পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম গত বছরের শেষ দিক থেকেই বলে আসছিলেন জানুয়ারি থেকে ক্রমান্বয়ে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। সরকারের পদক্ষেপের কারণে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশে। যেটি জানুয়ারিতে ছিল ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গতকাল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।
মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী গতকাল রবিবার একনেক সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাড়া-কমা নিয়ে অস্বস্তির কিছু নেই। এ বছর মূল্যস্ফীতি অত্যন্ত সহনীয় থাকবে। আমি মনে করি না কোনো ধরনের চাপ পড়ছে।
তিনি বলেন, এটা ইনফ্ল্যাশন, হাইপার নয়। পাকিস্তানে ৪০ শতাংশ বেড়েছে, জিম্বায়ুতে ৩০০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি। কাজেই এ দেশের মূল্যস্ফীতি জিম্বাবুয়ের তুলনায় অস্বস্তিকর নয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৪১২টি পণ্যের ওপর দেশের মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হতো। কিন্তু এখন থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছে ৭০০টি পণ্যের মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হবে।
বিবিএসের তথ্য হালনাগাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। কিন্তু খাদ্যে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কম থাকলেও অস্বস্তি বেড়েছে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৮২ শতাংশ। অবশ্য এটি জানুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
তবে শহরের তুলনায় ফেব্রুয়ারিতেও গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি। গ্রামে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। জানুয়ারিতেও যা ছিল ৮ দশমিক ৬৭। শহরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭৫, আগের মাসেও যা ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রমিকের গড় মজুরি হার বেড়েছে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। যেটি আগের মাসে ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
তবে বিবিএসে মূল্যস্ফীতির যে হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে, বাস্তবে সে চিত্র আরও বেশি। গত মাসে ডাল, ছোলা ও ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে। সবজির দামও ঊর্ধ্বমুখী। নিত্যপণ্যের এই উচ্চমূল্যে বেকায়দায় পড়েছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।
এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, ডলার সংকটে এলসি খুলতে না পারায় আমদানি করা যাচ্ছে না খাদ্যপণ্য। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি অস্বীকার করে জানিয়েছে, খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের এলসি খোলা স্বাভাবিক রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা নানা সুবিধা নেওয়ার পরও আমদানি কম দেখিয়ে দেশের বাজারে দফায় দফায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। আজ এক পণ্যের দাম বাড়লে কাল বাড়ছে আরেক পণ্যের দাম।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন রোজার এক সপ্তাহ আগে আর পণ্যের দাম বাড়ে না। এক-দেড় মাস আগেই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। রোজা এলে সেই দামটা স্থিতিশীল হয়ে যায়। পরে সেটা আর কমে না।
এদিকে রমজানে ভোজ্য তেল, চিনি, ছোলা, পেঁয়াজ, খেজুর, ডালসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়। এই সুযোগে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থির করছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। মূলত আমদানি কমে যাওয়ায় দাম বাড়ছে নিত্যপণ্যের। এবার ডলার সংকটের কারণে আমদানিনির্ভর তেল, চিনি, ছোলাসহ কিছু পণ্যের এলসি খোলা কমে গেছে। তবে বাজারে দেশি পেঁয়াজের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় রোজায় এর সংকট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। ফলে ভোজ্য তেল, চিনি, ডাল, খেজুর ও ছোলা এই পণ্যগুলো নিয়ে শুরু হয়েছে কারসাজি।
জানা গেছে, বৈশি^ক অর্থনৈতিক মন্দা এবং ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধসহ ডলার সংকটের এই সময়েও সরকারি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্যের ‘আমদানি স্বল্পতা’ দেখিয়েছে দেশের বড় কোম্পানিগুলো। সেই তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট ও মাঝারি মূলধনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য আমদানি করতে পারছে না। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান ঋণপত্র (এলসি) খুলতে চাহিদামতো ডলার পায়নি। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভোগ্যপণ্যের শীর্ষ কোম্পানিগুলো এবার বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। বিশ্ববাজারে কমলেও ইতিমধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারে চিনির দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ইচ্ছেমতো। রমজান মাস সামনে রেখে অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ানোর অপকৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত অসাধু ব্যবসায়ীরা।