প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়া মানেই হচ্ছে মানুষের ওপর অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনা করা। আর আওয়ামী লীগ মানুষকে উন্নয়ন উপহার দেয়। গতকাল শনিবার বিকেলে ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিভাগীয় জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা ধরে রাখতে হবে। আমরা নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। ২০৪১ সালে আমাদের জনগোষ্ঠী স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। আমাদের গ্রাম, কৃষি সবকিছু হবে স্মার্ট। আমাদের লক্ষ্যই হচ্ছে দেশের উন্নয়ন করা। আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ২১০০ সালের মধ্য ডেল্টাপ্ল্যান করে এই ভূখণ্ড আরও উন্নত করব।’ তিনি বলেন, ২০০১ সালে আমরা যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করি তখন ২৬ লাখ টন খাদ্য মজুদ রেখে যাই। এরপর আসে লুটেরার দল, সন্ত্রাসীর দল বিএনপি। তারা আবার বাংলাদেশকে খাদ্যঘাটতির দেশে পরিণত করে। ২০০৯ সালে আবার যখন সরকার গঠন করি, তখন দেখি সেই ২৬ লাখ টন খাদ্যঘাটতি। আল্লাহর রহমতে দেশে এখন আর খাদ্যঘাটতি নেই। ২১ লাখ টন খাদ্য এখন মজুদ আছে।
শেখ হাসিনা বলেছেন, আমি শুনেছি, বিএনপির কোনো এক নেতা আছে নাকি সারা দিন মাইক নিয়ে বসে থাকে। তারা নাকি বলে, আমরা নাকি দেশ ধ্বংস করে দিচ্ছি। আচ্ছা ময়মনসিংহবাসী আপনারাই বলুন, আমরা কি দেশ ধ্বংস করে দিচ্ছি? বিদ্যুৎ উৎপাদন আমরা বাড়াই, বিএনপি কমায়। বিএনপির আমলে দুর্নীতিবাজরা কমিয়ে দিয়েছে। বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। আমরা চাই, সব ঘর আলোকিত হোক। বিদ্যুৎ না হলে এত কথা মাইকে আসত কীভাবে।
৪২ মিনিট বক্তব্যের শুরুতে নেতাকর্মীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমার একটাই লক্ষ্য, আমার বাবা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার, তা বাস্তবায়ন করা। আমি আপনাদের জন্য কিছু উপহার নিয়ে এসেছি। উদ্বোধন করা ৭৩টি উন্নয়ন প্রকল্প পড়ে শুনিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার মাসে ৭৩টি প্রকল্প উদ্বোধন করে দিয়ে গেলাম, সেগুলো যতেœ রাখবেন। এরপর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা ৩০টি প্রকল্প পড়ে শোনান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর ময়মনসিংহ বিভাগ করেছে। প্রতিটি বিভাগের মতো এ বিভাগে ময়মনসিংহে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হবে, একটি পৃথক ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় করে দেব। আমরা অনেক কিছু করতে পারতাম। কিন্তু করোনাভাইরাস এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অনেক কিছু সম্ভব হয়নি। ময়মনসিংহ বিভাগীয় নতুন শহরকে দেশের সবচেয়ে আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলেও জানান তিনি।
বিএনপির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি মানুষের ঘর দখল করেছে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে গৃহহীন ও রাস্তার মানুষকে ঘর তৈরি করে দিচ্ছে। দেশের একটি মানুষও যেন ভূমিহীন না থাকে সেজন্য কাজ করছি। আমরা আজকে প্রতি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি। যেখানে বিদ্যুৎ নেই আমরা সোলার প্যানেল করে দিচ্ছি। অনেক দুর্গম এলাকায়ও সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। আমরা আজ শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি প্রত্যেকের ঘরে ঘরে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ এখন শতভাগ ডিজিটাল বাংলাদেশ। সবার হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন। কে দিয়েছে এই মোবাইল ফোন? আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই মোবাইল ফোন দিয়েছে।
এর আগে হেলিকপ্টারযোগে ময়মনসিংহের রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া স্টেডিয়ামে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। এরপর সেখান থেকে দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে জনসভাস্থল সার্কিট হাউজ মাঠ থেকে একযোগে প্রায় ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা ৭৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও প্রায় ২ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
উদ্বোধন করা প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ময়মনসিংহের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসংলগ্ন জায়গায় ছবির ভিত্তিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল, ময়মনসিংহ সদরের চর সিরতায় ৫০ শয্যার ডা. মুশফিকুর রহমান শুভ মেমোরিয়াল ইসলামিক মিশন হাসপাতাল, ৩২টি পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন প্রকল্প।
জনসভা মঞ্চে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এহতেশামুল আলম, মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. ইকরামুল হক টিটু, গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ প্রধানমন্ত্রীর হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেন। জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এহতেশামুল আলমের সভাপতিত্বে জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল ও মহানগর সাধারণ সম্পাদক মোহিত উর রহমান শান্তর সঞ্চালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সংসদ উপনেতা বেগম মতিয়া চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাবেক এমপি আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনে গোটা ময়মনসিংহে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে শহরজুড়ে রঙ-বেরঙের সাজে তোরণ নির্মাণের পাশাপাশি ব্যানার-ফেস্টুনে ঢেকে ফেলা হয় নগরী। বিভাগীয় শহরের বাইরের সড়কগুলোতেও নির্মাণ করা হয়েছে তোরণ। জনসভাস্থল সার্কিট হাউজ মাঠে নির্মাণ করা হয় বিশাল নৌকা আকৃতির মঞ্চ।