লোডশেডিং সমাধানে দিন গোনা ছাড়া উপায় নেই

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৯ এএম

কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে আগুন লাগার কারণেই বর্তমান গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। গ্যাস সংকট নিরসনে সরকারের সীমিত সক্ষমতা ও বর্তমান কাঠামোগত পরিস্থিতির কারণে এলএনজি টার্মিনাল মেরামত না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং কমিয়ে আনা বা দিন গোনা ছাড়া কোনো পথ নেই বলে তিনি মনে করেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘ন্যাভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস : ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাস্টেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক সংলাপে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন, ফুটওয়্যার লেদার গুডস অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বক্তব্য দেন।

মন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানির যে অবস্থা এটা নিয়ে আমরা সবাই সমস্যার মধ্যে আছি। এই ক্রাইসিসের সময়ে আসলে আমার কিছু করার নাই। কারণ এখন গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না, আবার এফএসআরইউ (ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট) ছাড়া যে গ্যাস আছে, সেটাও নামাতে পারব না। ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণেই বর্তমান গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের কিছু করার সুযোগ সীমিত। এখন শুধু দিন গোনা ছাড়া আর কিছু করার নেই। সমাধানে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছেন। পাশাপাশি লোডশেডিং যাতে কম হয় এবং ইন্ডাস্ট্রিকে যাতে গ্যাসটা দিতে পারি, সেই ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে।’

ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে আরও তিনটি এফএসআরইউ থাকবে। দক্ষিণাঞ্চলের পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান নিয়ে সরকার কাজ করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মহেশখালীর উপকূলে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ‘গরিবের টেসলা’ আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এগুলোর বেশিরভাগই রাত ১২টার পর অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়। একটা সময় বিদ্যুতের পিক আওয়ার (সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময়) ছিল দিনের বেলা। ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে এখন এটা বদলে রাতে হয়েছে। মোট চাহিদা বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে। এসব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে অনেক জায়গায় সরকারি কর্মচারীরা হামলার শিকার হচ্ছেন।

মূল প্রবন্ধে সিপিডির পক্ষ থেকে জ্বালানি সংকট কাটাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নীতির সুপারিশ তুলে ধরে ফখরুদ্দিন আল কবির বলেন, দেশে জ্বালানি সংকট এখন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। মূলত অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ৮৪ শতাংশই আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে একদিকে আমদানির ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রারও অপচয় হচ্ছে। ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানি খাতে সঠিক বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি এবং নির্ধারিত লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি না থাকায় সংকট আরও গভীর হয়েছে। শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে অতীতের সুশাসনের অভাব ও সংস্কারহীনতা দূর করে সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। টেকসই সমাধানে সাময়িক পদক্ষেপের বদলে ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানাগুলোয় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। এই সংকটের ফলে শিল্প খাত গভীর বিপর্যয়ে পড়েছে। সংকট বড় করে প্রচার হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এদিকে উচ্চ হারে বিল দিয়েও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাঁচাতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি সুরক্ষা বা ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় আমাদের মানসম্মত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ জরুরি। তিনি লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ ও সিস্টেম লস কমানোর তাগিদ দেন। এছাড়া সোলার স্টোরেজে করছাড় এবং শিল্প খাতকে জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

ড. ইজাজ হোসেন বলেন, সরকারের অতিরিক্ত সামাজিক প্রতিশ্রুতি, সঠিক মূল্যনীতির অভাবে দেশের তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে। এটা শুধু বর্তমান সরকার  না, আগের সব সরকারই অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু সংকট সমাধানের চেষ্টা করেনি। বছরের পর বছর তা জমিয়ে রেখে আজ এ পর্যায়ে আনা হয়েছে। কেবল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা না করে চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও জোর দিতে হবে। সাশ্রয়ী মূল্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও আবাসিকে ভর্তুকিমূল্যে গ্যাস সরবরাহ করার কারণে সরকার এখন বড় অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে। কোনো সরকারের পক্ষেই হঠাৎ এ ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়।

ডেভিড হাসনাত বলেন, গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে দেশের একটি বড় অংশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র টানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কূপে উৎপাদন দ্রুত কমতে থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সময়সাপেক্ষ। তাই দ্রুত সংকট মোকাবিলা ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘ল্যান্ডবেজড টার্মিনাল’ বা স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ওপর তাগিদ দেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত