সুফি আর্ট রুহানি নূরের আর্ট বেহেশতের সুঘ্রাণ যেন

সব আর্টই মিস্টিক; কোনও না কোনো মাত্রায়। ভালো আর্ট হলেই মিস্টিসিজম থাকবে। মিস্টিক কোয়ালিটি না থাকলে আর্ট হয় না; আমার মতে। আর্ট দেখলেই বোঝা যায় এর মধ্যে এমন একটা কিছু আছে যেটা বোঝা যাচ্ছে না, ওইটা বোঝার জন্যই মানুষ এত চিন্তাভাবনা করে। আর্ট-আর্ট করে। ভ্যালুটা দেয়। ওইটা মনে হয় যে জীবন্ত জিনিস; কোনো ফাইনাল কনক্লুশন নেই। ভালো আর্টে কোনো ফাইনাল কনক্লুশন নেই। মিস্টিসিজম ওইটাই।

আবার মিস্টিক আর্ট বলতে আলাদা একটা ব্যাপার আছে। মিস্টিক আর্ট আর সুফিজম একই। মিস্টিক আর্ট হতে পারে যে কোনো ধর্মের; কিন্তু সুফিজমটা ইসলাম ধর্মতত্ত্বের একটা জায়গা। ইসলামের যে বাতেনি জ্ঞানগুলো; যেটা গোপনে থাকে। যেটা সবসময় সব জায়গায় বলা যাবে না। এটা শুদ্ধতম জ্ঞান। সেখান থেকে যে ইমেজগুলো আসে সেটাই সুফি ইমেজ। সেখানে কী থাকবে, তা বলা মুশকিল। সুফি দরবেশদের চেহারা থাকে, তাদের নিয়ে যে গল্পগুলো আছে সেটা চিত্রিত হতে পারে। অবশ্যই কুরআনের অনেক জিনিস থাকবে। কুরআনই তো মূল। কুরআনের বিভিন্ন দৃশ্য থাকতে পারে, সেটা আর্টিস্টের ওপর নির্ভর করে। কোনো ঘটনার কিছু অংশ যা আঁকা যায়, সেগুলোও থাকতে পারে।

সুফিজম আসলে পরপারের জ্ঞান। পরপারে কী হবে, সেখানে মুক্তি কীভাবে আসবে। নবীর কথা মেনে চলে আল্লাহর কাছে যাওয়ার যে পথ সেটাই সুফিজম। কিন্তু সেটা একটু বাতেনিভাবে। এটা কোনো প্রকাশিত জ্ঞান না। এটার মধ্যে একটা গোপন ব্যাপার আছে। আর্টগুলোর মধ্যেও ওই মিস্টিক কোয়ালিটি থাকে। অজানাকে দেখার যে ইচ্ছা, মহাত্মার সঙ্গে মিলনের যে আকাক্সক্ষা, আল্লাহর সঙ্গে মানুষের মিশে যাওয়ার যে আকাক্সক্ষা, এটাই সুফিজম।

সুফিজম হচ্ছে ম্যাটার থেকে এনার্জিতে চলে যাওয়া। পৃথিবীর আত্মা থেকে পরমাত্মায় মিশে যাওয়া। পৃথিবীতে তো আমরা সাধারণ আত্মা হিসেবে আসি, যেখানে ‘নূর-ই মুহম্মদ’ গোপনে থাকে। সাধনা করে সেটাকে জাগ্রত করাই সুফিদের কাজ। এবং বিভিন্ন কাজ করে আত্মার উন্নয়ন ঘটাতে থাকি, এভাবে আল্লাহর যে আশীর্বাদ সেখানে আমরা চলে যাই। এই পথটা যিনি প্র্যাকটিস করেন তিনিই সুফি মাস্টার বা দরবেশ এবং যারা ভাগ্যবান তারা আউলিয়া/ আল্লাহর ওলি হয়ে যান।

