বিশ্বব্যাপী সাশ্রয়ী দামে মানসম্পন্ন ওষুধের উৎস এখন বাংলাদেশ। শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধাসহ প্রতিযোগী সব দেশের চেয়ে সাশ্রয়ী মজুরির সুযোগ থাকবে বহু দিন। শত শত বিলিয়ন ডলারের ওষুধের বাজারে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি রপ্তানির সুযোগ বাংলাদেশের সামনে। দেশের বাজারের ভোক্তাদের কাছে যাওয়া ৯৮ শতাংশ ওষুধ উৎপাদন দেশেই। কিন্তু আমাদের কোনো ডিভাইস নেই, নেই কোনো উন্নত প্রযুক্তি।
গতকাল সোমবার এফবিসিসিআই বিজনেস সামিটের শেষ দিনে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবাসংক্রান্ত এক কর্ম অধিবেশনে এ খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কিংবা যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগের এ সুযোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন উদ্যোক্তা এবং সরকারের প্রতিনিধিরা।
‘বাংলাদেশের ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা খাত : বিনিয়োগ, বিশ্ববাজারের সঙ্গে এলডিসি-উত্তর সুযোগ’ শিরোনামের এ অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান পাপন। তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি এগিয়েছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। আবার স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের পক্ষ থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক করা হয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষায়িত হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠায়ও বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বছরে ৪০ কোটি ডলারের মেডিকেল ইকুইপমেন্ট বাজার এখন বাংলাদেশ। এ রকম বাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ না আসার কোনো কারণ নেই। তবে এলডিসি উত্তরণের পর ওষুধের বাণিজ্য কোনো দেশের জন্যই সহজ ছিল না। বাংলাদেশকেও এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে।’
নাজমুল হাসান পাপন বলেন, ‘দেশের বাজারে ভোক্তাদের সেবন করা ৯৮ শতাংশই উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। গত ১২ বছরে আমরা এ শিল্পকে অনেক উন্নত জায়গায় নিতে পেরেছি। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের বাজারে আমাদের ওষুধ রপ্তানি অনেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। আমরা ভারতের চেয়েও কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে।’
পাপন বলেন, ‘আমরা শুধু বিভিন্ন শিল্পে সুযোগগুলো নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি। কিন্তু সুযোগ বাস্তবায়ন করব কীভাবে, তা নিয়ে কেউ কথা বলে না। পোস্ট এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে আমরা কীভাবে ব্যবসা করব, সেটা নিয়ে এখনই ভাবা উচিত। আমরা লিগ্যালি অনেক ওষুধ বানাচ্ছি। কিন্তু আমাদের ভালো গবেষণা নেই, এ ক্ষেত্রে গবেষণা আরও বাড়ানো উচিত।’
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় জাতীয় অধ্যাপক ডা. শাহালা খাতুন বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আরও উন্নতি ঘটাতে হবে। বিশে^র স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে।’
অনুষ্ঠানে নভো নর্ডিক বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জেনারেল ম্যানেজার রাজশ্রী দেব সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। এ দেশের ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তবে বাংলাদেশে নির্বিঘœ সরবরাহব্যবস্থা আছে। এটি ভালো দিক। পেটেন্টে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত।’
তিনি বলেন, ‘এ দেশের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পগুলো কেন ট্যালেন্ট খুঁজে পায় না, সেটিও ভাবা উচিত। আমার জানা মতে, এ দেশের বহু শিক্ষার্থী প্রতি বছর বিশে^র নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডিগ্রি নিতে যায়, কিন্তু তাদের খুব কমই দেশে ফিরে আসতে চায়। এটি নিয়ে এ দেশের শিল্প মালিকদের ভাবতে হবে।’
অনুষ্ঠানে কানাডার সিনোভেডা ইন করপোরেশনের সিইও ড. ইয়ান কে ট্যাম বলেন, বিশে্ব জেনেরিক ওষুধের বাজার ২০২২ সাল পর্যন্ত ৩৫৯ বিলিয়ন ডলারের ছিল। ২০৩০ সাল নাগাদ এটির বাজার হবে ৭৮০ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া হারবাল শিল্পের বাজার ২০২১ সাল পর্যন্ত ছিল ১৫২ বিলিয়ন ডলার, ২০৩০ সাল নাগাদ এ ওষুধের বাজার হবে ৩৪৮ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ এ বাজারগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির বলেন, চীন, ভারত এবং পশ্চিমা বিশ্ব ছাড়া আর কেউই ফার্মাসিউটিক্যালসে বাংলাদেশের মতো ভালো নয়। তাই এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, চীন ও ভারতে যথাক্রমে ২২০ বিলিয়ন ডলার এবং ৪০ বিলিয়ন ডলারের ওষুধের বড় বাজার রয়েছে এবং তাদের বাজার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।