ধনী হওয়ার আনন্দ ও আয় বৈষম্য

কারও কারও অধিকতর ধনী হওয়ার ক্ষেত্রে, এমনকি অনেক দেশ, সমাজ ও অঞ্চলকে  টপকিয়ে, এই করোনা-উত্তরকালে ইউক্রেন-রাশিয়ার সমর সন্ধিক্ষণে, আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে যে আনন্দ তা সর্বনাশের, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের প্রাক্কালে যেসব প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছিল তার প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি শুধু বাংলাদেশে নয়, অনেক অর্থনীতিতেও দেখা যাচ্ছে। ১৯৩০ সালের গ্রেট ডিপ্রেশন কিংবা এই নিকট অতীতে ১৯৯৭ সালের এশীয় ক্রাইসিস এবং ২০০৭-০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার কারণ ও প্রভাবের ভূত দেখা অব্যাহত আছে। দেশ সিঙ্গাপুর না শ্রীলঙ্কা হতে যাচ্ছে, সে প্রশ্নও উঠছে। দেশের টাকা লোপাট করে বিদেশের ধনীদের ক্লাবে নাম লেখানোর চেষ্টাও চলছে।

১৯৪৩ সালের দারুণ দুর্ভিক্ষের ওপর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় রঙিন ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। দুর্ভিক্ষের ছবি সাদা-কালো না হয়ে রঙিন কেন এ প্রশ্ন উঠেছিল। ছবির প্রধান চরিত্র গঙ্গা প-িতের কাছে গ্রামের গোমূর্খদের আলাপ হচ্ছে ‘প-িত মশাই, জাপানিরা নাকি সিঙ্গাপুর দখল করেছে।’ একজন পয়েন্ট ব্লাঙ্ক প্রশ্ন করে বসল ‘সিঙ্গাপুর কি মেদিনীপুরের কাছে?’ স্বল্পবিদ্যার স্বঘোষিত প-িতের তো সিঙ্গাপুর ও মেদিনীপুরের দূরত্ব ও মাহাত্ম্য জানা নেই, কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি উত্তর করলেন, ‘সিঙ্গাপুর মেদিনীপুরের একেবারে কাছেও না আবার দূরেও না।’ দেশের অর্থনীতির দুর্দশা ও সংকটকালকে অধিকতর ধনীদের সিন্ডিকেট সম্মোহিত দেশবাসীকে স্মার্টলি ‘জবাব’ দিয়ে যাচ্ছে। নেতিবাচকতার সুপ্রচুর উপাদান উপস্থিত রেখে ‘ইতিবাচক’ আশা-আকাক্সক্ষারা কীভাবে বিকশিত হবে?   

ঠিক এ সময়ে সমাজে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনয়নে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনে অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগে প্রতিশ্রুত (commitment) ও দৃঢ়চিত্ততার প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গটিও উঠে আসছে। নিজেদের অধিক্ষেত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে আদিষ্ট হয়ে, ইয়েস মিনিস্টার স্টাইলে যদি তাদের কর্মধারা পরিচালিত হয় সে ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচার ও স্বচ্ছতার অভাব আকীর্ণ হয়ে উঠতে পারে। স্বেচ্ছচারিতার অজুহাত যৌক্তিকতা এমনকি স্বজনপ্রীতির পরিবেশ বা ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা।

যারা নীতি প্রণয়ন করে, নীতি উপস্থাপন করে তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব দৃঢ়চিত্ততা এবং নীতি-নিয়ম পদ্ধতির প্রতি দায়িত্বশীল থাকা আবশ্যক। তাদের মাধ্যমে, তাদের থেকে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা না এলে কারও পক্ষে জবাবদিহির পরিবেশ সৃজন সম্ভব হয় না। সুশাসন, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা প্রয়োজন সবার স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে। কারণ এটা পরস্পরের পরিপূরক। আরেকটি বিষয় নীতিনির্ধারকরা বা বায়নকারীদের দিয়ে, তাদের ভুল বা ব্যত্যয়ধর্মী নীতি বা সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়িত করিয়ে নিতে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি কিংবা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির, ক্ষেত্র বিশেষে তাদের নানান সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দিয়ে প্রলুব্ধ করতে পারেন, তাদের স্বার্থ উদ্ধার করিয়ে নিয়ে আবার ক্ষেত্রবিশেষে ষড়যন্ত্রের টোপে ফেলে তাদের বিব্রতও করতে পারেন। কায়েমি স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এ ধরনের ‘রাজনৈতিক’ উৎকোচ কিংবা নিপীড়নের প্রথা প্রাচীনকাল থেকে কমবেশি ছিল বা আছে, তবে  মাত্রা অতিক্রমণের ফলে সেটি প্রকারান্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক পরিস্থিতির প্রতিবন্ধকতা হিসেবে প্রতিভাত হয়ে থাকে। যে কোনো সমাজে বা অর্থনীতিতে কতিপয়ের অস্বাভাবিক অর্থ প্রাপ্তির সুযোগ ও প্রযত্ন প্রদান বৈষম্য বৃদ্ধির অন্যতম উপসর্গ। আর এই বৈষম্য বৃদ্ধিতে  নানান আত্মঘাতী প্রবণতার প্রবৃদ্ধি ঘটে।

