কভিড ও পূর্ব ইউরোপীয় সমরের অভিঘাত

কর আহরণের চ্যালেঞ্জ ও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ

করোনা মহামারী ও চলমান ইউরোপীয় সমর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে চলে আসছে। এর মধ্যে বড় চ্যালেঞ্জ, কাক্সিক্ষত হারে রাজস্ব আহরণ না হওয়া। কভিডে অর্থনীতি অনেকটা স্থবির থাকায় স্বাভাবিকভাবে রাজস্ব আহরণ কমে আসছে, কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছানো যাচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসছে যে, মন্দাবস্থায় নিয়মিত রাজস্ব আহরণ কঠিন হচ্ছে। সংগত কারণেই ইদানীং আহরণ হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। লক্ষ্যমাত্রা কম কিংবা বেশি করে ধরা হোক বাস্তবতা হচ্ছে রাজস্ব আহরণ গতিশীল হচ্ছে না। সুতরাং অর্থনীতিকে সচল করা বা হওয়ার ওপরই রাজস্ব আহরণের মাত্রা ঊর্ধ্বগামী হওয়াটা নির্ভরশীল। আইএমএফ তেমন শর্তই দিয়েছে।

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বাংলাদেশ যতগুলো মুখরোচক উদ্যোগ নিয়েছে- তার মধ্যে একটি হলো, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ। বিগত তিন-চার চলতি বাজেটবর্ষে অপ্রদর্শিত অর্থ, বিদেশে পাচার করা অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘দেশের প্রচলিত আইনে যাই থাকুক না কেন, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, বিদেশে অর্জিত (?) আয়, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা যেকোনো সিকিউরিটিজের ওপর অত্যন্ত সীমিত হারে কর প্রদান করে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে আয়কর কর্র্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্র্তৃপক্ষ কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না।’ এই সুযোগের সদ্ব্যবহার খুব একটা লক্ষ করা যায়নি। তথাপি ন্যায়নীতি ও কর ন্যায্যতার মাথা খেয়ে এটি অব্যাহত রয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, এ কারণে তা কতটা যুক্তিযুক্ত সেটি পর্যালোচনার অবকাশ অবশ্যই রয়েছে।

আমাদের সম্পদ কর ব্যবস্থাপনার মধ্যে গলদ আছে। যেমন, জমি বিক্রি হলো ৭০ লাখ টাকা, অথচ রেকর্ড হলো ৬০ লাখ টাকা। বাকি ১০ লাখ টাকার কর কীভাবে হবে। এ রকম কিছু বিষয়ে বিদ্যমান বিধিবিধানে সমস্যা আছে। সেজন্য কারও কারও কাছে অপ্রদর্শিত অর্থ বা প্রদর্শন করেননি এমন অর্থ থাকতে পারে। এটা হতেই পারে। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে চলতি বাজেটে অপ্রদর্শিত টাকা প্রদর্শনের মোড়কে মূলত দুর্নীতিজাত অবৈধ আয়কে বৈধ বিবেচনার একটা বিশেষ ধরনের সুযোগ ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের জন্য করহার করা হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ, যা কোনো দিন করা হয়নি, কোনো দেশে করা হয় না। এ ক্ষেত্রে দুটো বিষয় ঘটছে। এক. রাষ্ট্রের কর রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে। যাদের জন্য এবং যেভাবে এ ছাড় দেওয়া তা ট্যাক্স জাস্টিসের পরিপন্থী। দুই. এর মধ্য দিয়ে নিয়মিত কর দেওয়া সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, প্রকারান্তরে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। কর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং সবাইকে করের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এটি একটি অনৈতিক পন্থা বা পরিবেশ, যা কাম্য নয়। সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না।’ এটা একটা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেখানে যদি দেখা যায় অবৈধ অর্থ উপার্জনে বাধা দেওয়া হচ্ছে না, বড় ধরনের কর ছাড় দিয়ে আরও বলা হচ্ছে কীভাবে অর্থ উপার্জন করেছে তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। এটা সংবিধানপ্রদত্ত রাষ্ট্রের দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অনৈতিক পন্থায় করহার হ্রাস বা ছাড় দেওয়ার সঙ্গে কর অবকাশ বা অব্যাহতি এবং কর রেয়াতের একটা সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। কোনো একটা এলাকা বা শিল্প পিছিয়ে আছে সেটিকে এগিয়ে আনতে কর অবকাশ বা অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর একটা যুক্তি আছে। এতে একটা এলাকা বা উদীয়মান শিল্পের উন্নয়ন হবে। সে ক্ষেত্রে প্রথমে কর ধরলে তার উন্নতি ব্যাহত হতে পারে। সেজন্য সব দেশেই ট্যাক্স হলিডের বিধান আছে। আমাদের দেশে এটাও ছিল বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখনো আছেও। আর কর রেয়াত বা প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে প্রথম কর আদায় করা হয়, পরে শিল্পের বা সেবার স্বার্থে ফেরত দেওয়া হয়। এটাকে কর প্রত্যর্পণ বলা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর ভর্তুকি দেওয়ার নজিরও আছে। রাষ্ট্র যদি মনে করে যে কোনো খাত ভালো কাজ করছে। যেমন কৃষি খাতে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়া হয়। কেন ভর্তুকি দেওয়া হয়? তাদের সমর্থ করে তোলার জন্য। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, একজন লোকের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ অপ্রদর্শিত অর্থ (অপ্রদর্শিত অর্থের আড়ালে দুর্নীতিজাত কালো টাকা) ঘোষিত সুযোগে মাত্র সীমিত শতাংশ হারে কর দিয়ে বৈধ করতে পারছে। অর্থাৎ অন্য ব্যক্তি বা কোম্পানি করদাতা যেখানে ২৫-৩০ শতাংশ কর দিচ্ছে, সেখানে কালো টাকার মালিকরা পাচ্ছেন বিশেষ ছাড়। এটি একটি বড় ধরনের কর প্রণোদনা। আবার বলা হচ্ছে, কালো টাকার উৎস নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না অর্থাৎ দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্র সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বরং ইমিউনিটি দিচ্ছে।

