শিল্প বাছাই-নির্বাচন-উপস্থাপনা-প্রদর্শনী সংক্রান্ত ২০০/৩০০ বছরের ইতিহাস আছে। সেখানে শিল্পকলার কিউরেশন একটা নতুন ধারণা। অনেকটা সম্পাদনার মতো করে কিউরেউশনের যে চর্চা তা দীর্ঘ ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে আজকের এই অবস্থানে এসেছে। একজন কিউরেটর যিনি তার নিজস্ব চিন্তা-মতামতের মাধ্যমে শিল্প বাছাই করে একটি বিষয়কে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে। এটা কখনো কখনো শিল্পীর ইনটেনশনের বাইরেও চলে যায়। কিউরেশন বিষয়টি এখন সার্বিক শিল্পচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত ৩০ বছর ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিয়ানেল-ট্রিয়ানেল কিংবা শিল্পের যে বড় বড় আয়োজন সেখানে দেখা যাচ্ছে কিউরেশন পদ্ধতিটা ইন্টিগ্রেট করেছে। কিউরেটর সেখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন। তবে কিছুকাল আগে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতেও কিউরেশন বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণের একাডেমি ছিল না। ২০০০ সালে প্রথম রয়্যাল একাডেমি কিউরেশনকে তাদের কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করে, যেখানে শিল্পশিক্ষার মতো কিউরেটররাও শিক্ষা-দীক্ষা নিতে পারেন।
এখনো আমাদের দেশীয় শিল্পশিক্ষার বিদ্যায়তনগুলোতে কিউরেশন পদ্ধতি শেখার কোনো উপায় নেই। তাই বলে কি আমাদের এখানে কিউরেশন হয়নি? হয়েছে। সেটা বিদেশিদের দেখেই হোক কিংবা প্রদর্শনীকে আরও সঠিকভাবে উপস্থাপনের তাগিদ থেকেই হোক কিউরেশন কিন্তু হয়েছে।
আমরা এটা আর্কিটেকচারাল প্র্যাকটিসে দেখতে পারি। বেশ আগে স্থপতি সাইফুল হক এবং কাজী খালেদ আশরাফ তারা ‘পুণ্ড্রনগর থেকে শেরেবাংলা নগর’ নামে একটা প্রদর্শনী করেছিলেন জাতীয় জাদুঘরে। তারা নিজেদের কিউরেটর বলেননি, কিন্তু সেই প্রদর্শনীর মধ্যে কিউরেশনের সার্বিক গুণাগুণ দেখা যায়। এশিয়ান বিয়ানেল বা দৃক আয়োজিত ছবিমেলার মতো প্রদর্শনীগুলোর প্রথম দিকে কিউরেশন না থাকলেও পরে কিন্তু কিউরেশনকে তারা যুক্ত করেছে। পরে বেঙ্গল, ঢাকা আর্ট সেন্টার, কলাকেন্দ্রের মতো গ্যালারিগুলোতে কিউরেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। এখন কিন্তু কিউরেটর আয়োজকের ভূমিকা পালন করেন এবং এটা দিন দিন পপুলার হচ্ছে। এখন প্রত্যেকটা এক্সিবিশনেই কিউরেটর থাকা বাধ্যতামূলক।
এখন প্রশ্ন আসে কিউরেশন আমাদের এখানে শিখবার কোনো জায়গা নেই তাহলে এই প্রদর্শনীগুলোতে কিউরেটর কারা হচ্ছেন? প্রথম দিকে কিছু শিল্পীকে কিউরেটরের ভূমিকা নিতে দেখা গেছে। তার পাশাপাশি এখন অনেক শিল্প সমালোচক এবং শিল্প উৎসাহীও কিউরেটরের ভূমিকা নিচ্ছেন। আর কিছু সংগঠন আছে যারা বিদেশ থেকে স্বনামধন্য কিউরেটরদের নিয়ে এসে এক্সিবিশন করেছে। এখানে সামদানি আর্ট সামিটের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, তারা বিদেশি কিউরেটর আনা শুরু করেছিল। তবে আস্তে আস্তে তারা দেশি কিউরেটরদেরও স্থান দিচ্ছেন। বেঙ্গল দেশি কিউরেটদের স্থান দিচ্ছে। ঢাকা আর্ট সেন্টার বা কলাকেন্দ্র দেশি কিউরেটর তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের স্পেসে সবসময়ই নতুন কিউরেটরদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
আমাদের এখানে বিষয়টি চর্চানির্ভর অর্থাৎ করে করে কিউরেশনের বিষয়গুলো আমরা শিখছি। এর মাধ্যমে আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করছি। এখন আমরা দেখি অনেক দেশি কিউরেটর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও কাজ করছেন। সার্বিকভাবে বলা যায় কিউরেশনের চর্চা এখন আমাদের দেশে স্থায়ী আসন নিয়েছে। পেশা হিসেবে এটা কিন্তু ইন্টারেস্টিং। এ পর্যন্ত কিউরেটররা যে প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছেন আয়োজকরা কিন্তু তাদের ভালো সম্মানীও দিচ্ছেন।
কিউরেটর আর্ট ইকোসিস্টেমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। আমাদের শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে গত ৫/৬ বছর ধরে কিউরেশনের একটি স্থায়ী রূপ দেখা যাচ্ছে। পেশা হিসেবে চালিয়ে নেওয়ার মতো অবস্থাও তৈরি হচ্ছে। যদিও জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে (শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর) কিউরেটরের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। তবে, পরিবর্তন আসছে। দুর্ভাগ্য এই যে, কিউরেশন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখার কোনো সুযোগ নেই। যারা শিখছেন তারা চর্চার মাধ্যমেই বিষয়টি আয়ত্ত করছেন, দেখে শিখছেন।
এ পর্যন্ত দেশে কিউরেটরের ভূমিকা যারা নিচ্ছেন তাদের অধিকাংশই শিল্পী। তাছাড়া ফটোগ্রাফার এবং স্থপতিরা রয়েছেন। এর বাইরেও নৃ-বিজ্ঞান, সাংবাদিকতা এবং সামাজিক বিজ্ঞান থেকেও যদি কিউরেশনে লোক আসত, বিষয়টা আরও ভালো হতো। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যারা কিউরেটর হিসেবে কাজ করছেন তাদের একটা বড় অংশ কিন্তু অন্য ডিসিপ্লিন থেকে আসা। যারা অন্য ডিসিপ্লিন থেকে এসে শিল্পমাধ্যমকে বুঝে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবেন, তারা কিন্তু এগিয়ে থাকবেন।
শিল্পী তার নিজস্ব ইনটেনশন থেকে কাজটা করেন, কিন্তু শিল্পটা তাকে ছাড়িয়ে যায়। কিউরেশনটা হলো গুছিয়ে দেখা, একটা নতুন দৃষ্টিকোণ তৈরি করা। শিল্পীর একটা স্টেটমেন্ট তৈরি করা। কিউরেশনের ফলে শিল্পী যেমন উপকৃত হন, দর্শকও তেমনই উপকৃত হন। কেননা, কিউরেশন শুধু থিমটাই তৈরি করে না, যোগাযোগ নিয়েও ভাবে। কিউরেটর ছাড়া যে কোনো প্রদর্শনীই সাদামাটা।