সম্প্রতি প্রযুক্তিবিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে, বিশেষ করে চ্যাটজিপিটি’র ব্যবহার শুরু হলে এ নিয়ে যেন আলোচনা থামছেই না। যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের অংশ বেশ কিছুদিন ধরেই। গুগল, অ্যাপেল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, টেসলা ও আলিবাবা’র মতো বড় বড় কোম্পানিগুলো বেশ কিছুকাল ধরেই জোরেশোরেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করছে। চ্যাটজিপিটি যেমন একটি সার্চইঞ্জিন বট যে কিনা শুধু তথ্য খুঁজতেই দক্ষ না কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আলোকে তথ্যের প্যাটার্ন তৈরি করতেও পারে, এটাই এখন অসীম বিস্ময় সৃষ্টি করছে এবং সংবাদ মাধ্যমে একের পর এক খবরের জোগান দিচ্ছে। একইভাবে আমরা অন্য বট প্রোগ্রামের কথা জানি বিশেষ করে করোনার সময় বিভিন্ন সেবা গ্রহণে বট ব্যবস্থার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত হই। আবার গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট যে কি না আমাদের সঙ্গে ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে এবং চাহিদার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজির করে। আবার আমাদের মধ্যে কে কে গুগল অনুবাদের ব্যবহার করেছি, এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা কেমন?
কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কাজ চালানো যায় কিন্তু একটু জটিল বাক্য অনুবাদ করতে গেলে অনেক সময় হাস্যরসের সৃষ্টি করে। তবে চ্যাটজিপিটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নাকি অনেক বেশি গোছানো, গল্প-কবিতা লিখছে, পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নিবন্ধ রচনা করতে পারছে। তার মানে বোঝাই যায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে কতটা উন্নতি করছে।
ভার্চুয়াল জগৎ এখন মানব সংস্কৃতির অংশ যদিও আমাদের ডিজিটাল সংস্কৃতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় সাধারণভাবে সরকারি দু’একটা ফর্ম ডাউনলোড করা, অডিও ও ভিডিও কল করা, ফেসবুকের ব্যবহার, প্রকাশনা, ওয়েবসাইট তৈরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসা ও বাণিজ্যের প্রচার ও প্রসারের জন্য ফেসবুক-সহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার ও ই-কমার্সের কিছুটা হলেও প্রচলন শুরু হয়েছে। এই সীমিত চর্চার মধ্যেও আবার নেতিবাচক চর্চার দৃষ্টান্ত যথেষ্ট। যার মধ্যে আছে অনলাইন গুজব ছড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি ও ছড়িয়ে দেওয়া, অন্যকে হেনস্তা করা ও ট্রল এবং পর্নগ্রাফি ইত্যাদি।
কিন্তু পৃথিবীর অর্থনৈতিক কাঠামো যেদিকে যাচ্ছে তাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারই জয়জয়কার এবং চলছে বাজার ধরার প্রতিযোগিতা। পৃথিবীতে ডিজিটাল প্রযুক্তি অতিদ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে আর এই পরিবর্তন হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে। বলা হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত স্বচালিত গাড়ির বাজার হবে ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং স্বচালিত ড্রোনের বাজার হবে ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদিও আমাদের দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক আছে।
অনেকেই মনে করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মনে হয় মানুষের বিকল্প হতে যাচ্ছে কিন্তু আদতে মোটেও তা নয়। বরঞ্চ এটি মেশিন লার্নিং, তথ্য বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা এবং ভাষার ব্যবহারের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় এটি মানুষের আচরণ অনুকরণ করতে পারে এবং মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য ও বারবার করতে হয় এমন কাজে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠে। তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারে ও কোনো ধরনের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা ছড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও সেবা দিয়ে থাকে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চিন্তাভাবনার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত ভাবনাকে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা বা যান্ত্রিক উপায়ে প্রকাশ করে থাকে এবং এভাবেই এটি নতুন সংস্কৃতির সৃষ্টি করছে।
