শিশু-কিশোরদের স্থূলতা বেড়েছে তিনগুণের বেশি

দেশে মোট প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ১৮-২৪ শতাংশ দৈহিক স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজনে ভুগছে। তবে সংখ্যার চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হলো, দেশে নতুন করে মানুষের মধ্যে দৈহিক স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন বাড়ছে। বিশেষ করে গত ২০ বছরে অপ্রাপ্ত বয়স্ক অর্থাৎ শিশু-কিশোরদের মধ্যে দৈহিক স্থূলতা বেড়েছে তিনগুণের বেশি। আগে যেখানে ৪-৫ শতাংশ শিশু-কিশোরের দৈহিক স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন ছিল, এখন সেটা বেড়ে ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ এ সময়ে দৈহিক স্থূলকায় শিশুদের সংখ্যা তিনগুণ বেড়ে গেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ ও শিশু বিভাগ এসব তথ্য জানিয়েছে। এ দুই বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এ দুই শ্রেণির মানুষের মধ্যে দৈহিক স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজনের সংখ্যা দেশের সামগ্রিক বিবেচনায় বেশি। কোনো কোনো দেশে ৫০-৫৫ শতাংশ পর্যন্ত দৈহিক স্থূলতার মানুষ আছে। সেখানে বহু বছর ধরে একই হার রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষের দৈহিক স্থূলতা অনেক কম ছিল। সে তুলনায় ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে।

তারা বলেন, দৈহিক স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজনের শিকার মানুষ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচারের পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণই এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

এমন অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব দৈহিক স্থূলতা দিবস। দিবসটি উপলক্ষে ওয়ার্ল্ড ওবিসিটি ফেডারেশন গতকাল শুক্রবার এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে সামনের এক যুগে বিশ্বের অর্ধেক মানুষ মুটিয়ে যাওয়ার সমস্যায় পড়বে; অর্থাৎ তাদের ওজন হবে উচ্চতা অনুযায়ী স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি। ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ৪০০ কোটি মানুষ অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগবে। সবচেয়ে দ্রুত এ সমস্যা বৃদ্ধি পাবে শিশুদের মধ্যে।

শহরে বেশি, গ্রামে কম : বিএসএমএমইউয়ের শিশু বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বিভাগে ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে আসা ১ হাজার ৪৪ জন শিশু-কিশোরের মধ্যে দৈহিক স্থূলতার শিকার ৪০ শতাংশ। এদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ছিল ২৭ দশমিক ৫৯ শতাংশের, দৈহিক স্থূলতা ছিল ৫৯ দশমিক ০৬ শতাংশের, গুরুতর স্থূলতা ছিল ১২ দশমিক ৭২ শতাংশের ও রোগাক্রান্ত স্থূলতা ছিল শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ শিশু-কিশোরের।

বিএসএমএমইউ ২০১৪ সালের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বলেছে, তখন ৬-১৫ বছর বয়সী স্কুলগামী শিশু-কিশোরদের মধ্যে দৈহিক স্থূলতার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশের ও অতিরিক্ত ওজন ছিল ৯ দশমিক ৫ শতাংশের। গ্রামে এই হার মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ ও শহরে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ছেলে শিশুরা বেশি স্থূলতায় ভুগছে অর্থাৎ ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। মেয়ে শিশুদের মধ্যে এ হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ ব্যাপারে বিএসএমএমইউর শিশু বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সুরাইয়া বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণত দেখা যায় মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ শিশু-কিশোরের অতিরিক্ত ওজন। কিন্তু মা অথবা বাবার যদি ওজন বেশি থাকে, সে ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ শিশু-কিশোরের ওজন বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর যদি দুজনেরই ওজন বেশি থাকে, তাহলে ৭০ শতাংশ শিশু-কিশোরের ওজন বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

‘কেন দৈহিক স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন’ এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএসএমএমইউর এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষ যে পরিমাণ ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করে, সারা দিনে যে পরিমাণ ক্যালরি খরচ করে, তাতে দেখা যায় দিন শেষে বেশ পরিমাণ ক্যালরি অব্যবহৃত হিসেবে থেকে যায়। বাংলাদেশের মানুষের যে সামগ্রিক জীবনযাপন পদ্ধতি, তাতে তার বয়সের সাপেক্ষে যে পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম করার কথা, তার চেয়ে কম করেন। এর মধ্যে যার যেটুকু খাওয়া দরকার, সে সেটুকু খায়, আবার কেউ কেউ বেশি খায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন যেকোনো বিল দিতে মোবাইল বা ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করছি। সামাজিক কাঠামোগুলো আস্তে আস্তে কমছে। প্রতিদিন স্কুল-কলেজে আবশ্যিক হওয়ার কথা ছিল খেলার মাঠ। ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করবে। কিন্তু খেলার মাঠ কমছে। তাই আমরা এখন বলছি, খেলার মাঠ থাকুক বা না থাকুক, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপরের ক্লাসে যেতে নির্দিষ্ট পরিমাণ শারীরিক শ্রম বাধ্যতামূলক করতে হবে।’

এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে দৈহিক স্থূলতা অন্য দেশের তুলনায় কম হওয়ার কারণ হলো এখানে চর্বিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার প্রবণতা বহু দেশের তুলনায় কম। তারা আমাদের চেয়ে প্রোটিন ও চর্বি বেশি খায়। কিন্তু আমাদের খাদ্যাভ্যাস একদিক থেকে ওদের চেয়ে মারাত্মক। সেটা হলো আমরা প্রোটিন মারাত্মক কম খাই। চর্বি মোটামুটি খাই। কিন্তু কার্বোহাইড্রেট খুব বেশি খাই। গত বছরের এক গবেষণায় আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে মানুষ প্রতিদিনের খাবার থেকে যে ক্যালরি পায় তার ৮০-৯০ শতাংশ আসে শর্করা থেকে। অথচ একজন সুস্থ মানুষের শরীরে শর্করা থেকে ৪০-৫০ শতাংশ ক্যালরি আসার কথা। এ শর্করা খাওয়ার পর যখন হজম হয়, শরীরে যদি সে পরিমাণ ব্যবহার না করা হয়, তাহলে চর্বি হয়ে জমা হয়।’

কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে জানতে চাইলে ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, ‘দৈহিক স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজনের কারণে এসব মানুষ দ্রুত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবে। উচ্চ রক্তচাপ, ব্যথা বেড়ে যাবে। যাদের ওজন অনেক বেশি, তাদের ব্যথাও অনেক বেশি। হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট। নাক ডাকা। হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গেও হার্ট অ্যাটাক সম্পৃক্ত। অতিরিক্ত ওজনের মানুষ বেশি কাজ করতে পারবে না। কর্মক্ষমতা হারাবে। পুরুষ ও নারী দুজনের ক্ষেতেই প্রজনন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের মানুষ বেশিদিন বাঁচবে না। তাদের আয়ু কমে যাবে।’

চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, এ ধরনের মানুষ এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের চিকিৎসকদের কাছে যাবে। এন্ডোক্রাইনোলজি বা হরমোন বিভাগের চিকিৎসকের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি টিম থাকতে হবে। টিমে অবশ্যই পুষ্টিবিদ থাকবেন। এসব মানুষকে স্বাস্থ্যশিক্ষা দিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে পুষ্টিবিদের সংখ্যা কম। বিএসএমএমইউতে মাত্র দুজন পুষ্টিবিদ আছেন। এখানে থাকার কথা কমপক্ষে ১০০ জন। বারডেমে ১৮ জন পুষ্টিবিদ আছেন। সারা দেশে এখন সরকারি ও বেসরকারি মিলে এন্ডোক্রাইনোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ৩০৮ জন।

কী ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. সুরাইয়া বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণ স্থূলতার কারণ আমাদের অস্বাভাবিক জীবনযাপন, খাদ্যগ্রহণে সমস্যা রয়েছে। জাঙ্কফুড বেশি খাচ্ছি। শারীরিক কর্মকান্ড কম। মোবাইল ও টিভি বেশি দেখছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় মা-বাবার যদি ওজন বেশি থাকে, সে ক্ষেত্রে শিশুর ওজন বেশি হয়। সুতরাং এ ধরনের স্থূলতা আমরা নিজেরাই তৈরি করি।’

এ ব্যাপারে ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, ‘বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট ওজন থাকা দরকার। গড়ে কারও যদি উচ্চতা ১৩৪ সেন্টিমিটার হয় তাহলে তার দৈহিক ওজন ৭০ কেজির কম হবে। এটা গড় হিসাব। যদি নারী হয় তাহলে তার ওজন আরও ৫ কেজি কম হবে। এটা থেকে যত বেশি ওজন হবে, তত বেশি উদ্যোগ নিতে হবে ওজন কমানোর।’