককালে সবার মতো আমারও কৌতূহল হলো। দেখলাম পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু করে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক, লন্ডন এসব জায়গায় ব্যারিস্টার নামে খ্যাত অনেক কালো কোট পরা নরনারী হিরো আলমের সাফাই গাইতে শুরু করেছেন। একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের দেশে যে কেউ নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন এবং তার সপক্ষে ভোট চাইবার জন্য যেকোনো অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। অতীতে আমরা সশস্ত্র প্রচার অভিযান দেখেছি কিন্তু এবারে তার প্রয়োজন হয়নি। কারণ প্রার্থী হিরো আলম নিজেই মুক্তিবান রুচির দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। শুধু তাই নয়, দেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে কথাও বলতে পারেন। সরকার এবং বিরোধী দলের নেতারা তাদের সুবিধামতো মন্তব্যও করে যাচ্ছেন। রুচির দুর্ভিক্ষে হিরো আলমের একটা বড় সুবিধা হয়েছে বটে কিন্তু চিন্তা ও যোগ্যতার দুর্ভিক্ষে যখন অযোগ্য লোকেরা দেশের আইন প্রণয়ন করছেন তখন তাদের উচ্চকণ্ঠ কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারছে না। বছরের পর বছর যে সংসদ অকার্যকর হয়ে থাকে, সংসদের ভেতরে দুই দলের মধ্যে যখন বচসা শুরু হয় তখন হিরো আলমদের চরিত্রের সঙ্গে খুব একটা অমিল দেখা যায় না। দেশের সাংসদ এবং স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা যে ভাষায় কথা বলেন এবং যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন তা হিরো আলম রচিত গান নাটক বা সিনেমার চেয়ে উন্নত কিছু নয়। যদি রাজনীতি সঠিক অবস্থানে থাকত, যদি সেখানে রুচির দুর্ভিক্ষ না থাকত তাহলে হিরো আলম হয়তো সাংসদ হওয়ার নির্বাচনে অংশই নিতেন না। হিরো আলম যতই জনপ্রিয় হোন, তিনি তো আর চার্লি চ্যাপলিনের সমকক্ষ নন। চার্লি চ্যাপলিন যখন নিউ ইয়র্ক শহরে আসতেন তখন ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। তারপরেও তিনি তো নির্বাচনে যাননি। তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবেননি। কিন্তু তিনি ছিলেন রাষ্ট্রনায়কদের কট্টর সমালোচক। জনপ্রিয়তা আমাদের দেশে একটা অদ্ভুত ব্যাপার। আমার মতো একটু আধটু মিডিয়ায় জনপ্রিয় ব্যক্তিরা এলাকায় বেড়াতে গেলেই গ্রামের লোকেরা বলতে থাকে আপনি ইলেকশন করেন। এই অবস্থা হিরো আলমেরও হয়েছে। এবং তিনি বিশ্বাস করেছেন জনপ্রিয়তাই রাজনীতির একটা বড় শর্ত। তবে মানুষ যখন অযোগ্য লোকদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেখেন তখন হিরো আলমকেও তাদের চেয়ে অযোগ্য ভাবেন না।
বোম্বের কিছু মহানায়ক নির্বাচনে জয়ী হয়ে মন্ত্রীও হয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা যথেষ্ট সুনাম নিয়ে ফিরতে পারেননি। দক্ষিণ ভারতে দর্শকরা নায়ককে ত্রাতা মনে করেন। এটা মনে করে তারা যথেষ্ট খেসারতও দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গেও এই রীতি চালু হয়েছে। সে কারণেই পশ্চিমবঙ্গের একটা শ্রেণির মানুষের কাছে হিরো আলম যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছেন। গত কয়েক দশক ধরে সমাজের এক শ্রেণির লোক জনপ্রিয় হতে শুরু করেছেন। প্রচুর টাকা খরচ করে জনগণ তাদের বাহাস শোনেন। একদিকে যাত্রাপালার জন্য প্রশাসনের অনুমতি মেলে না অন্যদিকে শত শত মাইক লাগিয়ে মানুষের ঘুম হারাম করে অবিরাম ওয়াজ মাহফিল চলছে। যার ফলাফলে হিজাব-বোরখা এবং মাদ্রাসায় দেশ প্লাবিত হয়ে গিয়েছে। যে শিক্ষক হিরো আলমকে গাড়ি উপহার দিয়েছেন তার মতো শিক্ষকের এখন আর অভাব নেই। পনের-বিশ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে শিক্ষকতার চাকরি যারা নেন এবং যারা এর দালালি করেন তাদের পক্ষে রুচিহীন রাজনীতি করা অত্যন্ত সহজ কাজ।
আজ দেশে কুরুচির একটা প্রতিযোগিতা চলছে। দুর্ভিক্ষ ঘটে গেছে। খাদ্যের দুর্ভিক্ষকে নিরাময় করা সম্ভব কিন্তু কালে কালে যে রুচির দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে তাকে ফেরানো অত্যন্ত কষ্টকর কাজ। অপরাজনীতি অপসংস্কৃতি সবাই মিলে এই দুর্ভিক্ষ ঘটিয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল অবৈধ অর্থ। হিরো আলম তেমনি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্ষম ব্যক্তি। নেটওয়ার্কে ভেসে তার টাকা আসে। প্রচুর অবৈধ অর্থের মালিক তার টাকার জোগান দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। একদা একজন শিক্ষক সাংসদ এবং কোনো প্রবীণ নেতা সমাজে অত্যন্ত সম্মানের জায়গায় অবস্থান করতেন। গ্রামের সিভিল সোসাইটি বলতে তাদেরই বোঝাত। কিন্তু সেসব এখন অতীত। শিক্ষক আছেন, সাংসদ আছেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধি আছেন সব জায়গাকে গ্রাস করেছে অবৈধ অর্থ এবং তার সঙ্গে কুরুচির সংস্কৃতি। রুচির দুর্ভিক্ষে সমগ্র সমাজ নিপতিত এবং তারই একজন পণ্যসরবরাহকারী হিরো আলম এবং তার শতসহস্র অনুগামী। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনো প্রেসক্রিপশন কারও জানা আছে কি না জানি না, তবে এর জন্য বড় ধরনের একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার। কিন্তু তার জন্য কি সমাজ প্রস্তুত?
লেখক: নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামিস্ট
mamunur530@gmail.com