নানান আঙ্গিকে পরীক্ষা-পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিক্ষক-চিকিৎসক-আইনজীবী-ব্যবসায়ী এমনকি চাকরিজীবীদেরও বাঞ্ছিতভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হয় না। অতিমাত্রায় কোটারি, সিন্ডিকেট বা দলীয় বা রাজনীতিকীকরণের কারণে পেশাজীবী, সংস্থা, সংগঠন এবং এমনকি সুশীল সেবকরাও প্রজাতন্ত্রের হয়ে দল-নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে তাদের হিমশিম খেতে হয়, গলদঘর্ম হতে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়, যার ছত্রছায়ায় নানানভাবে অবৈধ অর্জন চলতে এর পথ সুগম হতে পারে। ‘প্রভু নয় বন্ধু’ সেজে গণপ্রজাতন্ত্রী সেবক যখন প্রভুতে পরিণত হতে স্মার্টনেস দেখাতে চায় তখন সম্পদ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহারের দ্বারা অর্জিত অর্থ দখলের লড়াইয়ে অর্থায়িত হয়ে এভাবে একটা ঘূর্ণায়মান দুষ্টচক্র বলয় হয়ে থাকে। অর্থাৎ সুশাসনের অভাবে স্বচ্ছতার অস্বচ্ছতায় ঘুরে-ফিরে পুরো প্রক্রিয়াকে বিষিয়ে তোলে। সুতরাং সবক্ষেত্রে সর্বাগ্রে উচিত স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এটা প্রয়োজন গণতন্ত্র ও সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সুশাসন স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। এটা পরস্পরের পরিপূরক। স্বচ্ছতার অস্বচ্ছতায় যে উন্নয়ন হয় তাতে জনগণের সুফল নিশ্চিত হয় না। এ উন্নয়নের কোনো উপযোগিতা বা রিটার্ন নেই। এটা এক ধরনের আত্মঘাতী অবয়ব। ‘প্রভু নয় বন্ধু’র ডিকেড (১৯৫৮-১৯৬৮) অব ডেভেলপমেন্ট’ কিন্তু পরের বছর আসল চেহারায় ফুটে উঠেছিল, তার পরের বছর ও খতম তারাবি হয়ে সে স্বর্ণযুগ তামা হয়ে গিয়েছিল।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো কাজ শেষ করার কথা এবং বরাদ্দ সেভাবেই দেয়া আছে। কিন্তু সেই কাজ শেষ করতে যদি বছরের পর বছর সময় লেগে যায়, দ্রব্যমূল্য ও নির্মঠু সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে ও অজুহাতে যদি তিন-চার গুণ টাকা খরচ করতে হয় সেটা তো সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দুর্বল পরিস্থিতিরই পরিচায়ক। আলোচ্য অর্থ দিয়ে একই সময়ে হয়তো আরও অতিরিক্ত দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেত। সময়ানুগ না হওয়া এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে তিন প্রকল্পের অর্থ খরচ করে একটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলো। বলাবাহুল্য অবকাঠামোটি যথাসময়ে নির্মিত হলে সংশ্লিষ্ট খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে উপযোগিতা সৃষ্টি হয়ে জিডিপিতে অবদান রাখতে পারত।  

জিডিপি প্রবৃদ্ধির মূল কথা হলো, যে অর্থই ব্যয় করা হোক না কেন, সেই আয়-ব্যয় বা ব্যবহারের দ্বারা অবশ্যই পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হতে হবে। পণ্য ও সেবা উৎপাদনের লক্ষ্যে যে অর্থ আয় বা ব্যয় হবে সেটাই বৈধ। আর যে আয়-ব্যয় কোনো পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে না সেটা অবৈধ, অপব্যয়, অপচয়। জিডিপিতে তার থাকে না কোনো ভূমিকা। আরও খোলাশা করে বলা যায় যে, আয় পণ্য ও সেবা উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জিত হয় না এবং যে ব্যয়ের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয় না সেই আয়-ব্যয় জিডিপিতে কোনো অবদান রাখে না। কোনো প্রকার শ্রম বা পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়া মওকা যে আয় তা সম্পদ বণ্টন বৈষম্য সৃষ্টিই শুধু করে না, সেভাবে অর্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ধার ধারা হয় না। ফলে তা সৃষ্টি করে আর্থিক বিচ্যুতি। এভাবে যে অর্থ আয় বা খরচ করা হয় তা প্রকারান্তরে অর্থনীতিকে স্মার্ট করে না, পঙ্গু করে দেয়।

সাম্প্রতিককালেরই আলোচ্য বিষয়, জাতীয় বাজেটে বিনা ব্যাখ্যায় স্বল্প করারোপে কালোটাকা সাদা করা, কিংবা বিদেশে পাচার করা টাকা দেশে আনার সুবিধা প্রদান। বিদেশে অর্থ পাচার বৃদ্ধির  ব্যারোমিটার অধিকতর ধনী হওয়ার আনন্দ-বিষাদের প্যাথলজিক্যাল প্রতিবেদন দৃষ্টিসীমায় আসছে। সংগতকারণে এটা উঠে আসছে যে, দুর্নীতিবাজ কালোটাকা লালন থেকে সরে না এলে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য বাড়তেই থাকবে। করোনা-উত্তরকালের এই সংকটে সম্মোহিত সময়ে দেশে দেশে জীবন ও জীবিকার সংগ্রাম সন্ধিক্ষণে আর্থ-সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে যে উদগ্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে এবং আসন্ন মন্দায় মানবিক বিপর্যয়ের যে ইশারা বা লক্ষণ দেখা দিচ্ছে সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আয় বৈষম্যের উপসর্গটি বিষফোড়ায় যেন পরিণত না হয় সে প্রত্যাশা  প্রবল হওয়াই স্বাভাবিক। প্রকৃতির প্রতিশোধ প্রতিক্রিয়ায় মানবভাগ্যে মহামারী বিপর্যয় আসে ঠিকই, তবে তা প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ নিরাময়ের নামে মনুষ্য সৃষ্ট রাজনৈতিক-অর্থনীতির সমস্যারা ঘৃতে অগ্নিসংযোগের শামিল হয়ে দাঁড়ায়।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

mazid.muhammad@gmail.com