নারী এসআইর কাণ্ড

থাকেন ঢাকায় এএসপির বাসায় হাজিরা চট্টগ্রামে!

ঢাকার মালিবাগে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার বাসায় ‘অবস্থান’ করে একই দিন চট্টগ্রামের কর্মস্থলে হাজির দেখিয়ে তথ্য গোপনের অভিযোগে চট্টগ্রাম নগর পুলিশে কর্মরত এক নারী উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়েছে। নগরীর হালিশহর থানায় কর্মরত ওই এসআইসহ মো. সোহেল উদ্দীন নামে এক সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) বিরুদ্ধে এক নারীকে মারধরের অভিযোগের প্রমাণও পেয়েছেন ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা সিএমপির উপকমিশনার (বন্দর) শাকিলা সুলতানা। মারধরের শিকার ওই নারী বিসিএস ক্যাডারের সরকারি কর্মকর্তা।

এএসপি সোহেল উদ্দীনের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে আদালতে পিটিশন দায়ের এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করার পাশাপাশি চট্টগ্রামে কর্মরত ওই নারী এসআইর বিরুদ্ধে গত বছরের ১৩ মার্চ সিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বিসিএস ক্যাডারের ওই নারী কর্মকর্তা।

এদিকে যৌতুক দাবির মামলায় গত বছরের ১১ নভেম্বর এএসপি সোহেল উদ্দীনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ গঠনের পর বিচার শুরুর আদেশ আসে। তা সত্ত্বেও বিধান অনুযায়ী চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত না করে তাকে এখনো স্বপদে বহাল রাখা হয়েছে।

বিসিএস ক্যাডারের ওই নারী কর্মকর্তার অভিযোগ, গত বছরের ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর মালিবাগে এএসপি সোহেলের ২২২/৯ পাবনা কলোনির বাসায় গেলে তাকে এবং ওই  নারী এসআইকে একসঙ্গে দেখে ফেলেন। এ সময় তাদের দুজনের মধ্যে ‘অনৈতিক সম্পর্কের’ প্রতিবাদ করলে তাকে তারা মারধর করেন। নারী এসআইর উসকানি ও প্ররোচনায় এএসপি সোহেল উদ্দীন তাকে হত্যার চেষ্টাও করেন। চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনারের কাছে দেওয়া এই অভিযোগ তদন্ত করেছেন সিএমপির উপকমিশনার শাকিলা সুলতানা। নারী এসআইর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করে পুলিশ কমিশনারের কাছে একটি প্রতিবেদনও দিয়েছেন উপকমিশনার শাকিলা সুলতানা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন,  ‘অভিযোগ তদন্ত করে ঘটনার সময় (গত বছরের ২৭, ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি) মালিবাগে এসএসপি সোহেলের বাসায় ওই সাব ইন্সপেক্টর (নওশীন মজুমদার) অবস্থান করলেও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য একই দিন তার চট্টগ্রামের কর্মস্থল ইন-সার্ভিস-ট্রেনিং সেন্টারে হাজির দেখানোর মতো ‘অপরাধ’ সংঘটন করেছেন। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও স্থিরচিত্র বিশ্লেষণ করে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।’

আরেক নারীর অভিযোগ, প্রথম স্ত্রীর তথ্য গোপন করে তাকে গত বছরের ১৪ জানুয়ারি তিন লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে করেন এএসপি সোহেল। কিন্তু তার সঙ্গে মাত্র ১৯ দিন সংসার করেন। প্রাইভেট কার কেনার জন্য ২৫ লাখ টাকা যৌতুক দাবি পূরণ না করায় সোহেল তাকে নোটিশ না দিয়েই তালাক দেন। পরে তিনি সোহেলের বিরুদ্ধে ঢাকার একটি আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা করেন। ওই মামলায় গত বছরের ১১ নভেম্বর বিচারক মো. রশিদুল আলম এএসপি সোহেল উদ্দীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে (চার্জশিট) বিচার শুরুর আদেশ দেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ গঠন হলেও এখনো স্বপদে বহাল আছেন সোহেল।

আদালতে অভিযোগ গঠনের পরও এএসপি সোহেল উদ্দীনকে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ বরখাস্ত না করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, ‘২০১৮ সালের যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী সরকারি যেকোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত অভিযোগ গঠন করলে তাকে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার বিধান রয়েছে।’

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এএসপি সোহেল উদ্দীন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগকারী নারীকে আমি ভালো বন্ধু বলে জানতাম। কখনোই তাকে বিয়ে করার কথা ছিল না। বিয়ের প্রলোভনে তাকে ধর্ষণ করার অভিযোগ মিথ্যা। তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ২০২০ সালে এক বন্ধুর মাধ্যমে। তিনি বলছেন, আমি নাকি তার সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছি। বরং তার বিরুদ্ধে আমার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে জমি আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছি। আর একজন সাব ইন্সপেক্টরের সঙ্গে (নওশীন মজুমদার) আমাকে জড়িয়ে মিথ্যাচার করা হচ্ছে।’

আর মালিবাগে এএসপি সোহেলের বাসায় অভিযোগকারী নারীকে মারধরের বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে এসআই নওশীন মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোহেলের সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে যাচ্ছেন বিসিএস ক্যাডারের ওই নারী। তার অভিযোগ মিথ্যা।’

এএসপি মো. সোহেল উদ্দীন ৩৬তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি কুড়িগ্রামের রৌমারী সার্কেলে এএসপি পদে কর্মরত আছেন। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের মনতলা গ্রামে। বাবার নাম মো. হাবীব উল্যা পাটোয়ারী। ঢাকার মালিবাগে ২২২/৯ পাবনা কলোনিতে তার ভাড়া বাসা।