খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংক খাতকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। ঋণখেলাপিদের নানা সুবিধা দিয়েও লাগাম টানা যাচ্ছে না। দেশের ব্যাংকিং খাতে যে পরিমাণ খেলাপি রয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা ও উদ্যোগের পরও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে কমেনি, বরং বছর বছর তা আরও বাড়ছে। এসব ব্যাংকের যে খেলাপি তার প্রায় সবই আদায় অযোগ্য। গত পাঁচ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে আদায় অযোগ্য বা মন্দমানের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রের অধীনে থাকা ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৫১ শতাংশেরও বেশি। এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর যে খেলাপি ঋণ রয়েছে, তার প্রায় সবই আদায় অযোগ্য বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে যে খেলাপি রয়েছে তার ৯৪ শতাংশই মন্দমানের আদায় অযোগ্য, যার পরিমাণ হচ্ছে ৫৩ হাজার ২১১ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যে হারে মন্দ ঋণ বাড়ছে, এটা অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের সংকটে পড়বে দেশের ব্যাংক খাত। তাই সুশাসন ফেরাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে আইনের সংস্কার করারও পরামর্শ তাদের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭ সালে দেশের ব্যাংক খাতে যে খেলাপি ঋণ ছিল, তার মধ্যে আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণ ছিল ৩৩ হাজার ৮২১ কোটি টাকা, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ২১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৫ বছরে দেশের ব্যাংক খাতে মন্দ ঋণ বেড়েছে ৫৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। বিপুল পরিমাণের এই আদায় অযোগ্য ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোকে শতভাগ সঞ্চিতি রাখতে হচ্ছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাচ্ছে। তবে মুনাফা কম থাকায় বেশিরভাগ ব্যাংক প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে পারছে না। ৫ বছর আগে এই ৬ ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি ছিল ৮ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। বর্তমানে তা কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৮২৮ কোটি টাকায়।
আলোচিত সময়ে মন্দ ঋণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের পর ব্যাংকটির মন্দ ঋণ বেড়েছে ২০৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির মন্দ ঋণ ছিল ৪ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। এ বিষয়ে জানতে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুরশেদুল করিমকে একাধিকবার ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি।
অগ্রণী ব্যাংকের মতো একই পথে হেঁটেছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকও। ৫ বছর আগে ব্যাংকটির মন্দ ঋণ ছিল ৪ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত ৫ বছরে ব্যাংকটির মন্দ ঋণ বাড়ার হার ১৭৪ শতাংশ। এ বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুছ ছালাম আজাদেরও। একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি জবাব দেননি।
মন্দ ঋণ বেড়ে যাওয়ার সূচকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে তৃতীয় অবস্থান রূপালী ব্যাংকের। গত পাঁচ বছরে ব্যাংকটির মন্দ ঋণ বেড়েছে ৫২ শতাংশ। ৫ বছর আগে ব্যাংকটির মন্দ ঋণ ছিল ৪ হাজার ৮১ কোটি টাকা। বর্তমানে তা ৬ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপি সূচকে চারে অবস্থান করছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল)। ৫ বছরে ব্যাংকটির মন্দ ঋণ বেড়েছে ২৩ দশমিক ৪২ শতাংশ। পাঁচে থাকা বেসিক ব্যাংকের মন্দ ঋণ বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ।
তবে এই সূচকে একমাত্র ব্যতিক্রম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী ব্যাংক। গত পাঁচ বছরে ব্যাংকটির মন্দ ঋণ বাড়েনি। উল্টো ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে। ২০১৭ সালে সোনালী ব্যাংকের মন্দ ঋণ ছিল ১২ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, খেলাপি ঋণ অথবা মন্দ ঋণ কমাতে বাংলাদেশে যেসব আইন আছে সেগুলোরও প্রয়োগ হচ্ছে না। এখন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি আইনের সংস্কারও করা হয়, তবুও এই মন্দ ঋণ উত্তোলন করা সম্ভব হবে না। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া কোনোভাবেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর উন্নতি সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে আমরা ব্যাংক হিসেবে গড়ে তুলব। কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করা যাবে না। ব্যাংকগুলোকে প্রতিযোগিতা করতে দিতে হবে। তাহলে যারা ভালো করছে তারা বড় ব্যাংক হিসেবে রূপান্তরিত হবে। আর যারা খারাপ করছে তাদের অবস্থান খারাপ থাকবে।