গত জানুয়ারিতে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই জানিয়েছিল মোট আটটি খাত থেকে দেশের প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপন্ন হয় পণ্যের প্যাকেজিং প্রক্রিয়ায়। এ খাত থেকে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ মোট উৎপাতি প্লাস্টিক বর্জ্যরে ৭৩ শতাংশ। বাংলাদেশে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাথাপিছু ৭ দশমিক ৯ কিলোগ্রাম বা প্রতিদিন মাথাপিছু ২২ গ্রাম প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান পণ্য উৎপাদন করে প্লাস্টিকের বস্তায় মোড়কজাত করে, তাদের না ধরে ছোট ব্যবসায়ী বা বিক্রেতাদের ধরে জরিমানায় ব্যস্ত পাট অধিদপ্তর। পাটের বস্তা ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও নিয়ম-কানুনের ধারে কাছেও নেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাজারে (কৃষি মার্কেট) চটের বস্তার পরিবর্তে প্লাস্টিকের বস্তায় চাল বিক্রি করায় দুই প্রতিষ্ঠানকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পাট অধিপ্তর। জরিমানা করা প্রতিষ্ঠান দুটি হলো মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের থ্রি স্টার রাইস এজেন্সি এবং ফরিদপুর রাইস এজেন্সি। এর মধ্যে প্রথম প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব ড. সেলিনা আক্তারের নেতৃত্বে ‘পণ্যে পাটজাত মোরকের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০’ অনুযায়ী ১৯টি পণ্যে পাটের বস্তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানকালে এ পণ্যগুলোতে পাটের বস্তার জোগান ও দেশব্যাপী অগ্রগতি পরিদর্শনকালে এই জরিমানা করা হয়েছে।
একইসঙ্গে কৃষি মার্কেটের সব পাইকারি চাল ব্যবসায়ীকে আগামী এক মাসের মধ্যে বিভিন্ন দোকানে থাকা বিদ্যামান প্লাস্টিকের বস্তায় থাকা চাল বিক্রি করার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পর কোনো ব্যবসায়ী প্লাস্টিকের বস্তায় চাল বিক্রি করলে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
ড. সেলিনা আক্তারের নেতৃত্বে দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। এরা হলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইশতিয়াক আহমেদ, সালেহা নূর। এ ছাড়াও পরিদর্শক দলে ছিলেন, উপ-পরিচালক এসএম সোহরার হোসেন, সমন্বয় কর্মকর্তা মো. সওজাতুল আলম, মুখ্য পরিদর্শক মাহবুব হোসেন এবং পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম।
ড. সেলিনা আক্তার বলেন, দেশে কোথাও চটের বস্তার কোনো সংকট নেই। দেশে পর্যাপ্ত চটের বস্তার রয়েছে। কিন্তু অনেক স্থানে ২ টাকা কম বেশির কারণে মিল মালিকরা চটের বস্তা নিচ্ছেন না। অথচ একটা চটের বস্তা ৩ বা ৪ বার ব্যবহার করা যায়। ফলে প্লাস্টিকের বস্তার তুলনায় চটের বস্তার খরচ কমে আছে। ফলে কোনো অজুহাতে প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সময় পাট অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সোহরার হোসেন বলেন, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে অভিযান চালিয়ে পাটের বস্তার পরিবর্তে প্লাস্টিকের বস্তায় চাল বিক্রি করায় দুটি দোকানকে মোট ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্লাস্টিক বস্তা ব্যবহার করতে উচ্চ আদালতে ৩৫টি রিট করা হয়েছিল। আমরা খবর নিয়ে দেখেছি ভুল তথ্য দিয়ে উচ্চ আদালতে এসব রিট করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল বাজারে পাটের বস্তার সংকট রয়েছে। বাস্তবে বাজারে চটের বস্তার কোনো সংকট নেই। ইতিমধ্যে আদালত সন্তুষ্ট হয়ে ২৫টি মামলার রিট খারিজ করে দিয়েছেন। বাকি ১০টি মামলার রিটও দ্রুত নিষ্পত্তি করে সরকারের পক্ষে রায় দেবে বলে আশা করছি।
তিনি বলেন, ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০’ অনুযায়ী ১৯টা পণ্যে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক রয়েছে এসব পণ্যে কেউ যদি প্লাস্টিকের ব্যবহার করে তাহলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশব্যাপী অভিযান চলছে এবং এসব অভিযান সারাবছর চলে। ৬ মার্চ জাতীয় পাট দিবস উপলক্ষে সবাইকে সচেতন করার জন্য একটি বিশেষ অভিযান চলছে।
মোহাম্মদপুর সরকারি কৃষিপণ্যের পাইকারি বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মনিরুল ইসলাম মন্টু বলেন, আমাদের এক মাসের সময় দেওয়া হয়েছে। আমরা চেষ্টা করব এক মাসের মধ্যে আমাদের কাছে যে সব প্লাস্টিকের বস্তায় চাল রয়েছে সেগুলো বিক্রি করে ফেলতে। নতুন করে এই বাজারে আর প্লাস্টিক বস্তায় চাল বিক্রি করা হবে না।
দেশের উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যরে মধ্যে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন এবং পলিপ্রোপাইলিন (প্লাস্টিক দানা) উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। উৎপাদিত ৯২ শতাংশ পণ্যই রপ্তানি করা হয়। দেশে তৈরি পোশাক খাতের প্যাকেজিং থেকে উৎপন্ন প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ ১৬ শতাংশ। এ খাতে পণ্যের প্যাকেজিংয়ে যে পরিমাণ প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়, তা থেকে উৎপাদিত বর্জ্য সম্পর্কে সে হারে সচেতনতা নেই।