পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের (কাদিয়ানি) সালানা জলসা বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হতাহতের ঘটনার পর গতকাল সোমবার সকাল থেকে জেলা শহরের পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল। সকাল ৯টার পর থেকেই শহরে মানুষজনের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করে। খুলতে শুরু করে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। জেলা শহর ও শহরের উপকণ্ঠে আহমদিয়া সম্প্রদায় অধ্যুষিত আহমদনগর এলাকায় ছিল পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের টহল এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কড়া নজরদারি। এ ছাড়া গত শুক্রবারের ওই সহিংসতার পর থেকে এখন পর্যন্ত হওয়া ছয়টি মামলায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
তবে উদ্বেগ আর আতঙ্ক কাটেনি আহমদিয়াদের। পঞ্চগড়ের দুটি গ্রামে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষের বসবাস। যাদের প্রায় সবাই শুক্রবারের সহিংসতায় হতবাক। আতঙ্কিত শিশুরা। আগুন দেখলে অনেকেই চমকে উঠছেন। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন যাপন করছে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নারী, পুরুষ ও শিশুরা। সবার মধ্যে একটাই আতঙ্ক, আর তা হলো যদি আবার এসে হামলা করে। বাড়িতে থাকতে নিরাপদ বোধ করছে না কেউই। অবশ্য আগুন আর ভাঙচুরের কারণে বাড়িতে থাকার মতো পরিস্থিতিও নেই। অনেকেই নিজেদের বাড়ি ছেড়ে স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত আহমদিয়ারা কারও সাহায্য-সহযোগিতা চান না। তারা শুধু নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা চান, নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা চায়। গতকাল সকালে পঞ্চগড় জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন আহমদনগরে আহমদিয়াদের ক্ষতিগ্রস্ত জনবসতি পরিদর্শনে গেলে তার কাছে এমন দাবি জানান তারা। মন্ত্রীর কাছে তারা সহিংসতায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচারেরও দাবি জানান। এ সময় রেলমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত ১০০ পরিবারের মধ্যে একটি করে শাড়ি, লুঙ্গি ও কম্বল দেন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবারকে চালসহ রেলমন্ত্রীর নিজস্ব তহবিল থেকে পরিবারপ্রতি এক হাজার করে টাকা দেওয়া হয়। পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল আলীম, জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার এস এম সিরাজুল হুদাসহ পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আহমদনগরের প্রায় সব বাসিন্দার চোখে-মুখে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার ছাপ। আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সদস্য মাহমুদ আহমাদ সুমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আহমদনগরে ৬০ থেকে ৭০ বছর ধরে সম্প্রীতির সঙ্গে সবাই বসবাস করে আসছে। আমরাও এখানে স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করেছি, একই সঙ্গে খেলাধুলা করেছি। কখনো কোনো বিরোধ হয়নি। তিন-চার বছর ধরে একটা উচ্ছৃঙ্খল মহল ঢাকা থেকে বা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে মানুষজনকে উসকে দিয়ে এই কাজগুলো করাচ্ছে। এই মূলহোতাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।’
গত শুক্রবার বিকেলে পঞ্চগড় সদর উপজেলার আহমদনগর এলাকায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ লোকজন। সেই আগুন জ্বলতে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। এই সহিংসতায় দুই তরুণ নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের জলসা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
আহমদিয়া সম্প্রদায়ের আহমদ জাফর বলেন, ‘সেদিনের বীভৎসতায় আমার সাত বছরের ছেলে এখনো আঁতকে ওঠে। পুলিশ দেখলে ভয়ে কেঁদে ফেলে। এমন অবস্থা আমাদের প্রত্যেক পরিবারের। আমরা সরকারের কাছে নিরাপত্তা চাই।’ আহমদিয়া সম্প্রদায়ের গণসংযোগ ও প্রেস বিভাগের প্রধান আহমদ তবশির চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কারও সাহায্য-সহযোগিতা চাই না। আমরা শুধু নিরাপদে বসবাস করতে চাই। নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা চাই।’
মামলা ও গ্রেপ্তার : শুক্রবারের সহিংসতার ঘটনায় আলাদা ছয়টি মামলা করা হয়েছে। পঞ্চগড় সদর থানায় গুজব, হামলা ভাঙচুর, লুটপাট, সরকারি কাজে বাধাদানসহ বিভিন্ন অভিযোগে পুলিশের পক্ষ থেকে চারটি, র্যাবের পক্ষ থেকে একটি এবং আহমদিয়া মুসলিম জামাতের পক্ষে একটি মামলা করা হয়। এসব মামলায় ৩১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় ৮ হাজার ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। যাদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার এস এম সিরাজুল হুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন অভিযোগে ছয়টি মামলা হয়েছে। আরও মামলা প্রক্রিয়াধীন। এ ঘটনায় কমবেশি ২০টির মতো মামলা হবে এবং তদন্তসাপেক্ষে ঘটনায় জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।’
ইন্টারনেটসেবা চালু : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার ছড়ানো বন্ধে পঞ্চগড়ে গত শনিবার রাত থেকে সব ধরনের ইন্টারনেটসেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এতে করে দুর্ভোগে পড়েন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। গতকাল সকাল ১০টার পর থেকে এই সেবা ফের চালু করা হয়েছে।