কাগজের মূল্যবৃদ্ধিতে সর্বস্তরে নীরব হতাশা

দেশে এমন কোনো দ্রব্য নেই, মূল্য বাড়ছে না। মূল্যবৃদ্ধির কাতারে শামিল হয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সবকিছুর দাম বেড়েই চলেছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ জনগণ দিশেহারা। মূল্যবৃদ্ধির কাতারে নতুন নাম লেখাল ‘কাগজ’। কাগজের দাম মনে হয়, এই প্রথম বাড়ল।

কাগজ কিন্তু আধুনিক যুগে শ্রেষ্ঠ উপকরণ। এবারের অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বইমেলায় সাধারণ পাঠক-পাঠিকাদের প্রশ্ন একটাই, বইয়ের এত দাম বাড়ল কেন? বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধাররা বেশ হতাশ, কারণ কাগজের মূল্যবৃদ্ধির বইয়ের দামও বাড়ানো হয়েছে। বই ক্রেতারা কিন্তু এটা বুঝতে চায় না। তরপরও প্রকাশনা সংস্থার কর্তৃপক্ষরা যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছে পাঠকদের হাতে কম দামে বই তুলে দিতে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত সদ্য সমাপ্ত বইমেলায় প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের বই স্টল ছিল। এতে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সদস্য-সদস্যাদের প্রকাশিত বই স্থান পেয়েছে। এতে আমারও সদ্য প্রকাশিত ‘ফিরে দেখা বড় বাড়ি’ ও ‘সমাজ সংস্কৃতি সভ্যতা’ শিরোনামের বইগুলো ছিল।

যে কথা বলছিলাম, সদস্য প্রকাশিত বইটি বাজেটের মধ্যে রাখতে পারিনি কাগজের মূল্যবৃদ্ধির কারণে। পূর্ণাঙ্গ বই ছাপিয়ে আনতে আনতে দুবার কাগজের মূল্যবৃদ্ধির কবলে পড়েছি। এবারের বইমেলায় আলোচিত ছিল ‘কাগজের মূল্য বৃদ্ধি’। এভাবে আর কত মূল্য বৃদ্ধির কবলে পড়বে সাধারণ মানুষ। কাগজের মূল্যবৃদ্ধি এখনো সক্রিয়। নীরবে-নিভৃতে কাগজের মূল্য বেড়েই চলেছে। কাগজ ব্যবহারকারীরাই যত বেকায়দায় আছে।

আমাদের দেশীয় প্রযুক্তিতে কাগজ তৈরি হলেও এ বিষয়ে কারও কোনো উচ্চবাক্য শোনা যাচ্ছে না। এমন একটা ঐতিহ্য, যা আমরা অনুভব করতে পারছি না। প্রাচীন যুগে তালপাতা, গাছের বাকল, পাথর, তামার পাত্রে লেখা হতো। এর প্রমাণ হিসেবে বলতে পারি প্রাচীনকালের বহু ‘প্রস্তরলিপি’। রামুর সীমা বিহারে তালপাতায় লেখা প্রস্তরলিপি ছিল, যা হিংসাত্মক অগ্নিকান্ডে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, এ খবর আমরা সবাই জ্ঞাত। এই অগ্নিকান্ডে ইতিহাস-ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেল।

চীন দেশে খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে সর্বপ্রথম কাগজ দেখা যায়। আরব এবং আফ্রিকার অধিবাসীরা চীনাদের কাছ থেকে কাগজ তৈরির প্রক্রিয়া শিখে নেয়। চন্দ্রঘোনা কাগজকলে কাগজ তৈরির প্রক্রিয়াও দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে ভাষা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী হিসেবে। আমরা প্রশিক্ষণার্থীরা কর্ণফুলী কাগজকল ভিজিটে যখন সেখানে পৌঁছি তখন কল কর্তৃপক্ষ কাগজ তৈরির সব ধাপ দেখিয়েছেন। নদী থেকে বাঁশ আনা, সে বাঁশ সর্বশেষ মন্ড হয়ে বের হওয়া পর্যন্ত ইত্যাদি প্রক্রিয়া আমরা দেখেছি। এশিয়ার বিখ্যাত এ কাগজকলের দিনকালও নাকি তেমন ভালো যাচ্ছে না।

