শষ্যভান্ডারখ্যাত দিনাজপুরের হিলিতে এখন চলছে বোরো ধানের চারা রোপণের ভরা মৌসুম। কিন্তু ঠিক তখনই সেচের অভাবে বীজতলা থেকে চারা তুলেও জমিতে রোপণ করতে পারছেন না হিলির সাদুড়িয়া গ্রামের অন্তত ৪০ জন কৃষক। ইতিমধ্যেই পানির অভাবে ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়ায় চিন্তার ভাঁজ এসব কৃষকের কপালে। আর কয়েক দিন পেরিয়ে গেলে সম্ভব হবে না বোরো ধানের চারা রোপণ। তাই দ্রুতই পানির সমস্যা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তাদের। গেল রবিশস্যের মৌসুমেও পানি না মেলায় মাঠেই শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে তাদের লাখ লাখ টাকার আলু, গম, সরিষাসহ অন্যান্য আবাদ।
সেচ পাম্পে বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় পানির অভাবে দেড়শ বিঘা জমিতে বোরো ধান রোপণ করতে পারছে না ভুক্তভোগী এ কৃষকরা। তারা বলছেন, পল্লী বিদ্যুতের অফিসে শত ধরনা দিয়েও সেচ পাম্পে মিলছে না বিদ্যুৎ সংযোগ। তাই মাঠ প্রস্তুত করেও পানির অভাবে রোপণ করতে পারছেন না বোরো ধানের চারা। সময় পেরিয়ে যাওয়ায় জমিতে বোরো ধান আর রোপণ করতে পারবেন কি না সেই দুশ্চিন্তা আর হতাশায় দিন কাটছে এসব কৃষকের। অতি দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে বাধ্য হয়ে আন্দোলনে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।
তাদের একজন কৃষক আবদুর রাজ্জাক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ মাঠে আমার তিন একর জমি পড়ে রয়েছে, শুধু পানির অভাবে ধান রোপণ করতে পারছি না। লাইন লাগাচ্ছে, আজ পানি দেবে, কাল দেবে, এভাবে করতে করতে সব শেষ। পানির অভাবে আলু ও ধানের বীজ সব মরে শেষ হয়ে গেছে। আজ হবে, কাল হবে করতে করতে দিন তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোনো ফলাফল তো পাওয়া যাচ্ছে না।’
ভুক্তভোগী আরেক কৃষক আবদুস সালাম বলেন, ‘যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, এক ইঞ্চি জমিও যেন পড়ে না থাকে আর এখানে আমাদের শত শত বিঘা জমি পড়ে রয়েছে। আমরা বিদ্যুতের সংযোগ পাচ্ছি না, যার কারণে জমিতে পানি পাচ্ছি না।’
দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ না পেলে বাধ্য হয়ে আন্দোলনে যাবেন বলেন জানান কৃষক সেলিম হোসেন। তিনি বলেন, ‘সব দপ্তরে ঘুরেছি যে এখানে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হোক, কিন্তু কেউ আমাদের এ দুঃখটা বুঝছে না। কী যে হয়েছে! এখানে অনেক দপ্তরের লোকজন আসছে, দেখে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ কোনো সাড়া দিচ্ছে না। যদি দুয়েক দিনের মধ্যে বিদ্যুতের সংযোগ দেয় তাহলেও আমরা জমিগুলোতে ধান লাগাতে পারব। কিন্তু অতি দ্রুত যদি এ সেচ পাম্পে বিদ্যুৎ সংযোগ না দেওয়া হয় তাহলে বাধ্য হয়ে আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না আমাদের।’
সেচ পাম্পটির মালিক বলাই চন্দ্র বলেন, ‘গ্রামের শত শত বিঘা জমিতে ফসল ফলানোর জন্য এ সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের অভাবে আজকে আমাদের বেহাল অবস্থা। বিদ্যুতের লোকজনের টালবাহানার কারণে দীর্ঘদিন থেকে সেচ পাম্পে বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছি না। পল্লী বিদ্যুতে গিয়ে দিনের পর দিন ধরনা দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। আজ যাব, কাল যাব এসব বলে তারা কালক্ষেপণ করছে। তাদের কথামতো সব করছি, কিন্তু তারপরও কেন জানি সংযোগ দিচ্ছে না। এতবার হাত-পা ধরছি যে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, অন্তত সংযোগটা দ্রুত দেন। এখন তারা বলছে, তাদের কাজ সম্পূর্ণ করে সদর দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছে, সেখানে যোগাযোগ করতে বলছে। তাহলে আমরা কৃষকরা এখন কোথায় যাব? কার কাছে যাব? আর কার কাছে বিচার চাইব?’
কৃষককের এ সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. মমতাজ সুলতানা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুতের সংযোগের অভাবে সাদুড়িয়া গ্রামের কৃষকদের সেচকাজ ব্যাহত হয়েছে। ইতিমধ্যেই আমি জায়গাটি পরিদর্শন করে বিষয়টি পল্লী বিদ্যুতের এজিএমসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়েছি। কীভাবে এটি সমাধান করা যায় ও অতি দ্রুত সেচকাজ শুরু করে জমিগুলোকে যেন বোরো ধান চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসতে পারি সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’
কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দিনাজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ হিলি সাবজোনাল অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) বিশ্বজিৎ সরকার বলেন, ‘বলাইচন্দ্র নামে এক ব্যক্তির সেচ পাম্পের সংযোগের জন্য আবেদন পেয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে সেটি স্টেকিংভুক্ত করে আবেদনটি সদর দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ৩ পোলের অধিক ৭ পোলের মতো লাইন হওয়ায় সেটি আবারও অনুমোদনের জন্য সদর দপ্তর থেকে ঢাকায় হেড অফিসে পাঠানো হয়েছে। তাদের আদেশসহ মালামাল প্রাপ্তি সাপেক্ষে সংযোগটি প্রদান করা হবে।’