আজ থেকে বিশ কিংবা ত্রিশ বছর আগে আমাদের সংস্কৃতির প্রায় পুরোটাই ছিল সামাজিক জগৎ সম্পর্কিত। কিন্তু গত ত্রিশ বছরে আমাদের সংস্কৃতির জগতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। মানুষের সংস্কৃতি এখন শুধু সামাজিক পরিমণ্ডলকেন্দ্রিক না, ধীরে ধীরে তা ভার্চুয়াল পরিমণ্ডলে ব্যাপকভাবে ঠাঁই করে নিয়েছে।
এই ভার্চুয়াল মাধ্যমকে কেন্দ্র করেই জীবনযাপন, যোগাযোগ, বাজার সদয়, লেনদেন, বিনোদন ইত্যাদি সবই চলছে। এই ভার্চুয়াল জগতেই আস্তে আস্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আনাগোনা গভীর হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মানুষের অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ করছে, শুধু তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে না। মেশিন লার্নিং ও রোবটিক্স প্রযুক্তির সহযোগে মানুষের জীবনযাপনের অভিজ্ঞতাকে পাল্টে দিচ্ছে। আর এসবই মানব ইতিহাসে এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে এবং মানুষে সেখানেই ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সেখানে ভার্চুয়াল জগৎও মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে ওঠে, ভার্চুয়াল অপরাধীদের দাপটে। না ভার্চুয়াল অপরাধের সঙ্গে শুধু মানুষই নয় এখানেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও ব্যবহার করা হয়।
কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা, আড়িপাতা, ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া সবই হচ্ছে এই জগৎকে ঘিরে। ইতিমধ্যে আমরা সামাজিক মাধ্যমের অলগারিদম সম্পর্কে জানি কীভাবে ঝড়ের বেগে বিভিন্ন সংঘাত ও সহিংসতা সম্পর্কিত কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ে। আবার এদের প্রতিরোধ করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত বিভিন্ন ফিল্টারও তৈরি করা হয় যা দ্রুতই সহিংসতামূলক বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট আটকে দিতে পারে। এখানেও চোর-পুলিশের খেলা, আমাদের দৃশ্যমান জগতের বাইরে এই অদৃশ্যমান জগতের বহর যে কত বড় তা অনেক সময় আমাদের চিন্তারও বাইরে।
ডিজিটাল সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানুষের কর্মসংস্থানের ধরনের ক্ষেত্রে একটি বিরাট পরিবর্তন আসবে। বারেবারে করতে হয় এমন কাজগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়বে। ফলে প্রচলিত এমন অনেক পেশা অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে। ভার্চুয়াল মার্কেটে এখন আর কোনো সেলস পার্সন-এর কোনো প্রয়োজন নেই, বরং সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত কোনো একটি বট কাজ করছে যে প্রতিনিয়ত ক্রেতার আলাদা আলাদা পছন্দ ও অপছন্দকে অনুসরণ করে এবং প্রত্যেককে কাস্টমাইজ সার্ভিস দিচ্ছে। একইভাবে দেখা যাচ্ছে কলকারখানায় অনেক শ্রমিকের কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত মাত্র একটি রোবট।
আমরা এখন বিশ্বায়নের যুগে বসবাস করছি, এই যুগে প্রযুক্তি যেভাবে সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করছে তা নিয়ে কোনো ভবিষ্যদ্বাণীই যেন কাজে লাগছে না। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েভ এখন শুধু তরঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এর সঙ্গে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় ঘটেছে, আর ভবিষ্যতে আর কী কী অপেক্ষা করছে তা বলা দুরূহ। বিশ্বায়নের কালে বিশ্বে ক্ষমতার কেন্দ্রিকতা নির্ভর করে বিশ্বপ্রযুক্তির ওপর কার কতটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে তার ওপর।
এই অবস্থায় বিশ্বে আমাদের অবস্থান তৈরি নির্ভর করে নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং এ সম্পর্কিত ইকোসিস্টেমে আমরা কতটুকু অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারছি তার ওপর। অধিকন্তু শুধু অভ্যস্ত হলেই হবে না এর পাশাপাশি এই প্রযুক্তির ওপর কতটুকু নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও অন্যের নির্ভরশীলতা তৈরি করতে পেরেছি তার ওপর। ডিজিটাল বাংলাদেশের পর দেশকে এখন আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে তৈরি করতে চাই, আর এই স্মার্ট দেশ তৈরিতে স্মার্ট সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com