১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে প্রথম কাগজ কল তৈরি হয়। সূত্রমতে, ফ্রনডিয়ার ও ডিকিনসন কাগজের কল তৈরির জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালায়। কাগজ তৈরির জন্য প্রথমে কাগজের মন্ড তৈরি করা হয়। বাঁশ, খড়, শুকনো পাতা, আখের ছোবড়া, ঘাস এবং ছিন্নবস্ত্র ইত্যাদি কাগজের মন্ড তৈরির প্রধান উপাদান। ঘাস, ছিন্নবস্ত্র ও গাছের পাতার সাহায্যে এক ধরনের কাগজ আমাদের দেশে তৈরি হতো। তুলট কাগজ বলা হতো একে। চামড়ার সাহায্যে যে কাগজ তৈরি হতো তাকে বলতো পার্চমেন্ট। এই পার্চমেন্ট কাগজ নাকি টাকা ছাপাতে ব্যবহার করা হয়।

কর্ণফুলী কাগজ কল পরিদর্শনে আরও জানা গেল, কাগজ তৈরির উপকরণ আগে চূর্ণ করে তাতে রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে মন্ড তৈরি করা হয়। এই মন্ড পানিতে মিশিয়ে ব্লিচিং পাউডারের সাহায্যে পরিশোধিত করার পর পাতলা মন্ড চীনা মাটির সঙ্গে মেশাতে হয়। এ পাতলা মন্ড স্তরকে শুকিয়ে কাগজ তৈরি করা হয়। কাগজের বিভিন্ন সাইজ রয়েছে। যেমন- ডিমাই, ডবল ডিমাই, রয়েল, ফুলস্কেপ, ক্রাউন, ডবল ক্রাউন ইত্যাদি। ব্যবহার, গঠন, পরিমাপ এবং প্রকারভেদে কাগজের নাম বহুবিধ। পূর্বে আমাদের দেশে কাগজের কল অনুন্নত ছিল, বর্তমানে কলকাখানার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কাগজের কলেও পরিবর্তন এসেছে।

কাগজের ব্যবহার বহুবিধ। বই ছাপা, লেখা, সংবাদপত্র বের করা প্রতিটি কাজে কাগজের ব্যবহার অপরিহার্য। আমাদের এ দেশে চট্টগ্রামে চন্দ্রঘোনা, পাকসী ও খুলনায় কাগজ তৈরির কল রয়েছে। খুলনা কাগজ কলের কাগজ তথা নিউজপ্রিন্ট কাগজ বিদেশেও রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হচ্ছে। সবদিক দিয়ে আমাদের এ দেশের কাগজ কল ভালো অবস্থানে থাকলেও ব্যবহারকারীরা রয়েছে নানাবিধ সমস্যায়। লাগামহীন কাগজের দাম কোনোভাবে থামানো যাচ্ছে না। এতে করে নিরুৎসাহিত হচ্ছে প্রকাশনা সংস্থাসহ লেখকরা।

জ্ঞান বিস্তারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবকিছুতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। গরিবের ছেলেমেয়েরা অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের মা- বাবা তথা অভিভাবকরা ঠিক সময়ে বইসহ লেখার কাগজ কিনে দিতে পারছে না। কাগজের দাম বেড়ে যাওয়ায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। বিজ্ঞমহলের অভিযোগ, এভাবে যদি কাগজের দাম বাড়তে থাকে তাহলে মেধা বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সুবিধাভোগীরা তৎপর হয়ে উঠবে। কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সব শ্রেণির মানুষ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং প্রাবন্ধিক।

shatadal.barua@yahoo.com