ওলিদের জীবনী, আউলিয়া বা নবী রাসুলদের কোনো ঘটনা এগুলো যদি কেউ আঁকে যেমনটা বিভিন্ন মাজারে থাকে, মাজারের সজ্জা, চিত্রকলা, পাকপাঞ্জাতন এগুলোকে সুফি আর্ট বলা যায়। ২০০৫ সালে নূহের নৌকার ১০০ ফুট ছবি দিয়ে আমার সুফিআর্টের চর্চার গ্র্যান্ড ওপেনিং হয়। সেটাকেই শুরু বলা যেতে পারে। ব্যাংককেও নূহের নৌকার প্রদর্শনী হয়েছে। পরে ঢাকা-চট্টগ্রামে আমার কিছ সুফি কাজ আছে। ব্যাংককের মতো জায়গায় আমি মেরাজের ছবি এঁকেছি, সেটা দিয়ে পোস্টার ও এক্সিবিশন হয়েছে। এছাড়া আসহাবে কাহাফ, ইউসুফ-জুলেখা, কারবালা, হিজরত, বায়জেদি বোস্তামির কাছিম, হজরত শাহজালালের গজার মাছ, খানজাহান আলীর কুমির, আনা সাগর থেকে গরিবে নেওয়াজ খাজা বাবার (রহ.) পানি নেওয়া, মুসার (আ.) সমুদ্র ভাগ করা, তুর পাহাড়ে আল্লাহর সঙ্গে মুসার (আ.) সাক্ষাৎসহ এসব অনুষঙ্গ করে প্রতীকী ছবি এঁকেছি। হজরত ইব্রাহিম কান্দুজির (রহ.) সঙ্গে হজরত গরিবে নেওয়াজ সুলতানুল হিন্দ খাজা মইনুদ্দিন চিশতির (রহ.) সাক্ষাতের ছবিও এঁকেছি। হজরত ঈসার (আ.) সঙ্গে দোজখের শাস্তিপ্রাপ্ত জালিম সম্রাটের মাথার খুলির ছবি এঁকেছি, সিদরাতুল মুনতাহার পেইন্টিং করেছি।

ট্রাডিশনালই আমাদের এখানে অনেক সুফি চিত্রকলা আছে, সেগুলোকে খুঁজে বের করে মডার্নাইজ করাও সুফি আর্ট। যেমন গাজী পীরের ছবি, বোরাকের ছবি, জোড়া ময়ূরের ছবি এগুলো সুফি কনটেক্সট। আঁকার ভঙ্গির মধ্যে একটা সমর্পণ থাকে, ডিভাইন আলোর খেলা থাকে। সুফি আর্ট ওইরকম আলাদা কিছু না, একটা চেতনা, একটা বিশ্বাস। আপনি যে পথটাতে আছেন তা প্রকাশ করার জন্য কিছু সিম্বল, প্যাটার্ন, কালার তৈরি করা। কিছু আয়াত, সুরা কিংবা জিকিরের কোনো কিছু ক্যালিগ্র্যাফির সঙ্গে কালার কম্বিনেশন তৈরি করেও সুফি আর্ট হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। ওইভাবে সুফিজমের আর্ট বলতে সূক্ষ্ম কিছু বিষয় থাকে। আমি নিজে মডার্ন আর্টের মাধ্যমে বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

মূলত সুফি ঘরানার ছবি প্রতিদিনই আঁকি, তার সঙ্গে কুরআন-হাদিসেরও অনেক বিষয় থাকে। যেমন: বেহেশত-দোজখের ছবি আঁকলাম। কিছু জিনিস আছে যেগুলো আগে আঁকা হয়নি কিন্তু আঁকা যেতে পারে। যেমন: রানি বিলকিসের সিংহাসন, সোলায়মানের (আ.) দরবার শরিফ, সম্রাট জুলকারনাইনের কাহকাফ নগরীতে ঢোকা, ইয়াজুস-মাজুসের দেয়াল ভেঙে বের হয়ে আসা এগুলো নিয়ে ছবি আঁকছি। এর সবই সুফি বা ইসলামিক ঘরানার। একটা ডিসকোর্স দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি, যেটা আমাদের এখানে ছিল না। উপমহাদেশে হয়তো কিছুটা ছিল, পাকিস্তান-ভারতের কিছু অংশে ছিল। কিন্তু আমাদের এই অঞ্চলে কোনো মডার্ন পেইন্টার এভাবে এসব বিষয় নিয়ে কাজ করেননি। সেই কাজটাই আমি করার চেষ্টা করছি।

এমন না যে করণীয় বলে করছি, এটা আমার জীবনের একটা অংশ। আমি এভাবে চিন্তা করি, রাত-দিন এ জগতেই থাকি, তাই এসব ছবি আমি আঁকছি। এখানে নতুন কিছু করার তাড়না নেই, যখন যা আসে তাই করি। আল্লাহ-রাসুলের নির্দেশে করছি। যারা সাধক তাদের কাছে নির্দেশ আসে।

অনেকেই বলে ছবি আঁকা নিষেধ কুরআনে, আসলে বিষয়টা সেরকম নয়, এ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। ছবি বা মুখাবয়ব আঁকা নিষেধ নয়, পূজা করা নিষেধ। এটা হলো শেষ দুনিয়া, শয়তানের কাজকর্ম অনেক বেশি। আমাদের কাজ হলো শয়তানের মণ্ডল থেকে বেরিয়ে আল্লাহর মণ্ডলের দিকে যাওয়া। সুফি আর্ট বলেন আর যাই বলেন এর মধ্য দিয়ে আল্লাহর কথা বলা যায় এবং শয়তানের মণ্ডল থেকে বের হয়ে আসার জন্য মানুষকে বলা যায়, যেটা অন্য আর্টের মধ্য দিয়ে বলা সম্ভব হয় না, এদিকে ঝোঁকার এটি একটি বড় কারণ।