নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ২০১৬ সালে ‘উদ্ভাবন ও উদ্যোগে উন্নয়ন অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠাকরণ’ প্রকল্প শুরু করেছিল সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ। ২০১৯ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাত বছরেও তা শেষ হয়নি। অথচ প্রকল্পটি নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে না পারায় ফের সময় বাড়িয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এ প্রকল্পটির পরামর্শক ব্যয়ই ১৪ কোটি টাকা। তা ছাড়া বিভিন্ন অনুদানের জন্য ব্যয় হয়েছে ১৮০ কোটি টাকার বেশি।
এ প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের পর আগামী রবিবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অবগতির জন্য উপস্থাপন করা হবে।
শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ২২৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। কিন্তু পরে ব্যয় বাড়িয়ে ২৭১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন হয়েছে। নতুন করে অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পটি আগামী জুনের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে।
ব্যয় বিভাজনে দেখা যায়, এ প্রকল্পের পরামর্শক সেবার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৯৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উৎসবে খরচ করা হয়েছে ১২ কোটি ৬২ লাখ টাকার বেশি। বিভিন্ন প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় করা হয়েছে ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
এ প্রকল্পের জন্য বিভিন্ন আইসিটি সরঞ্জাম কিনতে খরচ হয়েছে ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। শুধু তা-ই নয়, ফার্নিচার বাবদ খরচ করা হয়েছে ২০ কোটি টাকার বেশি।
প্রকল্পটিতে বিভিন্ন খরচ মাত্রাতিরিক্ত হলেও, মূল যে কাজ উন্নয়ন অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠাকরণ, সেখানে সিভিল কাজে ব্যয় করা হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা হলেও এগুলোর পরিকল্পনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। তা ছাড়া, মন্ত্রণালয়গুলোকে এ ধরনের ব্যয় কমানোর জন্য বারবার পরামর্শ দেওয়া হলেও তারা কথা শুনছে না।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে বিবেচনায় প্রকল্প এলাকা আগারগাঁও, ঢাকা নির্বাচন করা হয়েছে। বাংলাদেশে একটি উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম এবং উদ্যোক্তাবান্ধব সংস্কৃতি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা। সংস্কৃতির উন্নয়ন ও তরুণ উদ্ভাবকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী আইডিয়াসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং উন্নয়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেওয়া এ প্রকল্পের মূল্য উদ্দেশ্য।
প্রকল্প সংশোধনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ইন্টারপোর্টেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন প্ল্যাটফরম (আইডিটিপি) প্রণয়নের জন্য এটি সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছে। তা ছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ লেনদেন, স্থানান্তর, ই-কমার্স, এম-কমার্স, বিল পেমেন্ট, মার্চেন্ট পেমেন্ট, রেমিট্যান্স আদান প্রদান, মেশিন-টু-মেশিন পেমেন্ট ইত্যাদি সম্পন্ন করার জন্য আইডিটিপি প্রণয়নের জন্য এটি সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় দেশের শিশু-কিশোরদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, তার জীবনাদর্শ, চিন্তাধারা এবং কর্মকাণ্ড বিষয়ে অবগত করা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, কর্ম, আদর্শিক বিষয়াবলি তথা মহান মুক্তিযুদ্ধ, বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশসহ দেশের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি-সংবলিত গেমভিত্তিক একটি ওয়েব প্ল্যাটফরম তৈরি করা।
এ প্রকল্পের আওতায় অনুদান হিসেবে দুই হাজার এসএমইকে ৫০ হাজার টাকা করে ১০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে দেশীয় উদ্যোক্তা বা স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করানো এবং আন্তর্জাতিক এঞ্জেল ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানিগুলোকে দেশীয় উদ্যোক্তা-স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে ‘বঙ্গবন্ধু ইনোভেশন গ্র্যান্ট (বিআইজি’ প্রতিযোগিতা আয়োজনে অতিরিক্ত অর্থ সংস্থান করার কারণে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে।
ডিজিটাল টেস্টিং ল্যাবকে ফেব্রিকেশন ল্যাবে রূপান্তরকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য গ্র্যান্ট প্রদান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণে অধিকতর স্বচ্ছতা ও দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে ওয়েবভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরি, মুভিং বাংলাদেশ শিরোনামে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো শূন্য থেকে শুরু করে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর সংগ্রামগুলো গল্পে গল্পে ডকুমেন্টারি প্রস্তুতের মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা অন্তভুক্তকরণ এবং উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠানের আইন চূড়ান্তকরণ।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব বিবেচনার জন্য গত ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় কয়েকটি সিদ্ধান্ত প্রতিপালন সাপেক্ষে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। পিইসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়েছে।
প্রকল্পটির মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে স্টার্টআপদের অর্থায়নের বিষয়ে নতুন কৌশলগত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) আওতায় সরকারি মালিকানাধীন একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা। স্টার্টআপদের আর্থিক, টেকনোলজিক্যাল, মেধা সম্পদসহ একটি ভিউ ডিলিজ্যান্স ফার্ম নিয়োগের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা।