‘পদে’র উন্নতি যতদূর

বিষয়টা কিছু মানুষের মজ্জাগত। ভয়াবহ আত্মকেন্দ্রিক এসব মানুষ, অন্যের কথা ভাবেন না। মনে করেন, নিজের উন্নতি মানেই দেশের উন্নতি। তাদের পদযুগল সামনে হাঁটে না। কিন্তু চিন্তার পদে হয়, উল্লম্ফন। যে কারণে, সেই মানুষ হরিণের মতো পাতার ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে বসে থাকেন। ভাবেন, কেউ তাকে দেখে না। অথচ চোখ অন্ধকারে রেখে, উদোম শরীর যে বাইরে রেখেছেন সেই খেয়াল নেই। শুধু তা-ই না। মনে করেন, তার অপকীর্তির কথা কেউ জানবে না। এদিকে, বিষয়টা যে শৃঙ্খলা, আইন ও নীতিবিরুদ্ধ সেটিও ভুলে যান। সাধারণ মানুষ যখন অর্বাচীনের মতো কাজ করে, মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু একজন শিক্ষক যখন নীতিবিরুদ্ধ কাজে নিজেকে সচেতনভাবে সম্পৃক্ত করেন, তখন বিস্মিত হতে হয়। না হলে কি আর আইননীতির তোয়াক্কা না করে নিজের উন্নতিতে নিজে সম্পৃক্ত হন?

রবিবার দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতায় প্রকাশিত ‘নিজেরাই পদোন্নতি দিচ্ছেন নিজেদের’ শিরোনামের সংবাদের মাধ্যমে জানা যায়, শিক্ষক নিয়োগ-সংক্রান্ত বিধি ভেঙে দুই শিক্ষক নেতাকে সহযোগী অধ্যাপক (গ্রেড-৪) বানাতে নানা আয়োজন করছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) কর্র্তৃপক্ষ। শিক্ষকরা হলেন লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের প্রচার, প্রকাশনা ও দপ্তর সম্পাদক সাব্বীর আহমেদ চৌধুরী এবং একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বেরোবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মন্ডল আসাদ। তারা দুজনই আবার নিয়োগ-সংক্রান্ত প্ল্যানিং কমিটির সদস্য। তারা নিজেরাই নিজেদের যোগ্য ঘোষণা করেছেন।

গতকাল রাতে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হাসিবুর রশীদ কথা বলতে রাজি হননি। জনসংযোগ উপপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিধি ভেঙে প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য ডাকা হয়েছে কি না, আমার জানা নেই। প্ল্যানিং কমিটির সদস্যরা ভালো বলতে পারবেন।’ সংবাদে আরও জানা যায়, জানা গেছে, লোকপ্রশাসন বিভাগের দুটি সহযোগী অধ্যাপকের শূন্যপদে চারজন প্রার্থী আবেদন করেছেন। তাদের তিনজন একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তারা হলেন লোকপ্রশাসন বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. জুবায়ের ইবনে তাহের, মো. আসাদুজ্জামান মন্ডল আসাদ এবং সাব্বীর আহমেদ চৌধুরী। বেরোবির শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী তাদের কেউই সহযোগী অধ্যাপকের শূন্যপদে আবেদনের যোগ্য নন। তবে অভ্যন্তরীণ শিক্ষক পদ আপগ্রেডেশন নীতিমালা অনুযায়ী শুধু জুবায়ের ইবনে তাহের সহযোগী অধ্যাপক পদে আবেদন করার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।

আসাদুজ্জামান মন্ডল আসাদের সর্বসাকল্যে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা আট বছর এক মাস ৯ দিন এবং সাব্বীর আহমেদ চৌধুরীর চাকরিকাল আট বছর এক মাস আট দিন। তাদের কারোরই পিএইচডি বা এমফিল ডিগ্রি না থাকায় বর্তমান অভিজ্ঞতায় তারা সহযোগী অধ্যাপক পদে আবেদনের যোগ্য হননি। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শূন্যপদে আবেদন করা অপর প্রার্থী ড. মো. রুহুল আমিন। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তার সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ১২ বছরের বেশি। ২০টি গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে তার। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখা থেকে জানা গেছে, প্রার্থীদের মধ্যে যে তিনজন বেরোবির তারা প্ল্যানিং কমিটিরও সদস্য। তারা আবেদনকারী চার প্রার্থীকেই সহযোগী অধ্যাপকের শূন্যপদে যোগ্য মনোনীত করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, শর্ত শিথিল করে সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগের ব্যাপারটি জানেন ভিসি অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশীদ।

প্রকাশিত সংবাদে আরও বলা হয়েছে যোগ্যতা অর্জনের আগেই বিধি ভেঙে দুজন জুনিয়র শিক্ষককে সহযোগী অধ্যাপক করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক তাদের জ্যেষ্ঠতা হারাবেন। অ্যাকাডেমিক ডিগ্রি শিথিল করে শিক্ষক নিয়োগের নজির বাংলাদেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এমন ঘটনা আগেও হয়েছে। সেই অসততা, দুর্নীতি ও চৌর্যবৃত্তির সঠিক বিচার হলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতো না। পদোন্নতির বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ নেই। যোগ্য মানুষ যোগ্যতম স্থানে যাবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক বিষয় হয় তখনই, যখন যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে জুনিয়র হয়ে যান সিনিয়র। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দরকার।