রাষ্ট্রকে কর দেওয়া নাগরিকের দায়িত্ব। যদি করই না দেওয়া হয়, দুর্বল রিপ্রেজেনটেশনে জবাবদিহি চাওয়ার অধিকার তার থাকে না। নিজে কর না দিয়ে সে রাষ্ট্রের কাছে সেবা চাইছে। কর দিলে বাজেট বরাদ্দ পাওয়া তার অধিকার, কর না দিয়ে সে সরকারের কাছে অনুনয়-বিনয় করে, সরকার তার এই দুর্বলতা জানে বলে দয়াদাক্ষিণ্য হিসেবে কিছু সেবা দেয়, তার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করে এবং রাষ্ট্রের টাকা আত্মসাতের সুযোগ পায় বা প্রলুব্ধ হয়। সে কর দেয় না বা ফাঁকি দেয় বা দিতে চায় বলেই কর অফিসের লোকরা তাকে চেপে ধরে, ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে ব্যাপৃত হয়। ফাঁকিবাজ করদাতা তার সঙ্গে আঁতাত করে রাষ্ট্রের কর স্বার্থকে ফাঁকি তো দেয়ই এবং কর বিভাগের অন্যায় হয়রানি বা ভয় প্রদর্শনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না।

এখানে প্রশ্ন হলো কর ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না করলে কর আহরণে উন্নতি আসবে না। কর-জিডিপি অনুপাতে বাংলাদেশ যে তলানিতে, তার কারণটাই হলো এভাবে এ সমাজে কর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মানে কাউকে ট্যাক্স দিতে বাধ্য করা হচ্ছে না বলে, এমনটিই হচ্ছে। অপ্রদর্শিত অর্থ এবং দুর্নীতিজাত অর্থ অর্থনীতির মূলধারায় আনার উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু বিশেষ হ্রাসকৃত হারে কর দিয়ে এবং উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না, যেটি গুরুতরভাবে প্রশ্নসাপেক্ষ। কীভাবে উপার্জিত হলো, কীভাবে এলো, তা নিয়ে প্রশ্ন করা না গেলে তো সম্পদ পুনর্বণ্টনের কাজটি করা কঠিন হবে। অর্থাৎ বৈষম্য উসকে দেওয়া হবে, যদি টাকা কীভাবে উপার্জিত হচ্ছে তা নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা প্রশ্নের মাধ্যমে বাধা না দেওয়া হয়, যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে নিরুৎসাহিত করা হয়।

দেখা যাচ্ছে, ২০১০ সালের পর থেকে সম্পদের একটা বিরাট বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। হু-হু করে জিডিপির সংখ্যাভিত্তিক পরিমাণ বেড়েছে এবং সেভাবে পারক্যাপিটা জিডিপিও বেড়েছে বলে দেখানো হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতায় ‘গরুর হিসাব শুধু কাজীর খাতায়, গোয়ালে তেমন গরু নেই’ পরিস্থিতি। বহু রিপোর্ট অনুযায়ী, এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে খুব দ্রুত ধনীর সংখ্যা বাড়ছে।

