তিস্তায় ভারতের আরও ২ খাল খননের উদ্যোগ

দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষির জন্য মারাত্মক হুমকি

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে অমীমাংসিত ইস্যুটি সামনে এলেই সবার আগে আসে তিস্তার পানিবণ্টন প্রসঙ্গ। এক দশক আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ঢাকা সফরে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে দুই দেশ একমত হয় এবং কীভাবে পানিবণ্টন হবে সেটিও চূড়ান্ত হয়েছে। এখন এ চুক্তিটি সইয়ের অপেক্ষা। গত বছর সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে তিস্তা চুক্তি নিয়ে ঢাকার আশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তির ক্ষণ গুনছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের আওতায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেচ বিভাগ আরও দুটি খাল খননের জন্য প্রায় এক হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করেছে বলে দেশটির গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

পানি বিশেষজ্ঞ ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনিতেই শুষ্ক মৌসুমে দেশের উত্তরাঞ্চলে পানির প্রবাহ থাকে না। আবার চুক্তি না থাকায় পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া যায় না। আর এখন পশ্চিমবঙ্গ যদি দুটি খাল খনন করে তাহলে রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর কৃষি মারাত্মক হুমকি মুখে পড়বে। দ্রুত এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দিল্লির সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। ভারতীয় গণমাধ্যমে খাল খননে জমি অধিগ্রহণের খবর প্রকাশিত হওয়া পর থেকেই রংপুর ও উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদীসংলগ্ন গান্নারপাড়া এলাকার চাষি আতাউর রহমান রহমান আতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমনিতেই এখন তিস্তা হেঁটে পার হওয়া যায়। আবার আগামীতে তিস্তার পূর্ব তীরে দুটি খাল খনন করে পানি আটকে দিলে হামরা মরি যামো। কোনো আবাদ-সুবাদ হবার নয়। হামরা কী করি খামু। সরকার তো হামাকগুলাক দেখে না।’

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সেচ সম্প্রসারণের নীতি তাদের জন্য যতটা ভালো বাংলাদেশের জন্য ততটাই উদ্বেগের বলে মনে করেন জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। তিনি গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কৃষি ও সেচের জন্য এটা অবশ্যই আতঙ্কের। এমনিতেই তারা শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহার করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে তিস্তার অববাহিকায় বাংলাদেশ ও ভারতের যে দুটি ব্যারেজ প্রকল্প রয়েছে, সেখানে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। সেই সময় নদীতে কিছুটা পানি থাকে। আর বাংলাদেশ তখন কিছুটা পানি পায়। এখনই ভারত তাদের পুরো সেচ প্রকল্পের জন্য পানি প্রত্যাহারের পর তলানিটুকু আমরা পাই। আর খাল খনন করলে ভারত যদি তলানির পুরো পানি প্রত্যাহার করে তাহলে বাংলাদেশ কিছুই পাবে না। আর এতে করে আমনের মৌসুমে বাংলাদেশ ক্ষতির মুখে পড়বে। রংপুর, বগুড়া, জয়পুরহাটসহ তিস্তা প্রকল্পের এলাকা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। একইভাবে মহানন্দা অববাহিকাও ক্ষতির মুখে পড়বে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাহত হবে।’

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরে ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘এ খাল খননের সঙ্গে যুক্ত হবে জলবায়ু পরিবর্তন। এ দুই কারণে বাংলাদেশের পানির প্রাপ্যতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। দেখা যাবে শুকনো মৌসুমে পানি আরও কমে যাবে। ভারত হলো উজানের দেশ। তারা যদি সেই জোরে পানি প্রত্যাহার করা শুরু করে তা হবে অত্যন্ত লজ্জাজনক।’

তিনি মনে করেন, এটা উজানের দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মের পরিপন্থী। ভারতীয় আইনও তা সমর্থন করে না। তাই সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো উদ্যোগ নেওয়া দরকার। কারণ পশ্চিমবঙ্গ তাদের স্বার্থ দেখছে। বাংলাদেশের স্বার্থ তো তারা দেখবে না।

এ প্রসঙ্গে ‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের’ সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারত সরকার পূর্বের দ্বন্দ্ব মীমাংসা না করে নতুন করে আগুনে ঘি ঢালার মতো বাংলাদেশের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করল। পশ্চিমবঙ্গ তিস্তা ও জলঢাকা নদী থেকে পানি সরাতে কোচবিহার থেকে চ্যাংড়াবান্ধা পর্যন্ত দুটি খাল খননের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এতে করে আগামীতে তিস্তা সেচ প্রকল্প আর চলবে না, ধরলাও মরে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ১১ মার্চ রংপুর সিটি করপোরেশনের হলরুমে সভা ডাকা হয়েছে। সেখান আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করব।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক ড. আবু ছালেহ মোহাম্মদ ওয়াদুদুর রহমান (তুহিন ওয়াদুদ) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী উজানে নদীবিষয়ক কিছু কাজ করতে হলে ভাটির দেশের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে করতে হয়। কিন্তু ভারত আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে উপরন্তু একতরফা পানি প্রত্যাহার করে। এতে বাংলাদেশ এলাকা ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। নতুন করে আবার পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাদের তিস্তার আওতা বৃদ্ধি করছে। এতে করে পানি না পাওয়ার কারণে যে ক্ষতি হবে, সেই ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশের জন্য এখনই কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’