সাত মাসে কৃষিতে ১৮৬৮৪ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ

করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। অর্থনীতির এই মন্দার সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। সরবরাহ সংকটের কারণে খাদ্যপণ্যের দাম গত এক বছর ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও যাতে খাদ্য সংকট তৈরি না হয় সে জন্য দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এ জন্য কৃষি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে একাধিক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আর ব্যাংকগুলোর বার্ষিক কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের ৭ মাস শেষ হয়ে গেলেও বেশকিছু ব্যাংকের ঋণ বিতরণে অনীহা দেখা গেছে। যদিও এ সময়েই ব্যাংকগুলো চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার ৬০ শতাংশের বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ হয়েছে ১৮ হাজার ৬৮৪ কোটি ৩২ লাখ কোটি টাকা, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৬০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আগের বছর এই সময়ে বিতরণ করা হয়েছিল ১৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। এটি ওই সময়ের লক্ষ্যমাত্রার ৬০ শতাংশ ছিল। সে হিসেবে গত বছরের মতো একই ধারায় ঋণ বিতরণ করছে ব্যাংকগুলো। যদিও খাদ্য সংকট কাটাতে এ বছর ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর ১ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। করোনা মহামারী ও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কৃষির গুরুত্ব ব্যাপকহারে পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের মাধ্যমে সহায়তা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সচেষ্ট রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো যাতে ঠিকমতো ঋণ বিতরণ করে সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তদারকি করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকেও সচেতন হতে হবে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে কৃষিতে যে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার প্রায় অর্ধেক দেওয়া হয়েছে ফসল উৎপাদনে। এ ছাড়া পোল্ট্রি ও গবাদিপশু, মাছ উৎপাদন ছাড়াও কৃষিযন্ত্র কেনায়ও ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে দারিদ্র হ্রাস কর্মসূচিতে ১ হাজার ১০৩ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। তখন ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি বিতরণ করেছিলÑযা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১০২ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ হাজার ৯১১ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। যার মধ্যে অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই লক্ষ্যমাত্রার ৬০ দশমিক ৪৫ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। চলতি অর্থবছরের কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত আট ব্যাংকের কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১১ হাজার ৭৫৮ কেটি টাকা। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর লক্ষ্যমাত্রা ১৮ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। আট বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কৃষিঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৭৭১ কোটি টাকা।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ৭ (জুলাই-জানুয়ারি) মাসে আট রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক বিতরণ করেছে ৭ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা বা লক্ষ্যমাত্রার ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ১১ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৫৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।

আলোচিত সময়ে এ খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। গত ৭ মাসে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির লক্ষ্যমাত্রার ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল জাব্বার দেশ রূপান্তরকে জানান, কৃষি ব্যাংক আরও অনেক বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ৬৫ বা ৬৬ শতাংশ ঋণ বিতরণের তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।

বিশেষায়িত ব্যাংক রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক আলোচিত সময়ে বিতরণ করেছে ১ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার ৭৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। কৃষিঋণ বিতরণে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইসলামী ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা। গত ৭ মাসে ব্যাংকটি লক্ষ্যমাত্রার ৫৭ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে।

বর্তমানে কৃষি খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৫১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিতরণকৃত ঋণের ৭ দশমিক ৬২ শতাংশই খেলাপি। চলতি অর্থবছরে কৃষিঋণ আদায় হয়েছে ১৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। এটি মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ। আর অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ২৭ হাজার ২১২ কোটি টাকা।