রাষ্ট্র যদি মনে করে, কালো টাকা অর্থনীতিতে উপকারে আসুক তাহলে এমন সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। হাওর বা উপকূলীয় বাঁধ বা বড় অবকাঠামো প্রকল্প অর্থের অভাবে মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে, করোনাকালে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ পড়েছে। হাসপাতালে শয্যা কম। বিদ্যমান বরাদ্দ ও সরকারি প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে করা যাচ্ছে না, জনসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান কিংবা শ্রমঘন কুটিরশিল্প উদ্যোগ গ্রহণে প্রযোজ্য কর দিয়ে সাদা করা টাকা বিনিয়োগের আহ্বান জানানো যায়। এসব জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করলে সরকার একটা উৎসাহব্যঞ্জক প্রণোদনা বা কর প্রত্যর্পণ ঘোষণা করবে। এর ফলে উন্নয়নে ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণও বাড়বে, বিনিয়োগের একটা সুযোগও তৈরি হবে। বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় প্রকল্পে যে দুর্নীতি হয় তা যদি প্রণোদনা আকারে দিয়ে দেওয়া হয় তাতেও লাভ। সুতরাং এ ধরনের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা করে কালো টাকাকে অর্থনীতির ধারায় আনতে হবে।

১৯৯৭ সালে ভারত যখন ‘ভলান্টারি ডিসক্লোজার অব ইনকাম স্কিম’ (ভিডিআইএস) জারি করেছিল, তখন কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অব ইন্ডিয়া এর কড়া সমালোচনা করেছিলেন। সাংবিধানিক সংস্থাটি সে সময় বলেছিল, এ সুযোগ সামাজিক সভ্য-ভব্যতার অপব্যবহার। এর ফলে এর আড়ালে অনৈতিকতা, অর্থ লোপাট স্বীকৃতি পাচ্ছে। ২০১৫ সালে ভারত ‘আনডিসক্লোজড ফরেন ইনকাম অ্যান্ড অ্যাসেটস ইমপোজিশন অব ট্যাক্স অ্যাক্ট’ জারি করেছিল। সেই আলোকে বাংলাদেশে ফরেন অ্যাসেটস ডিজক্লোজারের স্কিম জারি করা বরং বেশি প্রয়োজন ছিল। ভারতে ১৯৯৭ সালে ৪ লাখ ৭৫ জন নিজেদের আয়-সম্পদ ঘোষণা করেছিল। আর ২০১৫ সালে করেছিল ৬৩৮ জন। ১৯৯৭ সালে মোট অর্থ ডিসক্লোজ হয়েছিল ৩৩ বিলিয়ন ডলার আর ২০১৫ সালে ডিসক্লোজ হয়েছিল ৪ বিলিয়নের মতো। ১৯৯৭ সালে ভারত সরকার রাজস্ব পেয়েছিল ৯.৮৪ মিলিয়ন ডলার, ২০১৫ সালে পেয়েছিল ২ মিলিয়ন। এখানে কমপ্লায়েন্স পিরিয়ড ছিল কিন্তু তিন মাসের। জাল টাকার বিস্তার বা অন্য কোনো দুষ্কর্ম যেন না ঘটে তার জন্য সময় দিতে হয় অল্প। দুই মাস বা তিন মাস। বছরব্যাপী বা অবারিত থাকে না। ১৯৯৭ সালে ভারতে ভিডিআই এসএ করহার ছিল ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ তখনকার করপোরেট করের চেয়েও বেশি এবং অন্যদের জন্য ৩০ শতাংশ। তার মানে বিদ্যমান করহারের চেয়ে বেশি দিতে হয়েছিল। এটিই হলো পেনাল্টি। এটিই হলো সিস্টেম। এদিকে ২০১৫ সালে ৩০ শতাংশ কর এবং ৩০ শতাংশ পেনাল্টি ধরে দেওয়া হয়েছিল। কারণ এটা না থাকলে সৎ করদাতার সঙ্গে যেমন সাংঘর্ষিক হয়ে যায়, তেমনি এই সুযোগ দেওয়ায় দুষ্কৃতরাও অপকর্মে প্রলুব্ধ হয়। কর আরোপ করা এবং কর মওকুফের এখতিয়ার সংসদের রয়েছে ঠিকই। কর আরোপের ক্ষেত্রে যেমন রাষ্ট্রের স্বার্থ দেখতে হবে, তেমনি কর মওকুফের ক্ষেত্রেও সবার আগে রাষ্ট্রের স্বার্থটা দেখা দরকার।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক