জামায়াত হেফাজতের বিকল্প হতে চায় ইসলামী আন্দোলন

দেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও হেফাজতে ইসলামের বিকল্প শক্তি হিসেবে জায়গা নিতে চায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে ভোট এবং জোট দুটি পন্থায় এগোচ্ছে দলটি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ৩০০ আসনে প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি ইসলামপন্থী ১২টি দলকে একটি প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে দলটি।

এদিকে নির্বাচনী মাঠে দলটি যে ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে সেটি মনে করছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও। ফলে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি দলটির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে; বিশেষ করে আন্দোলন, ভোটের হিসাব কষে যোগাযোগ বাড়িয়েছে বিএনপি। বলা হচ্ছে, আপাতত নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মনোযোগী হলেও কিছু কমন এজেন্ডা নিয়ে মাঠে থাকবে তারা। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে দল দুটির এমন ইঙ্গিত দিলেও একটি পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত কোনো পক্ষই মুখ খুলতে নারাজ। তবে আলাদা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ব্যাপারে দৃশ্যমান বেশ কয়েকটি বৈঠক সেরেছে ইসলামী আন্দোলন। দলটির নেতারা বলছেন, আগামী জুনের মধ্যে জামায়াত ও হেফাজতের শূন্যতা পূরণে সমমনা ইসলামি দলগুলোকে এক কাতারে নিয়ে আসা এবং একটি রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরার জন্য কাজ চলছে। ইতিমধ্যে সমমনা অন্তত ১২টি দলের সঙ্গে পৃথক পৃথক আনুষ্ঠানিক বৈঠকও হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী বা হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক হবে না জানিয়ে দলটির একাধিক নেতা জানান, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের জন্য ইসলামি শক্তিগুলোর বিকল্প সক্রিয় প্ল্যাটফর্ম তৈরিই তাদের লক্ষ্য। প্রাথমিকভাবে এই প্ল্যাটফর্মের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইসলামী আন্দোলন নির্বাচনী মোর্চা’।

এদিকে সরকারি দলের বিরূপ প্রচারের কারণে জামায়াত নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক ধারণার আগেই সচেতনভাবে দলটিকে এড়িয়ে চলছে বিএনপি। প্রায় দুই যুগ ধরে আন্দোলন ও নির্বাচনে থাকলেও সম্প্রতি যুগপৎ কর্মসূচিতে জামায়াতের কর্মকা-ে খুশি নয় বিএনপি। তাই এবার নির্বাচনে অংশ নিলে প্রার্থী বাছাইয়ে দলটিকে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। সে হিসেবে ভোটের মাঠে জামায়াতে ইসলামীর বিকল্প শক্তি হিসেবে সক্রিয় বাকি ইসলামি দলগুলোকে নিজেদের পক্ষে রাখার কৌশল নিয়েছে বিএনপি। সব রকমের যোগাযোগ রাখা হচ্ছে, দেশ রূপান্তরকে এমনটি জানিয়ে বিএনপির নেতারা বলছেন, দুই পক্ষই নিজ নিজ ফোরামে আলোচনা-পর্যালোচনার কাজটি সারছে। দুই দিক থেকে আসার ট্রেনে একটি জংশনে পৌঁছানোর পরই তা জানানো হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইসলামি বা অন্য দলগুলোর মতোই এসব প্রতিষ্ঠানেরও নির্দিষ্ট অনুসারী রয়েছে। ভোটের বাজারে এসব দল বা সংগঠনের চাহিদা রয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জাতীয় পার্টির কাছে। তাই এসব দল বা সংগঠনের সঙ্গে সব দলই বন্ধুত্ব রাখতে চায়। সংগত কারণে বিএনপির কাছেও এদের চাহিদা রয়েছে। আছে বলেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তিনি জানান, আলোচনায় তারা যে ইঙ্গিত দিচ্ছেন, এতে বোঝা যাচ্ছে শিগগিরই একটা পরিণতির দিকে যাবে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে ইসলামি শক্তির নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম নিয়ে আমরা কাজ করছি। ইতিমধ্যে ১০ থেকে ১২টি দলের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। দলগুলো একটু সময় নিচ্ছে। তবে আশা করি আগামী জুনের মধ্যেই এই জোটের অস্তিত্ব একটি রূপরেখায় পৌঁছাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জোট হলে এবার এককভাবে নয়, শরিককে নিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেব। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তাদের একটি লিয়াজোঁ কমিটি রয়েছে।’

সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে দলটির আমন্ত্রণে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল যায়। এ সময় ঘোষিত ১০ দফা দাবির পক্ষে রাজপথে থাকতে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হলে জবাবে ইসলামী আন্দোলন জানায়, তাদের ১৯ দফায়ও সুষ্ঠু ভোট, রাষ্ট্র সংস্কার ও জাতীয় সরকারের কথা আছে। নিজেদের এজেন্ডার বাইরে আপাতত না গেলেও বিএনপিকে আশ^স্ত করা হয়েছে, সুষ্ঠু ভোটের জন্য যেকোনো আন্দোলনে মাঠে থাকবেন তারা। গত জানুয়ারিতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী আন্দোলনের জাতীয় সম্মেলনে সরকারের তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদকে যোগ দিতে দেখা গেছে।

ইসলামি দলগুলোর একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, জোট করার লক্ষ্যে গত বছর থেকেই কাজ চলছে। ক্রীড়নক হিসেবে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা ইতিমধ্যে পৃথকভাবে গত বছরের ৪ আগস্ট খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে, ২৬ আগস্ট পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের নেতাদের সঙ্গে, ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির নেতাদের সঙ্গে, ৩ সেপ্টেম্বর একই স্থানে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সঙ্গে, ৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সঙ্গে পুরানা পল্টনে কেন্দ্রীয় অফিসে বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস, এবি পার্টির সঙ্গে বৈঠক হয়। সর্বশেষ গত ১০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে শিক্ষাক্রম নিয়ে আয়োজিত একগোলটেবিল আলোচনা হয়েছে। সেখানে গোলটেবিলের বাইরে জোট গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন একাধিক ইসলামি দলের নেতারা।

সৌজন্য বৈঠকের কথা স্বীকার করে কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি পরিস্থিতি ও সময় বলে দেবে। এখনো তো সময় আছে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের ইসি নিবন্ধিত অংশের দপ্তর সম্পাদক আব্দুল গফফার বলেন, ‘বিভিন্ন দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হচ্ছে। সময় ও পরিস্থিতি হলে আমাদের শূূরা সদস্যরাই সিদ্ধান্ত নেবেন।’

জানা গেছে, কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক আটটি দল প্রয়াত শায়খুল হাদিস প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, মুফতি ফজলুল হক আমিনীর ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (জিয়া উদ্দীন), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (আতাউল্লাহ), খেলাফত মজলিস (ইসহাক), নেজামে ইসলাম পার্টি, ফরায়েজি আন্দোলন ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (আবুল খায়ের)। এই দলগুলো জোট গঠন প্রক্রিয়ায় সামনের কাতারে রয়েছে। নেজামে ইসলাম পার্টি, ফরায়েজি আন্দোলন ছাড়া বাকি ৬টি দলই নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত।

ইসি সূত্রে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে ৪০টি। এর মধ্যে ধর্মভিত্তিক ইসলামি দল ১০টি। আর কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দল রয়েছে ৬টি।

বিএনপি ২০-দলীয় জোট ভেঙে দিলেও ভিন্ন ফরম্যাটে ৫টি দল ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত মজলিস বিএনপির সঙ্গে রয়ে গেছে। যদিও ইসি নিবন্ধিত মূল দলের কোনোটিই এখন বিএনপির সঙ্গে নেই। অন্যদিকে মুফতি ফজলুল হক আমিনী প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ঐক্যজোট ও আতাউল্লাহ হাফেজ্জীর খেলাফত আন্দোলন কোনো জোটে না গেলেও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে জানা গেছে। এর বাইরে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও জাকের পার্টি আগে থেকেই সরকারের সঙ্গে রয়েছে।