এখন সময়, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার। যেনতেনভাবে, অর্থ আয়ই মূল কথা। নিজেকে অর্থশালী করা, ক্ষমতাবান হওয়াই আসল। এখানে নীতি, নৈতিকতার কোনো স্থান নেই। ব্যক্তির এমন স্বার্থপরতায়, আচ্ছন্ন হচ্ছে সমাজ। ধীরে ধীরে গ্রাস করছে, নীতিহীনতা। এমন বোধশূন্যতায়, আক্রান্ত চারদিক। অর্থপিপাসু কিছু মানুষের ভয়াল থাবায়, নিস্তার নেই সাধারণ মানুষের। ব্যক্তির স্বার্থ যখন চূড়ান্ত আকার ধারণ করে, নিশ্চিতভাবেই তখন সমষ্টির ভাগ্যে নেমে আসে বিপর্যয়। বিষয়টা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে তখন, যখন প্রশাসন থাকে নির্বিকার।
গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরের শেষ পাতায় প্রকাশিত ‘মাছ রক্ষার নামে বালুর কারবার’ শীর্ষক সংবাদের মাধ্যমে, জানা যায় মাছের অভয়ারণ্য তৈরির অনুমতি নিয়ে হবিগঞ্জের গুঙ্গিয়াজুরী হাওর থেকে বালু ও মাটি তুলে বিক্রির চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে জেলা মৎস্যজীবী লীগের এক নেতার বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে হাওরটির বোরো ধান চাষের জমি নষ্ট করে বড় ড্রেজার ও পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। এতে করে ধান উৎপাদন ব্যাহতসহ হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কায় সাধারণ কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। তারা বলছেন, হবিগঞ্জ জেলা মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলামসহ কয়েকজন বালু ও মাটির এই কারবারের সঙ্গে জড়িত। সংবাদে আরও জানা যায়, বাহুবল উপজেলায় নির্মাণাধীন কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিচু জমি ভরাটের জন্য তাজুল ইসলাম ও তার লোকজন বালু-মাটি সরবরাহের দায়িত্ব নিয়েছেন। এজন্য হাওরের বোরো জমিতে বড় ড্রেজার মেশিন ও কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। মেশিন ও পাইপ স্থাপন করতে গিয়ে কয়েক একর জমির বোরো ধানের চারা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সংবাদে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অভয়ারণ্য তৈরির নামে বালু ও মাটির কারবারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক (সদ্য বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার) তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাওরে মা-মাছ চাষ ও অভয়াশ্রম করতে জলাশয় খনন করার জন্য জেলা প্রশাসন আমাদের এক মাসের অনুমতি দিয়েছে। ওই সময় পর্যন্ত আমরা কাজ করব। প্রশাসন তদন্ত করে শর্তভঙ্গের যদি কোনো আলামত পায় তাহলে যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা মেনে নেব।’
এদিকে স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসীর পক্ষে গত ১ মার্চ জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ করেন অমৃতা গ্রামের মাওলানা গোলাম সারওয়ার। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে এক ইঞ্চি জমি যেখানে অনাবাদি না রাখার জন্য বলছেন, সেখানে ওই চক্রটি হাওরের কৃষিজমি ও পরিবেশের বারোটা বাজানোর পাঁয়তারা করছে। আশা করছি, জেলা প্রশাসক আমাদের সমস্যা বুঝে অনুমতির আদেশ বাতিল করবে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহুয়া শারমিন ফাতেমা বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। তার প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পাঠানো হবে।’
সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুহুল আমিন বলেন, ‘২ মার্চ সরেজমিনে হাওর পরিদর্শন করেছি। জেলা প্রশাসকের দেওয়া শর্ত তাজুল ইসলাম ভঙ্গ করেছেন। খননকাজ বন্ধ করার জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কাছেও প্রতিবেদন পাঠানো হবে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘কৃষিজমি ধ্বংস করে পুকুর ও জলাশয় তৈরির নামে যে প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে তা বেআইনি। কোটি কোটি ঘনফুট পানিমিশ্রিত বালুজমির নিচ থেকে তোলা হলে শুষ্ক মৌসুমে হাওরে পানি সংকট দেখা দেবে। জমি দেবে যাওয়া ছাড়াও বড় বড় ফাটল দেখা দেবে। জীববৈচিত্র্যে নেমে আসবে নানা বিপর্যয়।’
সমষ্টির স্বার্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের। কোনো ব্যক্তির অবৈধ স্বার্থ দেখা, প্রশাসনের দায়িত্ব নয়। কী করলে জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে, কী করলে সমস্যার সমাধান হবে প্রশাসনের সেদিকে নজর দেওয়া উচিত।